নীরব ঘাতক কিডনি রোগ

দেশে আক্রান্ত ৫ জনে একজন প্রাপ্তবয়স্ক

ডা. শুভাশীষ রায়
প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৫ পিএম
আপডেট: ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫০ এএম
Main News Image

নীরব ঘাতক কেন? বিশেষজ্ঞরা কিডনি রোগকে 'নীরব ঘাতক' হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর প্রধান কারণ হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগের কোনো স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। যখন উপসর্গ দেখা দেয়, ততক্ষণে কিডনি প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় রোগীর জীবন বাঁচাতে ডায়ালাইসিস অথবা কিডনি প্রতিস্থাপন ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না।

ভয়াবহ পরিসংখ্যান
বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০ জনে একজন কিডনি রোগে আক্রান্ত হলেও বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। বর্তমানে দেশে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার রোগীর নিয়মিত ডায়ালাইসিস প্রয়োজন। কিন্তু অত্যন্ত সীমিত সুযোগ-সুবিধার কারণে অর্ধেকেরও কম রোগী এই সেবা পাচ্ছেন। ফলে সঠিক চিকিৎসার অভাবে অনেকেরই অকাল মৃত্যু হচ্ছে।

আক্রান্ত হওয়ার মূল কারণ বাংলাদেশে কিডনি রোগ বৃদ্ধির পেছনে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে অনেক রিসার্চে দেখা গিয়েছে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস কমপক্ষে ১০ বছর ধরে অনিয়ন্ত্রিত থাকলে দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের সূচনা হয়। অন্যান্য

কারণগুলোর ভেতরে রয়েছে-
গোমেরুলোনাইটিস (Glomerulonephritis): এটি কিডনির ফিল্টার বা গোমেরুলিতে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন সৃষ্টি করে, যা সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করলে কিডনি বিকল করে দিতে পারে।

পলিসিস্টিক কিডনি রোগ (Polycystic Kidney Disease): এটি একটি বংশগত / জেনেটিক ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার: রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে ব্যথানাশক ওষুধ বা ঘঝঅওউং সেবন কিডনির টিস্যুর অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারে।

মূত্রনালীর সমস্যা: দীর্ঘদিনের প্রস্রাবে সংক্রমণ (টঞও), কিডনিতে পাথর কিংবা বয়স্ক পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রস্টেট বড় হয়ে যাওয়ার ফলে প্রস্রাবের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এই দীর্ঘস্থায়ী বাধা কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

অন্যান্য ঝুঁকি
অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ ছাড়াও লুপাসের মতো অটোইমিউন রোগ কিডনির ক্ষতি করে। পাশাপাশি অতিরিক্ত ওজন (স্থূলতা), ধূমপান এবং বয়স ৬০ বছরের বেশি হলে কিডনি রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

বর্তমানে দেশে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। পাশাপাশি প্রতি চারজন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। উদ্বেগের বিষয় হলো, এদের অধিকাংশই জানেন না যে তারা এই ব্যাধিগুলো বহন করছেন, যা ধীরে ধীরে তাদের কিডনি বিকল করে দিচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সুষম খাদ্যভ্যাস এবং ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমেই এই মহামারি ঠেকানো সম্ভব। অন্যথায় ভবিষ্যতে এটি জাতীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ে আরও বড় অর্থনৈতিক ও জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি করবে।

আগেভাগে শনাক্তকরণই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান
কিডনির রোগ আগেভাগে শনাক্ত করা গেলে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। রক্তচাপ মাপা, প্রস্রাবে অ্যালবুমিন পরীক্ষা, রক্তে ক্রিয়েটিনিন ও রক্তে শর্করা-ই সাধারণ ও কম খরচের পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমেই ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের শনাক্ত করা যায়।

বাংলাদেশে কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে যদি নিয়মিত কিডনির স্ক্রিনিং যুক্ত করা যায়, তাহলে হাজার হাজার মানুষকে ডায়ালাইসিসের ভয়াবহ পরিণতি থেকে রক্ষা করা সম্ভব। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, মাতৃস্বাস্থ্য ও অসংক্রামক রোগ কর্মসূচির সঙ্গে কিডনি পরীক্ষা যুক্ত করা হলে খরচ কমবে এবং কার্যকারিতা বাড়বে।

আমাদের করণীয়
কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালকের তীব্র গরমে, প্রখর রোদে কাজের ফাঁকে নিরাপদ পানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা ও বিশ্রামের ব্যবস্থা বা কৃষক শেড নির্মাণ এবং স্বাস্থ্যসচেতন করা।
কিডনির রোগ প্রতিরোধ ও আগেভাগে শনাক্তকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য নিয়মিত স্ক্রিনিং চালু করা।

কিডনি সুস্থ রাখার কিছু নিয়ম সর্বস্তরে প্রচার করা; যেমন রক্তচাপ ও সুগার নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা, পাতে লবণ বা অতিরিক্ত লবণ জাতীয় খাবার ও অতিরিক্ত চিনি/ মিষ্টি জাতীয় খাবার বর্জন, মদ্যপান ও ধূমপান না করা, সুষম খাদ্য গ্রহণ করা নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করা, ওজন নিয়ন্ত্রণ, ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত ব্যথানাশক ওষুধ গ্রহণ পরিহার করা, নিয়মিত কিডনির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা।

লেখক: চিকিৎসক