পুরোনো সেই দিনের কথা
এখানেও সন্ধ্যা নামে, কিন্তু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুনি না। তীব্র দুপুরে ঘুঘুর করুণ ডাক কানে আসে না। কতদিন চড়ুইয়ের ফুড়ুৎ করে উড়ে যাওয়া দেখি না! সকালে মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙে না, কোকিলের পঞ্চম সুরের ডাকও শোনা হয় না বহুদিন। বাঁশবাগানের ফাঁক দিয়ে চাঁদ দেখিনি সেই কবে থেকে! ন্যাংটো ছেলেমেয়েদের পুকুরের পানিতে ঝাঁপ দেওয়া কিংবা মাটির চুলায় রান্না করা মুরগির ঠ্যাং আর চালের রুটি আহা, কতদিন খাই না!
এখানেও পূর্ণিমার চাঁদ ওঠে, কিন্তু সেই চাঁদ ঠিক সেভাবে আমার মন ছুঁতে পারে না। বুঝতে পারছি, ছকে বাঁধা এই মুখস্থ জীবন আর ভালো লাগছে না। পরিচিত পুরোনো দিনের আড্ডা, খাওয়াদাওয়া আর গল্পগুলো এখন আমাকে ভীষণ টানে। আরও বুঝতে পারছি, প্রতিটি পুরোনো বন্ধুরই জীবনে আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।
এখানেও নদী আছে, তবে সেই নদী আর এই নদীর মধ্যে অনেক তফাৎ। এখানকার নদীতে মাঝি আছে, উড়ে যাওয়া বক আছে, মাছরাঙার পানিতে ঝাঁপ দেওয়াও আছে তবু এসব দৃশ্যকে আমি ঠিক আমার চেনা রূপে দেখতে পাই না। দৃশ্যগুলো চোখে পড়ে, কিন্তু হৃদয়ে সেই চিরপরিচিত অনুভূতি জাগায় না।
আগে প্রিয় মানুষদের খুঁজতাম। এখন অনলাইনে অসংখ্য মানুষের দেখা মেলে, অথচ মনের মতো মানুষ পাওয়া যায় না। বুঝতে শিখেছি, জীবনে সবকিছু কোনো দিনই মনের মতো হয় না। কিছু ইচ্ছা অপূর্ণ থেকেই যায়। তাই এখন আর হারানোর হিসাব রাখি না। যারা চলে যেতে চায়, তারা চলে যাক। শুধু এটুকুই ধরে নেব তারা কখনোই সত্যিকার অর্থে আমার জীবনের অংশ ছিল না।
ব্যথাকেও এখন সহনীয় করে নিতে শিখেছি। তাই এসব নিয়ে আর তেমন ভাবি না। আমি যে কোনো প্রাচীন উপাখ্যানের মতো নির্ভুল, সেই দাবিও করছি না। কিন্তু যারা স্বেচ্ছায় চলে যেতে চায়, তাদের ফিরে আসার জন্য রঙিন দরজা খুলে রাখারও আর কোনো অর্থ হয় না।
জীবন এক দ্রুতগামী ট্রেন। একের পর এক স্টেশন পেরিয়ে সে অবিরাম ছুটে চলে। কোনো স্টেশনে কেউ ওঠে, আবার অন্য কোনো স্টেশনে কেউ নেমে যায়। যাত্রাপথে কিছু মানুষ পাশে থাকে, কিছু মানুষ হারিয়ে যায় তবু ট্রেন থেমে থাকে না।
সময় এখন আমার চেয়েও দ্রুত দৌড়ায়। চোখের পলকে দিন চলে যায়, মাস পেরোয়, বছর ফুরায়। অথচ প্রত্যেক মানুষের প্রাপ্তি আলাদা, পূর্ণতার সংজ্ঞাও আলাদা। সব অপেক্ষার পরিণতি আমাদের ইচ্ছেমতো হয় না। অপেক্ষা তো আর এমন কোনো বিশেষ পণ্য নয়, যা চাইলেই নিজের পছন্দমতো কিনে নেওয়া যায়। অপূর্ণতার যন্ত্রণা নিয়েই কখনো কখনো মানুষকে জীবনের পথ চলতে হয়।
এখন আমার ছেলেরাই আমার জীবনের নতুন অধ্যায়। আমি তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। ওরা কথা বলে, আর আমি শুনি। একসময় আমি বলতাম, ওরা শুনত। সময়ের নিয়মে আজ সেই ভূমিকা বদলে গেছে।
এই বদলে যাওয়ার মধ্যেই হয়তো জীবনের গভীরতম সত্য লুকিয়ে আছে। পুরোনো দিনের মানুষ, প্রকৃতি, আড্ডা আর ভালোবাসা স্মৃতির ভেতর ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়। তবু মাঝেমধ্যে কোনো এক নিঃশব্দ সন্ধ্যায় তারা ফিরে আসে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক হয়ে, বাঁশবাগানের ফাঁকে দেখা চাঁদ হয়ে কিংবা মাটির চুলায় রান্না করা খাবারের চিরচেনা ঘ্রাণ হয়ে।
তখন মনে হয়, মানুষ দেশ ছেড়ে বহু দূরে চলে আসতে পারে; কিন্তু তার শৈশব, শিকড় আর পুরোনো দিনগুলো কখনো তাকে ছেড়ে যায় না।