একটি আইফোন, একটি জীবন এবং আমাদের নৈতিক দেউলিয়াত্ব

সহিদুল আলম স্বপন, জেনেভা, সুইজারল্যান্ড
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪১ এএম
আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪০ পিএম
Main News Image

মাত্র ১৩ বছর বয়স। সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। শুক্রবার বিকেলে মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হয়েছিল। পরদিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের পাহাড়ি এলাকায় পাওয়া গেল তার নিথর দেহ।

একটি শিশুর ঘর থেকে বের হওয়া এবং আর জীবিত ফিরে না আসার মাঝখানের এই অল্প সময়টুকু বাংলাদেশের সমাজের সামনে যেন একটি নির্মম আয়না ধরে দিয়েছে। সেখানে শুধু একটি মর্মান্তিক মৃত্যু নয়, দেখা যাচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তার দুর্বলতা, মূল্যবোধের সংকট এবং মানুষের জীবনের প্রতি ভয়ংকর উদাসীনতা।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে মোবাইল ফোনটি ঘটনার সম্ভাব্য উদ্দেশ্য হতে পারে বলে ধারণার কথা এসেছে। অপ্রতিমের মায়ের ফোনটি এক সন্দেহভাজনের বাড়ি থেকে উদ্ধারের কথাও পুলিশ জানিয়েছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী ধরে নেওয়া উচিত নয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি প্রমাণিত হয় একটি মোবাইল ফোনের জন্য ১৩ বছরের একটি শিশুর জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে, আমাদের সমাজের কোনো কোনো অংশে মানুষের জীবনের মূল্য কি একটি ভোগ্যপণ্যের চেয়েও কমে যাচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু পুলিশ বা আদালতের কাছে নেই। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং রাষ্ট্রকেও নিজেদের দিকে তাকাতে হবে। বিশেষ করে শহর ও শহরতলিতে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এই আত্মসমালোচনাকে আরও জরুরি করে তুলেছে।

কিশোর গ্যাং এখন আর বিচ্ছিন্ন কয়েকজন বখে যাওয়া তরুণের সমস্যা নয়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক, নারীদের হয়রানি, দখল এবং এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারের মতো অপরাধে কিশোর ও তরুণদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ নিয়মিত সামনে আসছে। এত অভিযান ও গ্রেপ্তারের পরও কেন নতুন গ্যাং তৈরি হচ্ছে, কেন একটি গোষ্ঠী ভাঙার পর আরেকটি জায়গা নিচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে সমস্যার সামাজিক শিকড়ে।

পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, মাদক, অসুস্থ বিনোদন, দ্রুত অর্থ উপার্জনের আকাঙ্ক্ষা, স্থানীয় আধিপত্য, অপরাধী বড় ভাইদের প্রভাব এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রভাবশালীদের আশ্রয় একটি কিশোরকে অপরাধী গোষ্ঠীর দিকে ঠেলে দিতে পারে। পাড়ার কোনো কথিত বড় ভাইয়ের হাতে টাকা, মোটরসাইকেল, অস্ত্র ও ক্ষমতা দেখে এবং অপরাধ করেও তাকে পার পেতে দেখে কিশোরের কাছে সেই ক্ষমতার সংস্কৃতি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। গ্যাং তখন শুধু অপরাধী দল নয়, পরিচয়, নিরাপত্তা ও সামাজিক স্বীকৃতির বিকল্প উৎস হয়ে দাঁড়ায়।

এই চক্র না ভাঙলে শুধু গ্রেপ্তার করে কিশোর গ্যাং নির্মূল করা কঠিন।

তরুণ প্রজন্ম এখন প্রযুক্তির সঙ্গে ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি যুক্ত। একটি স্মার্টফোনের পর্দায় ব্র্যান্ড, অর্থ, গাড়ি, ফোন, জনপ্রিয়তা এবং সামাজিক মর্যাদার অন্তহীন প্রদর্শনী তাদের সামনে হাজির হচ্ছে। কিন্তু প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে আমাদের নৈতিক শিক্ষা কি একই গতিতে এগিয়েছে?

আমরা সন্তানকে ভালো স্কুলে পাঠাচ্ছি, ইংরেজি ও কম্পিউটার শেখাচ্ছি, ভালো ফলাফলের জন্য কোচিং করাচ্ছি। কিন্তু সে অন্য মানুষের জীবনকে সম্মান করতে শিখছে কি না, প্রত্যাখ্যান মেনে নিতে পারছে কি না, রাগ ও লোভ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে কি না, দুর্বল মানুষের প্রতি সহমর্মী কি না, এসব প্রশ্ন আমরা কতটা করছি?

কোনো প্রজন্ম নিজে নিজে নৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয় না। শিশুরা দেখে ক্ষমতাবান মানুষ অন্যায় করে পার পায় কি না, অর্থ ও পরিচয় আইনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে কি না, সততার চেয়ে ক্ষমতা বেশি লাভজনক কি না। এরপর আমরা তরুণদের প্রশ্ন করি, তাদের মূল্যবোধ কোথায় গেল? প্রশ্নটি বরং নিজেদের করা উচিত, আমরা তাদের কী মূল্যবোধ দিয়েছি?

পরিবার নৈতিকতার প্রথম বিদ্যালয়। অথচ অনেক পরিবারে সন্তানের প্রয়োজন মেটানোকে সন্তানকে সময় দেওয়ার বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। দামি ফোন দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু সে ফোনে কী করছে জানা হচ্ছে না। পরীক্ষার ফল জানা আছে, কিন্তু তার বন্ধু, ভয়, রাগ, হতাশা কিংবা মানসিক দ্বন্দ্ব সম্পর্কে ধারণা নেই। এই বিচ্ছিন্নতার সুযোগে গ্যাং পরিবার ও বিদ্যালয়ের বিকল্প পরিচয় হয়ে উঠতে পারে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও তাই দায়িত্ব নিতে হবে। শিক্ষা শুধু নম্বর, জিপিএ, ভর্তি পরীক্ষা এবং চাকরির প্রতিযোগিতা নয়। একজন শিক্ষার্থী দুর্বল সহপাঠীর সঙ্গে কেমন আচরণ করে, ভিন্নমত সহ্য করতে পারে কি না, রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং ভুল স্বীকার করতে শেখে কি না, সেটিও শিক্ষার অংশ।

স্কুলে নৈতিক শিক্ষা পাঠ্যবইয়ের অধ্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বুলিং, দলবদ্ধ নিপীড়ন, ভয় দেখানো, সহিংসতা, মাদক এবং অনলাইন হয়রানির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, দীর্ঘ অনুপস্থিতি কিংবা অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগের মতো সতর্কসংকেত দেখা গেলে শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রশিক্ষিত কাউন্সেলরের সমন্বয়ে দ্রুত ব্যবস্থা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে সব কিশোর অপরাধীকে একভাবে দেখলে চলবে না। কেউ প্রথমবার ভুল করেছে, কেউ মাদক বা গ্যাংয়ের প্রভাবে অপরাধে ঢুকেছে, আবার কেউ সংঘবদ্ধ গুরুতর অপরাধে জড়িয়েছে। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি। পাশাপাশি সংশোধনযোগ্য কিশোরদের শিক্ষা, কাউন্সেলিং, পরিবারে পুনর্বাসন এবং সমাজে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। কারণ লক্ষ্য শুধু অপরাধীকে আটক করা নয়, ভবিষ্যতের অপরাধী তৈরি হওয়া বন্ধ করা।

রাষ্ট্রের ব্যবস্থাও হতে হবে সমন্বিত। কোন এলাকায় কোন গ্যাং সক্রিয়, কারা নেতৃত্ব দেয়, অস্ত্র ও মাদক কোথা থেকে আসে এবং কারা অর্থ বা আশ্রয় দেয়, এসব তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। শুধু কিশোর সদস্যদের ধরে অভিযান শেষ করলে হবে না। তাদের পেছনে প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধী, মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ কিংবা প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষক থাকলে সেই নেটওয়ার্কও ভাঙতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। কোনো গ্যাংয়ের পেছনে রাজনৈতিক নেতা, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা অর্থশালী পরিবারের আশ্রয় থাকলে সেই পরিচয় যেন তাকে সুরক্ষা দিতে না পারে। আইনের চোখে সামাজিক পরিচয় নয়, অপরাধ ও প্রমাণই বিবেচ্য হওয়া উচিত।

তবে সামাজিক নিরাপত্তা শুধু পুলিশ দিয়ে তৈরি হয় না। বাংলাদেশের শহরগুলোতে শিশু ও তরুণদের জন্য মাঠ, পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক পরিসর সংকুচিত হচ্ছে। একটি কিশোরের অবসর যদি পুরোপুরি স্মার্টফোন, রাস্তার আড্ডা কিংবা স্থানীয় গোষ্ঠীকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে, তাহলে তাকে সুস্থ বিকল্প দেওয়া হচ্ছে না। খেলাধুলা, সাহিত্য, বিতর্ক, সংগীত এবং স্বেচ্ছাসেবা তরুণদের সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ শেখায়। তাই কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে পুলিশ স্টেশনের পাশাপাশি মাঠ, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং কাউন্সেলিং সেবাকেও সামাজিক নিরাপত্তায় বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।

অপ্রতিমের মৃত্যু শেষ পর্যন্ত আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্নই রেখে যায়। আমরা সন্তানদের সফল মানুষ বানানোর প্রতিযোগিতায় আছি, কিন্তু ভালো মানুষ বানানোর লড়াইয়ে কতটা আছি?

একটি আইফোন আধুনিক প্রযুক্তির বিস্ময় এবং সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হতে পারে। কিন্তু কোনো ফোন, ব্র্যান্ড, অর্থ, গ্যাংয়ের আধিপত্য কিংবা সামাজিক পরিচয়ের মূল্য একটি মানুষের জীবনের চেয়ে বেশি হতে পারে না।

অপ্রতিম আর ফিরে আসবে না। একটি পরিবার সারাজীবন তার শূন্যতা বহন করবে। তাই এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে দায়ীদের বিচার প্রয়োজন। কিন্তু শুধু একটি মামলার বিচার করেই দায়িত্ব শেষ হবে না।

কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যকে ধরার পাশাপাশি জানতে হবে কে তাকে গ্যাংয়ে টেনেছে। অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি জানতে হবে অস্ত্র কে দিয়েছে। মাদক জব্দ করার পাশাপাশি সরবরাহকারীকে ধরতে হবে। আর যারা অর্থ, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা স্থানীয় প্রভাব ব্যবহার করে কিশোরদের অপরাধের হাতিয়ার বানায়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

বাংলাদেশের কিশোর গ্যাং সমস্যার সমাধান তাই তিনটি জায়গায় একসঙ্গে খুঁজতে হবে: প্রতিরোধ, আইন প্রয়োগ এবং পুনর্বাসন। একটি বাদ দিলে অন্য দুটি দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না।

একটি দেশের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন ১৩ বছরের একটি শিশু বিকেলে ছবি তুলতে ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে মায়ের কাছে ফিরে আসতে পারে। অপ্রতিমের মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের শোক নয়। এটি আমাদের সামাজিক বিবেকের সামনে রাখা এক নির্মম প্রশ্ন: *আমরা কি শুধু সন্তানদের জন্য একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ তৈরি করছি, নাকি এমন একটি বাংলাদেশও তৈরি করছি যেখানে মানুষের জীবনের মূল্য সত্যিই সবার ওপরে?*

অপ্রতিমের জন্য ন্যায়বিচার প্রয়োজন। কিন্তু তার প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় দায় হবে এমন একটি সমাজ নির্মাণ করা, যেখানে কোনো কিশোর অপরাধী গ্যাংকে নিজের পরিবার মনে করবে না, কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি কিশোরদের অপরাধের হাতিয়ার বানাতে পারবে না এবং আর কোনো মা সন্তানের সন্ধানে অসহায় হয়ে প্রশ্ন করবেন না, *“আমার সন্তান কোথায়?”*

(লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং, আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি)