বিমানকর্মীদের ক্যানসার ঝুঁকি নিয়ে গবেষণার চাঞ্চল্যকর তথ্য

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৪৩ পিএম
আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:০৪ পিএম
Main News Image

আকাশপথে যাতায়াত ভ্রমণপিপাসুদের আনন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্য দিলেও, ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩০ হাজার ফুট উঁচুতে বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করা পাইলট ও কেবিন ক্রু-দের জন্য তা তৈরি করছে নিঃশব্দ বিপদ। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিকিৎসা গবেষণা পত্রিকা JAMA Internal Medicine-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় বিমানকর্মীদের ক্যানসারে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। প্রায় ৫০০টিরও বেশি পেশার কর্মীদের ওপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গিয়েছে, সাধারণ কর্মীদের তুলনায় বিমানকর্মীদের মধ্যে তেজস্ক্রিয়তা বা রেডিয়েশন-সম্পর্কিত ক্যানসারে মৃত্যুর হার লক্ষণীয়ভাবে বেশি। যেখানে সাধারণ পেশার কর্মীদের ক্ষেত্রে এই অনুপাত প্রায় ৫ শতাংশ, সেখানে কেবিন ক্রু বা ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের ক্ষেত্রে এটি বেড়ে দাঁড়ায় ৬.৯ শতাংশ এবং পাইলটদের ক্ষেত্রে ৬.৭ শতাংশ। তবে গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন যে এটি কর্মক্ষেত্রের পরিবেশের সঙ্গে ক্যানসারে মৃত্যুর একটি সম্ভাব্য সম্পর্ক বা Association নির্দেশ করে, যা সরাসরি কোনো চূড়ান্ত কারণ (Direct Causation) হিসেবে প্রমাণিত নয়।

আসলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল মহাজাগতিক বিকিরণ বা 'কসমিক রেডিয়েশন'-এর বিরুদ্ধে একটি প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। কিন্তু বিমান যখন অত্যন্ত উঁচুতে পাতলা বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে ওড়ে, তখন সেই সুরক্ষাবলয় কমে যায়। ফলে সাধারণ মানুষের চেয়ে বিমানকর্মীরা বেশি মাত্রায় আয়োনাইজিং রেডিয়েশনের সংস্পর্শে আসেন। বিশেষ করে মেরু অঞ্চলের (Polar Routes) কাছাকাছি রুট, দীর্ঘ দূরত্বের ফ্লাইট, উচ্চতা এবং সৌর সক্রিয়তার ওপর ভিত্তি করে এই ঝুঁকির মাত্রা নির্ভর করে। টানা বহু বছর ধরে হাজার হাজার ঘণ্টা আকাশে কাটানোর ফলে আয়োনাইজিং রেডিয়েশন কোষ ও ডিএনএ-র ক্ষতি করে, যা পরবর্তীতে লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা, মাল্টিপল মায়লোমা, মেলানোমা (ত্বকের ক্যানসার), ব্রেস্ট ক্যানসার কিংবা থাইরয়েড ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

শুধু মহাজাগতিক রেডিয়েশনই নয়, বিমানকর্মীদের ক্যানসারের ঝুঁকির পেছনে তাদের অনিয়মিত জীবনযাত্রাও এক বড় ভূমিকা পালন করে। ঘন ঘন নাইট শিফট, টানা দীর্ঘ ডিউটি এবং ঘন ঘন টাইম জোন পরিবর্তনের কারণে তাদের শরীরের স্বাভাবিক বায়োলজিক্যাল ক্লক বা 'সার্কেডিয়ান রিদম'-এর মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে। দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের এই স্থায়ী সমস্যা ও শারীরিক ছন্দের পরিবর্তন ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের পথ প্রশস্ত করে। তবে এই তথ্য শুনে সাধারণ বিমানযাত্রীদের আতঙ্কিত হওয়ার বিন্দুমাত্র কারণ নেই। চিকিৎসকদের মতে, সাধারণ মানুষ যাঁরা বছরে বা মাসে কয়েকবার যাতায়াত করেন, তাঁদের শরীরে জমা হওয়া তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। কলকাতার বিশিষ্ট রেডিয়েশন অঙ্কোলজিস্ট ডাঃ সায়ন পাল জানিয়েছেন, একজন যাত্রী যদি বছরে ১০ বার লন্ডন-কলকাতা যাতায়াতও করেন, তবুও তাঁর রেডিয়েশন এক্সপোজার একেবারেই নগণ্য থাকে।

পাইলট ও কেবিন ক্রু-দের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এখন বিমান সংস্থাগুলোর বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। দীর্ঘ দূরত্বের ও মেরু অঞ্চলের রুটে কর্মরত বিমানকর্মীদের তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা নিয়মিত পরিমাপ করা, স্মার্ট রুট প্ল্যানিংয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত এক্সপোজার কমানো এবং কর্মীদের জন্য নিয়মিত হেলথ চেক-আপ ও প্রয়োজনীয় ক্যানসার স্ক্রিনিং নিশ্চিত করাই পারে ৩০ হাজার ফুট উঁচুতে কাজ করা এই মানুষদের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে।