যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ৪ বছরের বেশি থাকতে লাগবে ফেডারেল অনুমতি
যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নরত বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসানীতি আরও কঠোর করার চূড়ান্ত পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। নতুন নীতি অনুযায়ী, ফেডারেল সরকারের বিশেষ অনুমতি ছাড়া কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী চার বছরের বেশি সময় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করতে না। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই নীতিমালার ফলে ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলিনা চ্যাপেল হিলসহ যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়তে যাওয়া বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে যাচ্ছে। নীতিমালার মূল পরিবর্তন : নতুন এই নীতিমালার আওতায় বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যমান নিয়মে বেশ কিছু বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে:
নির্দিষ্ট সময়সীমা আরোপ: আগে এফ-১ (F-1) ও জে-১ (J-1) ভিসাধারী শিক্ষার্থীরা 'ডিউরেশন অব স্ট্যাটাস' (Duration of Status) সুবিধায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পেতেন। এর অর্থ ছিল, ডিগ্রি বা কোর্স সম্পন্ন করতে যতদিন সময় লাগবে, তারা কোনো বাধা ছাড়াই দেশটিতে থাকতে পারতেন। নতুন নীতিতে এই সুযোগ বাতিল করে সর্বোচ্চ চার বছরের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় স্থানান্তর ও বিষয় পরিবর্তনে কড়াকড়ি: শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রম পরিবর্তন এবং এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তরের সুযোগও সীমিত করা হবে। এতদিন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর ক্ষমতা ছিল, যা নতুন নিয়মে বাতিল করা হচ্ছে।
দেশত্যাগের সময়সীমা হ্রাস: স্নাতক শেষ করার পর অথবা অন্য কোনো ভিসা ক্যাটাগরিতে পরিবর্তন করার জন্য আগে শিক্ষার্থীরা ৬০ দিন সময় পেতেন। নতুন নীতি অনুযায়ী, কোর্স শেষ হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে তাদের যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করতে হবে।
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় বড় ধাক্কা : যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ স্নাতক (Undergraduate) পর্যায়ের কোর্স সাধারণত চার বছরের হয়ে থাকে। তবে স্নাতকোত্তর, পিএইচডি (PhD) কিংবা ডক্টরেট পর্যায়ের অন্যান্য উচ্চতর ডিগ্রি সম্পন্ন করতে সাধারণত অনেক বেশি সময় লাগে।
বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিভিন্ন কোর্সে জটিল গবেষণা শেষ করে গবেষণাপত্র প্রকাশ করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়। এছাড়া গবেষণার অর্থায়নে (Funding) ঘাটতি এবং ব্যক্তিগত নানা পরিস্থিতির কারণেও পড়াশোনার সময়কাল প্রায়ই দীর্ঘায়িত হয়ে থাকে। নতুন এই ৪ বছরের সময়সীমার ফলে উচ্চতর গবেষণায় নিয়োজিত শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়বেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি : মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের মতে, এই নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য হলো ভিসার ব্যাপক অপব্যবহার প্রতিরোধ করা এবং নিয়মিত যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করা।
এ বিষয়ে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি মার্কওয়েন মুলিন বলেন, "দশকের পর দশক ধরে বিদেশি শিক্ষার্থীদের অনির্দিষ্টকালের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এটি হাজার হাজার মানুষকে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন কোর্সে ভর্তি হয়ে পড়াশোনার নামে এ দেশে থেকে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে, যা মূলত আমাদের অভিবাসন ব্যবস্থার চরম অপব্যবহার। নতুন নীতি এই প্রবণতা বন্ধ করবে।"
তীব্র সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়া : নতুন এই ভিসানীতিকে "ভুল নির্দেশিত এবং অপ্রয়োজনীয়" বলে অভিহিত করেছে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তির বিষয়ে পরামর্শ প্রদানকারী অলাভজনক সংস্থা 'নাফসা: অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেটরস' (NAFSA)।
সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী ফ্যান্টা আও তীব্র সমালোচনা করে বলেন, "এই নতুন নীতিমালা দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত কার্যকরভাবে পরিচালিত একটি ব্যবস্থার মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ভয়ের পরিবেশ তৈরি করছে। এটি এমন একটি কাল্পনিক সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করছে, যার বাস্তনা ও প্রতিক্রিয়া :বে কোনো অস্তিত্বই নেই।"
অভিবাসন সীমিত করার বৃহত্তর লক্ষ্য : বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমিয়ে আনা এবং যুক্তরাষ্ট্রে সামগ্রিক অভিবাসন সীমিত করার যে বৃহত্তর লক্ষ্য ট্রাম্প প্রশাসনের রয়েছে, এই নতুন ভিসানীতি তারই অংশ।
এর আগে কিছু অভিজাত ও নামী কলেজে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা সীমিত করার চেষ্টা করেছে প্রশাসন। একই সাথে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করা বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা বাতিলের মতো কঠোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। নতুন এই নিয়ম কার্যকর হলে তা বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীদের কাছে আমেরিকার উচ্চশিক্ষার আকর্ষণ অনেকটাই কমিয়ে দেবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।