আইফোন ছিনতাইয়ে বাধা দেওয়ায় অপ্রতিমকে হত্যা
কুমিল্লায় রবিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে অপ্রতিম খুনের ঘটনার বিস্তারিত তথ্য জানান জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান
বাংলাদেশের কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। রবিবার দুপুরে পুলিশ জানিয়েছে, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ও তাতে বাধা দেওয়ায় ঘটনার দিন বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে অপ্রতিমকে মাথায় বাঁশ দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয় বলে জেলা পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহভাজন চারজনকেই গ্রেফতার ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মূল আলামত (আইফোন) উদ্ধার করা হয়েছে।
*নিখোঁজ ও মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা*
গত শুক্রবার (১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬) বেলা সাড়ে তিনটার দিকে অপ্রতিম তার মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সাথে ছবি তোলার উদ্দেশ্যে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে বের হয়। এরপর থেকে সে নিখোঁজ ছিল।
অপ্রতিমের শিক্ষক মা ও পরিবার সামাজিক মাধ্যমে ছেলেকে খুঁজে পাওয়ার আকুল আবেদন জানান এবং থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।
শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে স্থানীয় যুবক মোহাম্মদ আব্দুল কাদির জ্বিলানী ও তার ভাতিজা রক্তাক্ত মরদেহটি দেখতে পান। পরে খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। প্রাথমিক তদন্তে অপ্রতিমের মাথায় ও শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়।
*তদন্ত, গ্রেফতার ও পুলিশের তথ্য*
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ঢাকায় সচিবালয়ে রবিবার জানান, ঘটনার ১২ ঘণ্টার মধ্যে সন্দেহভাজন ৪ জনকেই গ্রেফতার করা হয়েছে। আসামিরা একটি কিশোর অপরাধী চক্রের সদস্য এবং তারা অপ্রতিমের চেয়ে বয়সে ৫-১০ বছরের বড়। তাদের সাথে অপ্রতিমের পূর্বপরিচয় ও আড্ডা দেওয়ার সম্পর্ক ছিল।
গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ২ জনের বয়স ১৮ বছরের বেশি। প্রধান সন্দেহভাজনের কাছ থেকে নিহত অপ্রতিমের আইফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে। আসামিরা অপরাধ স্বীকার করেছে এবং তাদের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিসহ পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
কুমিল্লার জেলা পুলিশ সুপার মো: আনিসুজ্জামান জানান, অপ্রতিমকে পরিকল্পিতভাবে নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আইফোনটি হাতানোর চেষ্টা করলে সে বাধা দেয়। এ সময় তিনজন মিলে তার মাথায় বাঁশ দিয়ে আঘাত করে বিকেল ৫-৬টার মধ্যে তাকে হত্যা করে। পুলিশ দ্রুতই আদালতে চার্জশিট/প্রতিবেদন দাখিল করবে।
নিহত অপ্রতিম স্থানীয় বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার মা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের একজন শিক্ষক।
রবিবার সকালে প্রথম জানাজা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে এবং বেলা ১১টায় দ্বিতীয় জানাজা কোটবাড়ির গন্ধমতি ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক সিদ্ধান্তে কোটবাড়ি এলাকায় নিজস্ব বাসভবনের কাছেই তাকে দাফন করা হয়।
জানাজায় অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার অশ্রুসজল কণ্ঠে বলেন, "কাউকে যেন আমার মতো সন্তান হারাতে না হয়। বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ কতটা কষ্টের, সেটা আজ বুঝতে পারছি।"
*শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধ*
হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। ঘাতকদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং এক পর্যায়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, সমস্ত আলামত ও আসামি গ্রেফতার সম্পন্ন হওয়ায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে আইন ও বিচার বিভাগকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।