স্বপ্নের কোনো অবসর নেই: ৮৯ বছর বয়সে পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি
বয়স যখন ৮৯, তখন অধিকাংশ মানুষই জীবনের অর্জনগুলো ফিরে দেখেন। নতুন কোনো কঠিন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করা কিংবা গবেষণাগারে বসে জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান করার কথা খুব কম মানুষই ভাবেন। কিন্তু অস্ট্রিয়ায় জন্ম নেওয়া মার্কিন চিকিৎসক ম্যানফ্রেড স্টেইনার ছিলেন ব্যতিক্রম। জীবনের প্রায় সাত দশক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও শিক্ষকতায় কাটানোর পর তিনি ফিরে গিয়েছিলেন কৈশোরের স্বপ্নের কাছে। সেই স্বপ্ন ছিল একজন পদার্থবিদ হওয়া।
অদম্য আগ্রহ, দীর্ঘ অধ্যবসায় এবং শেখার আনন্দকে সঙ্গী করে স্টেইনার ২০২১ সালে, ৮৯ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ আইভি লিগ প্রতিষ্ঠান ব্রাউন ইউনিভার্সিটি থেকে পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তাঁর জীবন যেন প্রমাণ করে মানুষের বয়স বাড়তে পারে, কিন্তু স্বপ্নের বয়স কখনো বাড়ে না।
পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি কৈশোরের ভালোবাসা
১৯৩১ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় জন্মগ্রহণ করেন ম্যানফ্রেড স্টেইনার। কৈশোর থেকেই পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ ছিল। প্রকৃতির অতি ক্ষুদ্র কণা থেকে মহাবিশ্বের বিশালতা সবকিছুকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট সূত্রের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা তাঁকে মুগ্ধ করত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপে অবশ্য বাস্তবতা ছিল কঠিন। সে সময় পরিবারের সদস্যরা তাঁকে পদার্থবিজ্ঞানের পরিবর্তে তুলনামূলক নিরাপদ ও বাস্তবমুখী পেশা হিসেবে চিকিৎসাবিজ্ঞান বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি সেই পরামর্শ মেনে ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন এবং ১৯৫৫ সালে মেডিকেল ডিগ্রি অর্জন করেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হলেও পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি তাঁর আকর্ষণ হারিয়ে যায়নি। সুযোগ পেলেই তিনি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের বক্তৃতা শুনতে যেতেন। তবে পেশাগত দায়িত্ব এবং জীবনের বাস্তবতা তাঁকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পথেই এগিয়ে নিয়ে যায়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে সফল কর্মজীবন
যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর পর স্টেইনার ইন্টারনাল মেডিসিন ও হেমাটোলজি বা রক্তরোগবিদ্যায় বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ নেন। পরে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি এমআইটি থেকে প্রাণরসায়নে পিএইচডি অর্জন করেন।
চিকিৎসক, গবেষক ও শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন ছিল দীর্ঘ এবং সফল। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির মেডিকেল স্কুলে তিনি অধ্যাপনা করেছেন এবং অসংখ্য শিক্ষার্থীকে রক্তরোগবিদ্যা সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছেন। ১৯৭৮ সালে তিনি পূর্ণ অধ্যাপক হন। চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণায়ও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল।
কিন্তু এত সাফল্যের মধ্যেও তাঁর মনে একটি অপূর্ণতা থেকে গিয়েছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞান ছিল তাঁর পেশা, আর পদার্থবিজ্ঞান ছিল তাঁর আজীবনের ভালোবাসা।
অবসর মানেই থেমে যাওয়া নয়
২০০০ সালে প্রায় ৭০ বছর বয়সে চিকিৎসা পেশা থেকে অবসর নেন স্টেইনার। সাধারণ অর্থে অবসর বলতে যেখানে বিশ্রাম, বিনোদন কিংবা কর্মব্যস্ততা থেকে দূরে সরে যাওয়াকে বোঝানো হয়, সেখানে তিনি বেছে নেন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ।
তিনি সিদ্ধান্ত নেন, জীবনের বাকি সময় শুধু অতীতের স্মৃতি নিয়ে কাটাবেন না। বরং বহু বছর ধরে লালন করা পদার্থবিদ হওয়ার স্বপ্নটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন।
প্রথমে এমআইটিতে পদার্থবিজ্ঞানের ক্লাস নেওয়া শুরু করেন। কিন্তু নিয়মিত যাতায়াত কষ্টকর হয়ে পড়ায় পরে ব্রাউন ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা চালিয়ে যান। সেখানে তাঁর সহপাঠীদের অধিকাংশের বয়স ছিল ২০ বছরের কাছাকাছি। বয়সের বিরাট ব্যবধান সত্ত্বেও তিনি নিজেকে আলাদা করে দেখেননি। অন্য শিক্ষার্থীদের মতোই ক্লাস করেছেন, পরীক্ষা দিয়েছেন এবং কঠিন গাণিতিক সমস্যার সমাধান করেছেন।
প্রথম দিকে তাঁর লক্ষ্য পিএইচডি অর্জন ছিল না। কৌতূহল মেটানো এবং মনকে সক্রিয় রাখাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু ধীরে ধীরে প্রয়োজনীয় কোর্সগুলো শেষ করার পর ২০০৭ সালে তিনি ব্রাউন ইউনিভার্সিটির পিএইচডি কর্মসূচিতে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করেন।
জটিল তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণা
স্টেইনারের পিএইচডি গবেষণার বিষয় ছিল ‘বোসোনাইজেশন’ নামে পরিচিত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের একটি জটিল ধারণা। সহজভাবে বলতে গেলে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ফার্মিয়ন নামের এক ধরনের মৌলিক কণার আচরণকে বোসন নামের আরেক ধরনের কণার ভাষায় ব্যাখ্যা করার গাণিতিক পদ্ধতিই বোসোনাইজেশন।
তাঁর অভিসন্দর্ভের শিরোনাম ছিল Corrections to the Geometrical Interpretation of Bosonization। অধ্যাপক ব্র্যাড মার্সটনের তত্ত্বাবধানে তিনি গবেষণাটি সম্পন্ন করেন।
কোয়ান্টাম মেকানিকস, উচ্চতর গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের মতো কঠিন বিষয় আয়ত্ত করা যেকোনো বয়সের শিক্ষার্থীর জন্যই চ্যালেঞ্জিং। সেখানে সত্তর ও আশির দশকে পৌঁছে স্টেইনারের এই গবেষণা চালিয়ে যাওয়া ছিল অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তার পরিচয়।
দীর্ঘ প্রস্তুতি ও গবেষণার পর ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি সফলভাবে অভিসন্দর্ভের প্রতিরক্ষা সম্পন্ন করেন। তখন তাঁর বয়স ৮৯ বছর। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির আনুষ্ঠানিক তথ্যানুযায়ী, এটি ছিল তাঁর তৃতীয় ডক্টরাল ডিগ্রি; কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের এই ডিগ্রিকেই তিনি সবচেয়ে বেশি মূল্যবান বলে মনে করতেন। কারণ এর মধ্য দিয়ে পূরণ হয়েছিল তাঁর কৈশোরের অসমাপ্ত স্বপ্ন। ব্রাউন ইউনিভার্সিটি
শিক্ষা শুধু চাকরির প্রস্তুতি নয়
স্টেইনারের জীবন আমাদের শিক্ষা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাটি নতুন করে ভাবতে শেখায়। অনেকের কাছে লেখাপড়ার প্রধান উদ্দেশ্য একটি ডিগ্রি অর্জন, চাকরি পাওয়া কিংবা পেশাগত উন্নতি। অথচ শিক্ষা তার চেয়েও বড় কিছু। জানার আনন্দ, কৌতূহল মেটানো এবং নিজের মানসিক জগৎকে সমৃদ্ধ করাও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।
৮৯ বছর বয়সে অর্জিত পিএইচডি স্টেইনারের নতুন চাকরি পাওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল না। সামাজিক প্রতিষ্ঠা বা পেশাগত স্বীকৃতিরও তাঁর অভাব ছিল না। তিনি পড়েছিলেন কেবল জানার আগ্রহ থেকে। আর সেই আগ্রহই তাঁকে আবার শিক্ষার্থী হওয়ার সাহস দিয়েছিল।
তাঁর গল্প আরও দেখায়, অবসর জীবনের সমাপ্তি নয়; এটি নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনাও হতে পারে। দীর্ঘ কর্মজীবনের পর মানুষ চাইলে নতুন ভাষা শিখতে পারেন, সাহিত্যচর্চা শুরু করতে পারেন, গবেষণায় যুক্ত হতে পারেন কিংবা বহুদিনের কোনো অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন।
বয়স নয়, লক্ষ্যই বড়
আজকের প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীতে অনেক মানুষই বয়স, সময় কিংবা পরিস্থিতিকে স্বপ্নপূরণের পথে বাধা হিসেবে দেখেন। কেউ ভাবেন ত্রিশের পর নতুন বিষয়ে পড়াশোনা করা কঠিন, কেউ চল্লিশের পর পেশা পরিবর্তন করতে ভয় পান, আবার কেউ অবসরের পর নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে করতে শুরু করেন।
ম্যানফ্রেড স্টেইনারের জীবন এসব ধারণার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী উত্তর। তবে তাঁর গল্পের শিক্ষা এই নয় যে প্রত্যেককে ৮৯ বছর বয়সে পিএইচডি করতে হবে। মূল শিক্ষা হলো শেখা ও আত্মবিকাশের পথ মানুষের জন্য সারাজীবন খোলা থাকতে পারে।
স্টেইনার ২০২৩ সালের ৭ জানুয়ারি ৯১ বছর বয়সে মারা যান। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া বার্তাটি আজও জীবন্ত: জীবনে কোনো স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে গেলে, সুযোগ ও সামর্থ্য থাকা পর্যন্ত তার কাছে ফিরে যাওয়া যায়।
মানুষ যত দিন কৌতূহলী থাকে, তত দিন সে প্রকৃত অর্থে তরুণ। আর ইচ্ছাশক্তি যদি প্রবল হয়, তবে জীবনের শেষ অধ্যায়টিও হয়ে উঠতে পারে নতুন যাত্রার সবচেয়ে উজ্জ্বল সূচনা।
(লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি। ইমেইল: shahidul.alam@bluewin.ch)