সুচিত্রার লোকচক্ষুর আড়ালের পেছনে উত্তম
উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেন। ছবি: সংগৃহীত
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মহানায়ক উত্তম কুমার ও মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের জুটি এক অনবদ্য অধ্যায়। ১৯৫৩ সালে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রথম একসঙ্গে পর্দায় আসেন এই দুই কিংবদন্তি। এর পরের বছর ‘অগ্নিপরীক্ষা’ সিনেমার মধ্য দিয়ে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে তাঁদের জুটি। পরবর্তীতে ‘পথে হলো দেরী’, ‘শাপমোচন’, ‘সাগরিকা’, ‘হারানো সুর’, ‘সবার উপরে’ ও ‘দীপ জ্বেলে যাই’-এর মতো প্রায় ৩০টি সুপারহিট চলচ্চিত্রে তাঁরা একসঙ্গে অভিনয় করেন, যা বাংলা সিনেমার গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়েছিল।
পর্দায় তাঁদের রোমান্স এতটাই জীবন্ত ছিল যে, সাধারণ দর্শকরা বাস্তবেও তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে নানা গুঞ্জন করতেন। তবে তাঁদের সম্পর্কটি ছিল মূলত এক গভীর বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের। উত্তম কুমার ভালোবেসে সুচিত্রাকে ডাকতেন ‘রমা’, আর সুচিত্রা তাঁকে ডাকতেন ‘উতু’। তৎকালীন পুরুষপ্রধান চলচ্চিত্র শিল্পে সুচিত্রা সেন নিজের আত্মসম্মানের জায়গায় ছিলেন অত্যন্ত আপসহীন। পারিশ্রমিক কিংবা সিনেমার পোস্টারে নামের অবস্থানের ক্ষেত্রে তিনি যেমন নিজের যোগ্য পাওনা আদায় করে নিতেন, তেমনই এই পেশাদার প্রতিযোগিতা তাঁদের ব্যক্তিগত বন্ধুত্বে কখনো কোনো আঘাতের কারণ হয়ে ওঠেনি।
১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই উত্তম কুমারের আকস্মিক প্রয়াণে বাংলা চলচ্চিত্রের একটি সোনালী যুগের অবসান ঘটে। বন্ধুকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সুচিত্রা সেন দিনের বেলা ভিড়ের মাঝে না গিয়ে গভীর রাতে নিভৃতে উত্তমের বাড়িতে পৌঁছান। মিডিয়া ও ক্যামেরার কোলাহল এড়িয়ে মরদেহের পাশে নিরবে দাঁড়িয়ে কপালে হাত রাখেন এবং একটি গোলাপের মালা দিয়ে নিজের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ১৯৭৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘প্রণয় পাশা’ সিনেমায় অভিনয়ের পর থেকেই তিনি অভিনয়ে অনিয়মিত ছিলেন, কিন্তু উত্তম কুমারের প্রয়াণ তাঁর মানসিক জগতে এক গভীর পরিবর্তন আনে। এর পর তিনি রুপালি জগৎ, মিডিয়া ও জনজীবন থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নেন এবং কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের ফ্ল্যাটে দীর্ঘ ৩৪ বছর লোকচক্ষুর অন্তরালে জীবনযাপন করেন।