যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেন স্বর্ণ সরাচ্ছে ইউরোপের দেশগুলো
ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিজেদের সংরক্ষিত স্বর্ণ সরিয়ে নিচ্ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সম্প্রতি নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিশ্চিত করেছে যে, তারা উত্তর আমেরিকা থেকে ৮৬ টন স্বর্ণ লন্ডনে স্থানান্তর করেছে। কোনো বড় ধরনের সংকটময় মুহূর্তে এই কৌশলগত সম্পদ যাতে সহজে ও দ্রুত ব্যবহার করা যায়, সে লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর সাম্প্রতিক পদক্ষেপ
• নেদারল্যান্ডস: উত্তর আমেরিকায় থাকা ৩১৩ টন স্বর্ণের মধ্য থেকে ৮৬ টন লন্ডনের 'ব্যাংক অব ইংল্যান্ড'-এর ভল্টে পাঠিয়েছে ডাচ কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে ৫৯ টন স্বর্ণ নিউ ইয়র্কে বিক্রি করে একই সাথে সমপরিমাণ স্বর্ণ লন্ডনে কিনে হিসাবভিত্তিক স্থানান্তর (accounting transfer) করা হয়েছে, যাতে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে পরিবহনের ঝুঁকি ও খরচ এড়ানো যায়।
• ফ্রান্স: ইতিপূর্বে যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিজেদের সব স্বর্ণের রিজার্ভ দেশে ফিরিয়ে এনেছে ফরাসি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
• জার্মানি: জার্মানির বুন্ডেসব্যাংক নিউ ইয়র্ক থেকে ১১১ টন এবং প্যারিস থেকে ১০৫ টনসহ মোট ২১৬ টনের বেশি স্বর্ণ নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়েছে।
স্বর্ণ সরিয়ে নেওয়ার মূল কারণসমূহ
১. ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক উত্তেজনা: বৈশ্বিক সামরিক সংঘাত ও বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে বিভিন্ন দেশ নিজেদের রিজার্ভ সম্পদ ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি ও নিরাপদ স্থানে রাখতে চাইছে।
২. দ্রুত লেনদেনের সুযোগ: অর্থনৈতিক সংকটের সময় দ্রুত স্বর্ণ কেনাবেচা বা তারল্যে রূপান্তর করার জন্য লন্ডন বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে উপযুক্ত কেন্দ্র। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্টে প্রায় চার লাখ স্বর্ণের বার সংরক্ষিত থাকায় এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় ভল্টিং কেন্দ্র।
৩. মুদ্রাস্ফীতি ও নিরাপদ বিনিয়োগ: স্বর্ণকে ধরা হয় অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে শক্তিশালী সুরক্ষা। গত ৫০ বছরে স্বর্ণের দাম ভোক্তা মূল্যসূচকের (CPI) চেয়ে দ্রুত গতিতে বেড়েছে, যা বৈশ্বিক সংকটে এটিকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সম্পদে পরিণত করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ কেনা ও বাজারের প্রভাব
গত চার বছরে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বছরে গড়ে এক হাজার টন করে স্বর্ণ সংগ্রহ করেছে, যা আগের দশকের গড় ক্রয়ের (৫০০ টন) প্রায় দ্বিগুণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ক্রমবর্ধমান এই চাহিদার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। বাজার বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম ৪,৯০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।