জলবিদ্যুতে নির্ভরতা: বন্যা ও জলবায়ু সংকটে নেপালের জ্বালানি খাত
জলবিদ্যুতের ওপর প্রায় শতভাগ নির্ভর করে নিজেদের বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ভারত ও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি করে বছরে প্রায় ২০ কোটি ডলার আয় করে নেপাল। তবে হিমালয় অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তন এবং সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা দেশটির এই একাংশকেন্দ্রিক জ্বালানি কাঠামোর ভঙ্গুরতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে।
সাম্প্রতিক বিপর্যয় ও বিদ্যুৎ খাতের ক্ষয়ক্ষতি
সম্প্রতি তিব্বত ও নেপাল সীমান্তের কাছের এলাকায় আঘাত হানা ভয়াবহ বন্যায় এক হাজার ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। ব্যাপক প্রাণহানির পাশাপাশি ত্রিশূলী নদী অববাহিকার ১২টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার ১০ শতাংশেরও বেশি অকেজো হয়ে পড়ে। হিমালয়ের উঁচু অঞ্চল বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় ৫০ শতাংশ দ্রুত উষ্ণ হওয়ায় জলবায়ু-সম্পর্কিত এমন দুর্যোগের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।
একক উৎসে নির্ভরতা ও বিকল্পের তাগিদ
বর্তমানে নেপালে ২২৫টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে তিন হাজার ৯০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপন্ন হলেও বেশিরভাগ কেন্দ্রই নদীপ্রবাহের ওপর ভিত্তি করে পাহাড়ের উঁচুতে তৈরি, যেখানে পানি সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সব সক্ষমতা একক কোনো উৎসে না রেখে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের মতো বিকল্প যুক্ত করা জরুরি। গবেষণায় দেখা গেছে, নেপালে সৌরশক্তির সম্ভাবনা জলবিদ্যুতের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি।
অবকাঠামো ও আর্থিক ক্ষতি
পরিকল্পনা ও সতর্কতার ঘাটতিতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অর্থায়নে প্রায় ৬৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার ব্যয়ে নির্মিত 'আপার ত্রিশূলী-১' এবং 'আপার ত্রিশূলী-৩' কেন্দ্র দুটি বন্যায় মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। গত তিন বছরে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বেসরকারি প্লান্টগুলোর বিপরীতে বিমা কোম্পানিগুলোকে প্রায় চার কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে, যার ফলে বিমা প্রিমিয়াম বৃদ্ধি পেয়ে বিদ্যুৎ ব্যবসার পরিচালনা ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পথরেখা ও আন্তর্জাতিক দায়িত্ব
পরিস্থিতি উত্তরণে কেবল পাহাড়ের উঁচুতে প্লান্ট না বানিয়ে জলাধারভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা জোরদার এবং টেকসই নকশায় অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও নেপালকে জলবায়ু পরিবর্তনের চরম মাশুল দিতে হচ্ছে। তাই এককভাবে নেপালের ওপর দায় না রেখে এই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানানো হচ্ছে।