প্রেম ও বিয়ে

শরীফুল আলম,
নিউইয়র্ক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৪ এএম
আপডেট: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৮ এএম
Main News Image

প্রেম, ওটা কি প্রমাণের বিষয়? না, মোটেও না। প্রেম হচ্ছে আলো আর অন্ধকারের মতো। প্রেম হচ্ছে, “তোমাকে সব সময় পাই, কিন্তু পুরোটা পাই না” টাইপের সমস্যা। আবার এর উল্টো দিকটাও দেখুন। প্রেম করে বিয়ে করা মানুষটি বড়জোর দুই মাস ‘আপনি’ সম্বোধন পায়। এক বছর পরে সেই লোকটিকেই বলা হয়, “গেদার বাপ, কৈ গেলা?”। আর কিছুদিন পর, “তোরে বিয়া কইরা আমার জীবনটাই বরবাদ!”

প্রেম সর্বগ্রাসী। সবাই তা গ্রহণ করতে পারে না। প্রেম সহ্য করার ক্ষমতা সবার জন্য নয়। আবার কিছু কিছু প্রেম আছে, যা ধরা যায় না, দেখা যায় না, বলাও যায় না। প্রশ্ন হলো, প্রেম কি তাহলে আজীবন শুধু চেয়ে চেয়ে দেখার বিষয়?

দেখুন, “খাব আমি”, “আমি খাব”, “খেতে দাও”, “ক্ষুধা লেগেছে” এই কথাগুলোর অর্থ ভিন্ন হলেও মর্মার্থ কিন্তু একই। আমি মনে করি, প্রেম করে যারা বিয়ে করে, তাদের অন্তত এক বছরের একটি ‘Provisional Period’ (শিক্ষানবিশকাল) থাকা উচিত।

স্মৃতিজড়ানো প্রেমিক-প্রেমিকাদের ক্ষেত্রে, যেমন কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে বসে ফুচকা খাওয়া, একজন আরেকজনকে বাদামের খোসা ছাড়িয়ে দেওয়া, তাদের জন্য এই সময়সীমা তিন-চার বছরও হতে পারে। তবে অপেক্ষা পুষে রাখা কঠিন। অপেক্ষা আকাশের মতো বিশাল, সমুদ্রের নীল জলরাশির চাইতেও গভীর।

দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশে শরীরকে অনেক সময় পুরুষের ইচ্ছাপূরণের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়, আর নারীর ভূমিকা হয়ে দাঁড়ায় সহনশীলতার। পঞ্চাশ পেরোলেই অনেক নারীর মধ্যে এক ধরনের অপরাধবোধ কাজ করতে দেখা যায়। পুরুষ চায় হাজার নারীর সঙ্গে জেনেটিক বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করতে, কিন্তু নিজের সঙ্গীকে ভাগ করতে চায় না। এটা ভালোবাসা নয়; এটাকে আমি বলি ঈর্ষা।

বেরসিক মানুষগুলো দাম্পত্য জীবনে কখনোই প্রকৃত সুখী হতে পারে না। আমি লক্ষ্য করে দেখেছি, আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে হাসির অভ্যাস খুবই কম। মানুষ ছুটছে তো ছুটছেই, আর প্রত্যেকের অভিব্যক্তি আলাদা। আমরা মানুষ হয়েও হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগল, বিড়াল কিংবা কুকুরকে ভালোবেসে ফেলি; অথচ মানুষকে ভালোবাসতে পারি না।

কী কী আমাদের ছাড়তে হবে, আর কী কী আমাদের জীবনে যোগ করতে হবে, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে। মানুষ প্রয়োজনেই প্রিয়জন খুঁজে নেয়, এই সত্যটাও বুঝতে হবে। দেখুন, কাঁচা ফুলের চেয়ে নকল ফুলের দাম বেশি হতে পারে, তারপরও মানুষ তাজা ফুলই পছন্দ করে।

ভালোবাসার জন্য মেধাবী হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। মেধাবীদের আমি কখনোই জিততে দেখিনি। যারা পরিশ্রমী, তারাই জেতে। আর পরিশ্রমীরা প্রকৃত অর্থে হারেও না। ভালোবাসাতেও পরিশ্রমী হতে হবে। তবে প্রত্যাশা (Expectation) যত কম হবে, কষ্টও তত কম হবে।

মনে রাখবেন, প্রত্যেকটি ঋতুই একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সুন্দর ও উপভোগ্য। মানুষের ক্ষেত্রেও তাই। পৃথিবীর সব সম্পর্কই একটি সীমার মধ্যে আবদ্ধ। পুরোনো, নষ্ট ও বিবর্ণ ফুলকে ডাঁটা কেটে, স্প্রে করে আবার ব্যবহার করা যায়; কিন্তু যথাযথ যত্ন না নিলে পুরোনো মানুষকে নতুন করে পাওয়া কঠিন।

আপনার প্রিয় মানুষটিকে সবটুকু ভালোবাসা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। যতটুকু প্রেম এখনো আছে, তা যেন সত্যিকারের প্রেম হয়, তাতেই যথেষ্ট। দেরিতে আসুক, কিন্তু সঠিক মানুষটি যেন জীবনে আসে। প্রতিদিন একটু একটু ভালোবাসা পেলেই অনেক ভালোবাসার প্রয়োজন হয় না।

সৌন্দর্য আসলে একটি মোহ। তা কিছু সময় পর কেটে যায়। তবে এটাও সত্য, কিছু মানুষ সৌন্দর্যে প্রভাবিত হয়। আবার লাবণ্যও মানুষকে মুগ্ধ করে। কিন্তু এগুলো যাচাইয়ের শেষ ধাপ নয়। যেখানে মূল্য নেই, সেখানে অনুভূতি ব্যয় করারও কোনো অর্থ নেই।

শেষ কথা হলো, সম্পর্ক হতে হবে দ্বিপাক্ষিক। মানুষ ভালোবাসা ছাড়া বাঁচতে পারে না। প্রেম করেই বিয়ে করতে হবে কেন? যারা এই নিয়ে আহাজারি করেন, তারা মূলত প্রেমও বোঝেন না, বিয়েও বোঝেন না। প্রেম প্রকৃতির, আর বিয়ে সমাজের। সামাজিক বিধিবিধান না মানলে প্রেমিক-প্রেমিকাদের বিপাকে পড়তে হবে, এটাই স্বাভাবিক। প্রেমে কোনো চুক্তি লাগে না, কিন্তু বিয়েতে চুক্তি লাগে।

ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে। এটি আপনার লেখার ভাব, প্রেমের প্রতীকী উপস্থাপনা এবং লেখকের প্রতিচ্ছবিকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে।