নজরুল থেকে তারেক-মোদি: সৌজন্যের আড়ালে কি বদলাচ্ছে ঢাকা-দিল্লির সমীকরণ?
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক নিয়ে রাজনীতি, কূটনীতি এবং জনমতের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে দুটি সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে। প্রথমত, ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনারের বক্তব্য যে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নোবেল পুরস্কার পাওয়া উচিত ছিল। দ্বিতীয়ত, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্মদিনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শুভেচ্ছা বার্তা এবং তার প্রকাশ্য জবাব।
প্রথম দেখায় এই দুটি ঘটনাই সৌজন্যমূলক এবং সাংস্কৃতিক শিষ্টাচারের অংশ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতায় কূটনীতির ভাষা কখনোই পুরোপুরি নির্দোষ বা নিরপেক্ষ নয়। রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নয়, বরং প্রতীক, বার্তা ও সৌজন্যের মধ্য দিয়েই ভবিষ্যৎ সম্পর্কের দিকনির্দেশনা দেয়। প্রশ্ন হলো, এই ঘটনাগুলো কি কেবল শিষ্টাচার, নাকি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন বাস্তবতার সূক্ষ্ম ইঙ্গিত?
ভারতের হাইকমিশনারের নজরুল-প্রশংসা নিঃসন্দেহে সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ। নজরুল কেবল বাংলাদেশের জাতীয় কবি নন, তিনি দুই বাংলার যৌথ সাংস্কৃতিক চেতনার অন্যতম প্রধান প্রতীক। তাঁর সাহিত্য বিদ্রোহ, মানবতা, সাম্য এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য দলিল। তাঁকে ‘মহাপুরুষ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা কিংবা নোবেল পাওয়ার যোগ্য বলে মূল্যায়ন করা একজন কূটনীতিকের সৌজন্যমূলক বক্তব্যের চেয়েও বেশি কিছু। কারণ সংস্কৃতি হলো এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে রাজনৈতিক দূরত্ব কমানো তুলনামূলক সহজ।
তবে এখানেই সতর্ক থাকা প্রয়োজন। নজরুলকে নিয়ে আবেগঘন বক্তব্য কোনোভাবেই সীমান্ত হত্যা, তিস্তার পানি বণ্টন বা দ্বিপক্ষীয় অমীমাংসিত বিষয়গুলোর বিকল্প হতে পারে না। সংস্কৃতি সম্পর্কের আবহ তৈরি করতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সমস্যার সমাধান করে না। ইতিহাস বলছে, ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ যতই ভালো থাকুক, বাস্তব রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো অমীমাংসিত থাকলে সম্পর্কের মধ্যে অসন্তোষ থেকেই যায়।
অন্যদিকে তারেক রহমান ও নরেন্দ্র মোদির শুভেচ্ছা বিনিময় আরও বেশি রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে। কারণ এটি এমন এক সময় ঘটছে যখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে অনেকেই ব্যক্তি ও দলকেন্দ্রিক সম্পর্ক হিসেবে দেখেছেন। বিশেষ করে দিল্লির সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ অনেকাংশে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীল ছিল বলে সমালোচনা রয়েছে।
সেই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের শুভেচ্ছা এবং মোদির দ্রুত ও প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বহন করে। এটি হয়তো কোনো নীতিগত পরিবর্তনের ঘোষণা নয়, কিন্তু এটাও স্পষ্ট যে ভারত বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সম্ভাব্য নতুন ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রাখতে আগ্রহী।
প্রকৃতপক্ষে ভারতের কূটনীতি ঐতিহাসিকভাবেই বাস্তববাদী। নয়াদিল্লি আদর্শিক অবস্থানের চেয়ে নিজের কৌশলগত স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কারণ নেই। ভারতের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব কেবল একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে নয়; বরং উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ, বঙ্গোপসাগরীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং চীনের প্রভাব মোকাবিলার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
ফলে দিল্লি কখনোই বাংলাদেশের রাজনীতিকে একদলীয় বা একমাত্রিক দৃষ্টিতে দেখতে চাইবে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, দিল্লি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির প্রতি অতিরিক্ত ঝুঁকে ছিল, সেই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা। যদি ভারত সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক চায়, তাহলে তাকে রাষ্ট্রভিত্তিক সম্পর্কের দিকে আরও স্পষ্টভাবে অগ্রসর হতে হবে।
কিন্তু একইসঙ্গে বাংলাদেশেরও কিছু মৌলিক বাস্তবতা উপলব্ধি করা প্রয়োজন। ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভৌগোলিক বাস্তবতা কোনো সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে বদলায় না। ভারত বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী, একটি বিশাল বাজার এবং আঞ্চলিক সংযোগের অন্যতম প্রধান অংশীদার। তাই দিল্লির সঙ্গে সংঘাতের রাজনীতি যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি অন্ধ নির্ভরতাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এখানেই প্রয়োজন একটি পরিণত ও আত্মবিশ্বাসী পররাষ্ট্রনীতি।
বাংলাদেশের উচিত ভারতকে বন্ধু হিসেবে দেখা, অভিভাবক হিসেবে নয়; অংশীদার হিসেবে দেখা, প্রভাবক হিসেবে নয়। বন্ধুত্বের সম্পর্ক তখনই টেকসই হয়, যখন সেখানে সমতা ও পারস্পরিক সম্মান থাকে। যে সম্পর্কের ভিত্তি পারস্পরিক স্বার্থের বদলে রাজনৈতিক আনুগত্যের ওপর দাঁড়ায়, সেই সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না কে কাকে প্রশংসা করলেন বা কে কাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা পাঠালেন। প্রকৃত পরীক্ষা হবে সীমান্তে একজন বাংলাদেশি নাগরিকের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হলো, তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা কতটা পাওয়া গেল, বাণিজ্য বৈষম্য কতটা কমল এবং দুই দেশের মানুষের যাতায়াত কতটা সহজ হলো তার ওপর।
দুই দেশের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে আলোচিত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনও অমীমাংসিত। তিস্তা চুক্তি তার অন্যতম। একইভাবে সীমান্তে প্রাণহানি, অশুল্ক বাধা, ভিসা জটিলতা এবং বাণিজ্য ঘাটতির প্রশ্নও নিয়মিত আলোচনায় আসে। এসব বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া শুধুমাত্র ইতিবাচক বার্তা দিয়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব নয়।
ভারতের জন্যও এটি উপলব্ধি করা জরুরি যে বাংলাদেশের মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিকভাবে সচেতন এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সংবেদনশীল। ফলে শুধুমাত্র সরকার-সরকার সম্পর্কের সফলতা যথেষ্ট নয়; জনগণ-জনগণ সম্পর্কের আস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে নজরুলের কথাই আবার ফিরে আসে। নজরুল ছিলেন বিদ্রোহের কবি, কিন্তু তাঁর বিদ্রোহ ছিল ন্যায়বিচার ও মর্যাদার পক্ষে। তিনি সাম্যের কথা বলেছেন, মানুষের সমঅধিকারের কথা বলেছেন। কোনো ধরনের আধিপত্য বা বৈষম্যকে তিনি সমর্থন করেননি। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই দর্শন প্রাসঙ্গিক। প্রকৃত বন্ধুত্ব তখনই সম্ভব, যখন উভয়পক্ষ পরস্পরের মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বকে সমানভাবে স্বীকার করে।
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পররাষ্ট্রনীতির বহুমাত্রিকতা বজায় রাখা। ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, কিন্তু একমাত্র অংশীদার নয়। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য এবং আসিয়ান অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণও সমানভাবে জরুরি। বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়; বরং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার একটি আধুনিক ও কার্যকর কৌশল।
সুতরাং নজরুলকে ঘিরে সাংস্কৃতিক সৌহার্দ্য এবং তারেক-মোদির সৌজন্য বিনিময়কে একদিকে অতিরঞ্জিত করারও প্রয়োজন নেই, আবার সম্পূর্ণ উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। কূটনীতিতে পরিবেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ইতিবাচক পরিবেশ কখনো কখনো বড় রাজনৈতিক অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি করে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সম্পর্কের মূল্য নির্ধারিত হবে প্রতীকের মাধ্যমে নয়, বাস্তব ফলাফলের মাধ্যমে। জনগণ জানতে চাইবে কতগুলো চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো তার চেয়ে বেশি, কতগুলো সমস্যার সমাধান হলো। কূটনৈতিক হাসিমুখের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে সীমান্তে শান্তি, পানিতে ন্যায্যতা, বাণিজ্যে ভারসাম্য এবং পারস্পরিক সম্মানে ভিত্তিক সম্পর্ক।
নজরুলের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সৌজন্য বার্তার বিনিময় তাই একটি সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। কিন্তু সেই দরজা দিয়ে বাস্তব অগ্রগতির পথে হাঁটার দায়িত্ব এখন ঢাকা ও দিল্লির। কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সৌজন্যের ভাষা নয়, ফলাফলের ভাষাই মনে রাখে।