সায়মা ওয়াজেদকে ঘিরে নীরবতা: বাংলাদেশ *কি হারাল একটি বৈশ্বিক নেতৃত্বের আসন?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক সায়মা ওয়াজেদকে দায়িত্ব থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত ঘিরে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা নীরব বিরোধ এখন সম্ভাব্য আইনি লড়াইয়ের দিকে এগোচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তার আইনজীবীরা ডব্লিউএইচওকে জানিয়েছেন, অনির্দিষ্টকালের ছুটির সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বাধীন তদন্ত শুরু না হলে আদালত বা উপযুক্ত আন্তর্জাতিক প্রশাসনিক ফোরামে প্রতিকার চাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
এই বিরোধ শুধু একজন কর্মকর্তার চাকরি, শেখ হাসিনার পরিবারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কিংবা বাংলাদেশে চলমান কয়েকটি ফৌজদারি মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক সংস্থায় নির্বাচিত ম্যান্ডেটের নিরাপত্তা, যথাযথ প্রক্রিয়া, সদস্যরাষ্ট্রের অধিকার এবং বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন রক্ষার প্রশ্ন।
বাংলাদেশ সরকার কি সায়মা ওয়াজেদকে আঞ্চলিক পরিচালকের দায়িত্বে ধরে রাখতে পারত? তার বিরুদ্ধে দেশের আইনি কার্যক্রম চালু রেখেও কি ডব্লিউএইচওর কাছে স্বাধীন তদন্ত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া দাবি করা যেত? অথবা তাকে দায়িত্ব থেকে স্থায়ীভাবে সরানো হলে বাংলাদেশ কি অন্য কোনো যোগ্য নাগরিককে প্রার্থী করে পদটি ধরে রাখার চেষ্টা করতে পারত?
সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো বাংলাদেশ এককভাবে সায়মা ওয়াজেদকে বহাল রাখতে, অপসারণ করতে কিংবা তার জায়গায় অন্য একজন বাংলাদেশিকে বসাতে পারত না। তবে মূল মনোনয়নদাতা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে তার নির্বাচিত ম্যান্ডেটের সুরক্ষা, সময়সীমাবদ্ধ স্বাধীন তদন্ত এবং প্রয়োজনে নতুন নির্বাচন আয়োজনের জন্য বাংলাদেশ দৃঢ় কূটনৈতিক অবস্থান নিতে পারত।
বাংলাদেশের মনোনয়ন, কিন্তু আঞ্চলিক ম্যান্ডেট
সায়মা ওয়াজেদকে আঞ্চলিক পরিচালক পদে প্রার্থী করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি আর কেবল বাংলাদেশের প্রতিনিধি ছিলেন না। ২০২৩ সালে ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর গোপন ভোটে তিনি আটটি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। ভারতসহ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ তার পক্ষে ভোট দেয়।
এরপর ডব্লিউএইচওর নির্বাহী বোর্ড ২০২৪ সালের ২৩ জানুয়ারি তার নিয়োগ অনুমোদন করে। তিনি একই বছরের ১ ফেব্রুয়ারি পাঁচ বছরের মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ডব্লিউএইচওর আনুষ্ঠানিক নিয়োগ নথি অনুযায়ী, তার মেয়াদ শুরু হয়েছে ২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি এবং নিয়োগটি সংস্থার স্টাফ রেগুলেশন ও স্টাফ রুলসের অধীন।
ডব্লিউএইচওর সংবিধানের ৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক কমিটির সম্মতিতে নির্বাহী বোর্ড আঞ্চলিক পরিচালক নিয়োগ করে। কোনো দেশ প্রার্থী দিতে পারে; কিন্তু নির্বাচন ও নিয়োগ সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ম্যান্ডেটের মালিকানা আর মনোনয়নদাতা সরকারের হাতে থাকে না। তিনি পুরো অঞ্চলের নির্বাচিত প্রশাসনিক প্রধান এবং ডব্লিউএইচওর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হয়ে ওঠেন।
তাই বাংলাদেশ সরকার পরিবর্তিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আগের সরকারের মনোনীত আঞ্চলিক পরিচালকের ম্যান্ডেট স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ তার রাজনৈতিক সমর্থন প্রত্যাহার করলেও সেটি নিজে থেকে ডব্লিউএইচওর নিয়োগ বাতিল করে না। এখানেই জাতীয় রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য।
অভিযোগের বিচার ও আন্তর্জাতিক ম্যান্ডেট আলাদা রাখা যেত
বাংলাদেশ সরকার সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি, প্রতারণা, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উপেক্ষা করতে বাধ্য ছিল না। অভিযোগ তদন্ত করা, প্রমাণ সংগ্রহ করা এবং আদালতে উপস্থাপন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কোনো আন্তর্জাতিক পদ একজন নাগরিককে দেশের আইন থেকে দায়মুক্তি দেয় না।
কিন্তু বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার এবং ডব্লিউএইচওর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দুটি স্বতন্ত্র প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের আদালত নির্ধারণ করবে তিনি দেশের আইন ভঙ্গ করেছেন কি না। অন্যদিকে ডব্লিউএইচওকে নির্ধারণ করতে হবে, তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ সংস্থার আচরণবিধি বা কর্মচারী বিধির লঙ্ঘন কি না এবং সেই অভিযোগের ভিত্তিতে দায়িত্ব থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত ন্যায্য ও আইনসংগত কি না।
বাংলাদেশ সরকারের সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান হতে পারত ব্যক্তিকে নিঃশর্তভাবে রক্ষা না করে প্রক্রিয়াটিকে রক্ষা করা। সরকার বলতে পারত, দেশে তদন্ত ও বিচার চলবে; কিন্তু একজন নির্বাচিত আঞ্চলিক পরিচালকের প্রশাসনিক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে ডব্লিউএইচওর লিখিত বিধি, নিরপেক্ষ তদন্ত, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণের ভিত্তিতে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ ডব্লিউএইচওর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি স্বাধীন নৈতিকতা বা প্রশাসনিক পর্যালোচনা চাইতে পারত। তদন্ত চলাকালে কী ধরনের সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কত দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ হবে, সায়মা ওয়াজেদ কীভাবে অভিযোগের জবাব দেবেন এবং কোন পরিস্থিতিতে তাকে পুনর্বহাল বা অপসারণ করা হবে এসব প্রশ্নে একটি প্রকাশ্য সময়সীমা দাবি করা যেত।
অনির্দিষ্ট ছুটি কেন সমস্যাজনক
২০২৫ সালের ১১ জুলাই ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস কর্মীদের উদ্দেশে পাঠানো একটি সংক্ষিপ্ত অভ্যন্তরীণ ইমেইলে জানান, সায়মা ওয়াজেদ ছুটিতে যাচ্ছেন। তার ফিরে আসার কোনো তারিখ, ছুটির প্রকাশ্য কারণ কিংবা সিদ্ধান্তটি পর্যালোচনার সময়সীমা জানানো হয়নি।
চার দিন পর ক্যাথারিনা বোহেমে নয়াদিল্লিতে অবস্থিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের অফিসার-ইন-চার্জ হিসেবে দায়িত্ব নেন। প্রায় তেরো মাস পর তার দায়িত্ব শেষ হলে ২০২৬ সালের ১৭ আগস্ট ডা. নিলেশ বুদ্ধ নতুন অফিসার-ইন-চার্জ হন। ডব্লিউএইচওর সরকারি ওয়েবসাইটে এখনো সায়মা ওয়াজেদকে আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দেখানো হয়েছে, তবে উল্লেখ করা হয়েছে যে তিনি ছুটিতে আছেন।
ফলে একটি অস্বাভাবিক প্রাতিষ্ঠানিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বরখাস্ত করা হয়নি, আবার নির্বাচিত দায়িত্ব পালন করতেও দেওয়া হচ্ছে না। সময়সীমাবিহীন এই ব্যবস্থা দীর্ঘায়িত হলে সাময়িক ছুটি কার্যত তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপসারণে পরিণত হতে পারে।
অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোনো নির্বাচিত কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে দূরে রাখা এবং সিদ্ধান্তের কারণ, বিধি ও আপিলের পথ প্রকাশ না করা যথাযথ প্রক্রিয়ার প্রশ্ন তোলে। ডব্লিউএইচও যদি মনে করে তাকে দায়িত্ব থেকে দূরে রাখার পর্যাপ্ত কারণ রয়েছে, তবে সেই কারণ এবং প্রযোজ্য প্রশাসনিক মানদণ্ড ব্যাখ্যা করাও সংস্থাটির দায়িত্ব।
অনির্দিষ্ট ছুটি শূন্যপদ নয়
বর্তমান বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অফিসার-ইন-চার্জ এবং আঞ্চলিক পরিচালক একই পদ নয়। অফিসার-ইন-চার্জ একজন সাময়িক প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তিনি নির্বাচিত আঞ্চলিক পরিচালকের পাঁচ বছরের আঞ্চলিক ম্যান্ডেট লাভ করেন না। কার্যালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রম ও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য মহাপরিচালক তাকে দায়িত্ব দেন।
সায়মা ওয়াজেদ যত দিন আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ না করছেন, তার নিয়োগ বাতিল না হচ্ছে কিংবা অন্য কোনো বৈধ কারণে পদটি শূন্য ঘোষণা করা না হচ্ছে, তত দিন নতুন আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশও তার জায়গায় অন্য কোনো নাগরিকের নাম দিয়ে বলতে পারত না যে ওই ব্যক্তি অবশিষ্ট মেয়াদ পূরণ করবেন।
বাংলাদেশ চাইলে একজন যোগ্য বাংলাদেশিকে সাময়িক অফিসার-ইন-চার্জ হিসেবে বিবেচনার জন্য কূটনৈতিকভাবে প্রস্তাব করতে পারত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোনো সংরক্ষিত অধিকার ছিল না এবং মহাপরিচালক সেই প্রস্তাব গ্রহণ করতে বাধ্যও ছিলেন না। এমন কোনো প্রচেষ্টা বাংলাদেশ করেছে কি না, তা প্রকাশ্যে স্পষ্ট নয়। এখানেই জেনেভায় বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন এবং স্বাস্থ্য কূটনীতির সক্রিয়তার প্রশ্ন সামনে আসে।
নতুন বাংলাদেশি প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ ছিল কি?
সায়মা ওয়াজেদ পদত্যাগ করলে, তার নিয়োগ আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল হলে অথবা অন্য কোনো কারণে পদটি শূন্য ঘোষণা করা হলে বাংলাদেশ একজন নতুন যোগ্য প্রার্থী দিতে পারত। তবে সেই প্রার্থী সরাসরি দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারতেন না। তাকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের অন্য প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সমর্থন অর্জন করতে হতো।
সাধারণ নিয়মে মহাপরিচালক সদস্যরাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে প্রার্থীর নাম আহ্বান করেন। বাংলাদেশসহ অঞ্চলের যেকোনো সদস্যরাষ্ট্র যোগ্য প্রার্থী প্রস্তাব করতে পারে। প্রার্থীদের পেশাগত যোগ্যতা যাচাই, প্রয়োজনীয় সাক্ষাৎকার এবং উপস্থাপনার পর আঞ্চলিক কমিটি গোপন ভোটে একজনকে মনোনীত করে। এরপর ডব্লিউএইচওর নির্বাহী বোর্ড সেই মনোনয়ন অনুমোদন করে আনুষ্ঠানিক নিয়োগ দেয়।
মেয়াদের মাঝপথে পদ শূন্য হলে প্রয়োজন অনুসারে বিশেষ অধিবেশন বা ত্বরিত নির্বাচনী প্রক্রিয়া আয়োজনের নজির রয়েছে। ২০২৫ সালে আফ্রিকা অঞ্চলের জন্য মনোনীত আঞ্চলিক পরিচালকের আকস্মিক মৃত্যুর পর বিশেষ অধিবেশন ডেকে নতুন প্রার্থী মনোনয়নের ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক কমিটি, নির্বাহী বোর্ড ও প্রযোজ্য কার্যবিধির ভিত্তিতে নির্ধারিত হতো।
বাংলাদেশ তাই অন্য একজন বাংলাদেশিকে প্রার্থী করতে পারত, কিন্তু সায়মা ওয়াজেদের পাওয়া আটটি ভোট নতুন প্রার্থীর কাছে স্থানান্তরিত হতো না। ভারতসহ যেসব দেশ তাকে সমর্থন দিয়েছিল, তাদের নতুন করে রাজি করাতে হতো। অন্য সদস্যরাষ্ট্রগুলোও নিজেদের প্রার্থী দিতে পারত এবং চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করত আঞ্চলিক কমিটির ভোট।
পদটি বাংলাদেশের জন্য সংরক্ষিত ছিল না
ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালকের পদ কোনো দেশের জন্য সংরক্ষিত আসন নয় এবং জাতীয়তার ভিত্তিতে বাধ্যতামূলক আবর্তনের ব্যবস্থাও নেই। তাই সায়মা ওয়াজেদের পর আরেকজন বাংলাদেশি নির্বাচিত হওয়ার ওপর নীতিগত বাধা ছিল না। আবার বাংলাদেশ একবার পদটি পেয়েছে বলে পরবর্তী নির্বাচনেও সেটি বাংলাদেশের কাছে থাকবে এমন কোনো নিশ্চয়তাও ছিল না।
প্রার্থীর জাতীয়তা কূটনৈতিক বিবেচনার অংশ হতে পারে, কিন্তু নির্বাচন নির্ধারিত হয় জনস্বাস্থ্য নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সমর্থনের ভিত্তিতে। বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, দলনিরপেক্ষ ও উচ্চমানের একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞকে মনোনয়ন দিত, তাহলে নতুন করে আঞ্চলিক জোট গড়ে পদটি ধরে রাখার বাস্তব সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারত।
সেই প্রার্থীকে শুধু বাংলাদেশের সরকারের পছন্দের ব্যক্তি হলেই চলত না। তাকে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, তিমুর-লেস্তে, মিয়ানমার ও উত্তর কোরিয়াসহ অঞ্চলের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হতো। সায়মা ওয়াজেদের নির্বাচনকে ঘিরে যোগ্যতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের যে প্রশ্ন উঠেছিল, নতুন প্রার্থীর ক্ষেত্রে অধিকতর স্বচ্ছতা এবং শক্তিশালী পেশাগত যোগ্যতা নিশ্চিত করা বিশেষভাবে জরুরি হতো।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশল কী হতে পারত
বাংলাদেশ একদিকে সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে জাতীয় আইনি কার্যক্রম চালাতে এবং অন্যদিকে ডব্লিউএইচওর কাছে সময়সীমাবদ্ধ স্বাধীন তদন্ত দাবি করতে পারত। অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তাকে দায়িত্বে ফেরানো এবং প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী তার নিয়োগ বাতিল করে পদটি শূন্য ঘোষণা করার প্রস্তাব দেওয়া যেত।
পদটি শূন্য হলে বাংলাদেশ দ্রুত একজন গ্রহণযোগ্য নাগরিককে প্রার্থী করে বিশেষ অধিবেশন বা নতুন নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানাতে পারত। এতে কোনো ব্যক্তির দায়মুক্তি দাবি করা হতো না; বরং জবাবদিহি ও জাতীয় কূটনৈতিক স্বার্থের মধ্যে একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হতো।
বাংলাদেশ আরও যুক্তি দিতে পারত যে একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের কারণে একটি দেশের অর্জিত আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব বিনা প্রতিযোগিতায় শেষ হয়ে যাওয়া উচিত নয়। তবে এই যুক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করত নতুন প্রার্থীর যোগ্যতা, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর।
নতুন প্রার্থীকে সামনে আনার আগে ভারতসহ আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে নিবিড় ও নীরব কূটনৈতিক আলোচনা প্রয়োজন ছিল। আঞ্চলিক কার্যালয়টি নয়াদিল্লিতে অবস্থিত এবং সায়মা ওয়াজেদের নির্বাচনে ভারতের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। একইভাবে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের মতো রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন কঠিন হতো।
অতএব পদটি ধরে রাখার অর্থ কোনো বাংলাদেশিকে প্রশাসনিক আদেশে বসিয়ে দেওয়া নয়; বরং নতুন নির্বাচনে একজন শক্তিশালী বাংলাদেশি প্রার্থীকে জয়ী করার মতো আঞ্চলিক সমর্থন গড়ে তোলা।
পূর্বাচলের রায় ও ডব্লিউএইচওর দায়
২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার বিশেষ জজ আদালত পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ১০ কাঠার প্লট বরাদ্দে অনিয়মের মামলায় সায়মা ওয়াজেদকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন। তার ভাই সজীব ওয়াজেদ জয়ও পৃথক মামলায় একই মেয়াদের সাজা পান। তিনটি মামলায় শেখ হাসিনাকে মোট ২১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অভিযুক্তরা দেশে না থাকায় তাদের অনুপস্থিতিতে বিচার সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা রায়ের বিস্তারিত প্রকাশ করেছে।
এই রায় গুরুতর এবং ডব্লিউএইচও তা উপেক্ষা করতে পারে না। তবে সংস্থাটি সায়মা ওয়াজেদকে ছুটিতে পাঠিয়েছিল রায় ঘোষণার কয়েক মাস আগে। ফলে ডব্লিউএইচওকে ব্যাখ্যা করতে হবে, তখন কোন তথ্য, তদন্ত ও প্রশাসনিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল।
ডব্লিউএইচও এর আগে অভ্যন্তরীণ তদন্তের পর আঞ্চলিক পরিচালককে অপসারণ করেছে। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সাবেক পরিচালক তাকেশি কাসাইয়ের বিরুদ্ধে কর্মীদের অভিযোগ তদন্তের পর ২০২৩ সালে তার নিয়োগ বাতিল করা হয়। সেখানে অভিযোগ, তদন্ত এবং প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের একটি দৃশ্যমান ধারাবাহিকতা ছিল। সায়মা ওয়াজেদের ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা প্রকাশ্যে পরিষ্কার নয়।
বাংলাদেশ কোথায় সুযোগ হারাল
সায়মা ওয়াজেদকে নিঃশর্তভাবে রক্ষা করা বাংলাদেশের দায়িত্ব ছিল না। কিন্তু তার নির্বাচিত ম্যান্ডেট, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং যথাযথ প্রক্রিয়ার পক্ষে অবস্থান নেওয়া বাংলাদেশের কূটনৈতিক স্বার্থের অংশ হতে পারত। সেটি শেখ হাসিনার পরিবারকে রক্ষা করা নয়; বরং বাংলাদেশের অর্জিত একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ প্রার্থীদের ম্যান্ডেটের নিরাপত্তা রক্ষা করা হতো।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সায়মা ওয়াজেদ দায়িত্ব পালন করছেন না, অথচ পদটিও আনুষ্ঠানিকভাবে শূন্য নয়। ফলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক কার্যালয়ের নেতৃত্বে নিজের প্রভাব হারিয়েছে, কিন্তু নতুন প্রার্থী দেওয়ার পথও উন্মুক্ত হয়নি। দীর্ঘায়িত অনিশ্চয়তার সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক মূল্য সম্ভবত এখানেই।
বাংলাদেশ শুরু থেকেই সময়সীমাবদ্ধ স্বাধীন তদন্ত ও একটি সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত দাবি করলে দুটি পথের একটি খুলে যেত। অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সায়মা ওয়াজেদ দায়িত্বে ফিরতেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার নিয়োগ বাতিল করে নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করা যেত এবং বাংলাদেশ একজন যোগ্য, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী দিয়ে পদটি ধরে রাখার চেষ্টা করতে পারত।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কেবল সায়মা ওয়াজেদের পদে থাকা বা না থাকার নয়। মূল প্রশ্ন হলো, জাতীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আন্তর্জাতিকভাবে নির্বাচিত একজন কর্মকর্তার ম্যান্ডেট কতটা নিরাপদ, অভিযোগের বিচার কোন প্রক্রিয়ায় হবে এবং একটি সদস্যরাষ্ট্র কীভাবে জবাবদিহি নিশ্চিত করেও নিজের কূটনৈতিক অর্জন রক্ষা করবে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে যুক্তিসংগত নীতি হতে পারত অভিযোগের বিচার বাংলাদেশে, প্রশাসনিক তদন্ত ডব্লিউএইচওতে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়। প্রয়োজন হলে তার পর নতুন নির্বাচনে একজন শক্তিশালী বাংলাদেশি প্রার্থী। এই সমন্বিত কৌশলের অনুপস্থিতিই একটি ব্যক্তিগত ও আইনি বিতর্ককে বাংলাদেশের সম্ভাব্য বৈশ্বিক নেতৃত্ব হারানোর প্রশ্নে পরিণত করেছে।
(লেখক: সহিদুল আলম স্বপন—সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধ ও পরিপালন বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি)