বড় ঋণখেলাপিরা কেন শাস্তি পায় না

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০৫ এএম
আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৬ পিএম
Main News Image

বাংলাদেশে ব্যাংক খাত থেকে সামান্য ঋণ নিয়ে সময়মতো কিস্তি দিতে না পারলে দ্রুত নোটিশ ও মামলার সম্মুখীন হতে হয় সাধারণ গ্রাহকদের, অথচ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বছরের পর বছর ফেরত না দেওয়া বড় খেলাপিদের নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন নীতিগত ছাড়। তদারকির অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ব্যাংক পরিচালকদের নামে-বেনামে ঋণ নেওয়ার কারণে গত দুই দশকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ২০০৯ সালে দেশে খেলাপি ঋণ ২২ হাজার কোটি টাকা থাকলেও ২০২৫ সালের জুন শেষে তা বেড়ে ছয় লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

বড় ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার পেছনে একাধিক আইনি, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাধা কাজ করছে। অর্থঋণ আদালতে মামলা নিষ্পত্তি হতে দীর্ঘ পাঁচ থেকে সাত বছর সময় লেগে যায়, আর প্রভাবশালী খেলাপিরা অভিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগ করে বিচারপ্রক্রিয়া বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখেন। তাছাড়া, বড় খেলাপিদের অধিকাংশই বড় শিল্পগোষ্ঠী হওয়ায় তাদের কারখানা বন্ধ হলে ব্যাপক বেকারত্ব তৈরি ও রফতানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে সরকার ও ব্যাংকগুলো তাদের আইনের আওতায় আনার বদলে 'বাঁচিয়ে রাখার' সুযোগ তৈরি করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের পরিচালকরা নিজেরাই রক্ষকের বদলে ভক্ষকের ভূমিকা পালন করায় প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর শাস্তির বদলে ঋণ পুনর্গঠন ও 'ছাড়' দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি জারিকৃত নির্দেশনায় এক হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ খেলাপিদের দুই বছরের বিরতিসহ (গ্রেস পিরিয়ড) ১৫ বছরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুক্তিমতে, বৈশ্বিক সংকট ও সুদের হারের প্রভাবে ব্যবসায়ীদের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে অর্থ উদ্ধারের চেয়ে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত টাকা আদায় করা এবং কারখানা চালু রেখে কর্মসংস্থান বজায় রাখাই এই নীতি সহায়তার প্রধান অর্থনীতিবিদদের মতে, বারবার ছাড় দেওয়ার ফলে ব্যাংক খাতে 'অপরাধ করে পার পাওয়ার' সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে, যা ভালো ঋণগ্রহীতাদের নিরুৎসাহিত করছে। খেলাপি ঋণের কেবল 'কাগজে-কলমে' চিত্র পরিবর্তন না করে প্রকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। ইচ্ছা করে যারা ঋণ পরিশোধ করে না (উইলফুল ডিফল্টার), তাদের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ, অর্থঋণ আদালতে দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণ, খেলাপিদের বিদেশ ভ্রমণ ও নতুন ব্যবসায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া এবং ব্যাংক পরিচালকদের জবাবদিহির আওতায় আনা ছাড়া আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো অসম্ভব।

সূত্র : বিবিসি বাংলা