সিনেমায় রূপ বদলের কলকাতা
বাংলা সিনেমার ইতিহাসে সময় ও পরিচালকদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সাথে সাথে কলকাতার রূপায়নও বদলেছে নানাভাবে। আমরা দেখে নিতে পারি সেই বদলের এক ঝলক।
ক্লাসিক ও রাজনৈতিক ধারা (সত্যজিৎ রায় ও মৃণাল সেন)
যান্ত্রিক ও ঔপনিবেশিক কলকাতার চিত্র সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন সত্যজিৎ রায়। তার ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘মহানগর’ ছবিতে শহরটি উত্তর-ঔপনিবেশিক ও যন্ত্রের মতো নিখুঁত কিন্তু কঠোর। এখানে চাকরির সংগ্রাম, তরুণদের বিচ্ছন্নতা এবং পুঁজিবাদী মানসিকতা স্পষ্ট ধরা পড়ে।
রাজনৈতিক বিপ্লব ও অস্থিরতার প্রতিরূপ যেন মৃণাল সেনের সিনেমা। ‘ইন্টারভিউ’, ‘কলকাতা ৭১’ ও ‘পদাতিক’-এ মৃণাল সেন সত্তরের দশকের রাজনৈতিক আন্দোলন, যুবদের বিপ্লবী মানসিকতা ও খণ্ডিত শহরের রূপ দেখা যায়। পরবর্তীতে ‘মহাপৃথিবী’ ছবিতে তিনি বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে কলকাতাকে প্রত্যক্ষ করেছেন।
বহুসংস্কৃতি ও নস্ট্যালজিক শহর (অঞ্জন দত্ত ও ঋতুপর্ণ ঘোষ)
বহুসাংস্কৃতিক ও অবাধ্য কলকাতার চিত্ররূপের দেখা মেলে অঞ্জন দত্ত ও ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমায়। অঞ্জন দত্তের ‘বড়া দিন’, ‘বো-ব্যারাকস ফর এভার’, ‘ম্যাডলি বাঙালি’ ও ‘দত্ত ভার্সাস দত্ত’-তে পার্ক স্ট্রিট, কসমোপলিটান জীবন ও অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সংস্কৃতির মেজাজ ফুটে উঠেছে। তাঁর ফ্রেমে শহরটি কেবল ব্যাকগ্রাউন্ড নয়, বরং প্রধান চরিত্রের ভাগ্য নির্ধারণকারী এক সঙ্গী।
মহানাগরিক নান্দনিকতা ধরা পড়েছে নব্বইয়ের দশকে ঋতুপর্ণ ঘোষ পরিচালিত ‘১৯শে এপ্রিল’, ‘বাড়িওয়ালি’ ও ‘দোসর’ এ। তিনি চলচ্চিত্রকে শহরমুখী করেন। আর্ট ডেকো বাড়ি, দক্ষিণের ছায়াময় গলি ও মধ্যবিত্তের মনস্তাত্ত্বিক নান্দনিকতা তুলে ধরেন এ ঋদ্ধ পরিচালক।
বিশ্বায়ন ও আধুনিকতার রূপান্তর (মৈনাক ভৌমিক ও আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্ত)
ক্যাফে ও আধুনিক জীবনে সবাক ভ্রমণ মৈনাক ভৌমিকের সিনেমা। তার ‘কলকাতা কলিং’ ও ‘মাছ মিষ্টি অ্যান্ড মোর’-এ শপিং মল, ক্যাফে ও বিশ্বায়নের প্রভাবে তরুণ প্রজন্মের স্বাধীনতা ও মধ্যবিত্ত জীবনের দ্বন্দ্ব দেখা যায়।
কলকাতার শব্দকাব্য ও নগর রূপান্তর ঘটেছে আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্ত পরিচালিত ‘আসা যাওয়ার মাঝে’ ছবিতে। এখানে কোনো সংলাপ ছাড়াই ট্রাম, প্রেসের শব্দ ও হকারের ডাকে শ্রমজীবী কলকাতা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ক্যালকাটা’-য় পুরনো প্রেক্ষাগৃহের বিলুপ্তি ও সায়েন্স সিটির কৃত্রিমতার দ্বন্দ্বে শহরের বিষণ্ণ রূপ ধরা পড়ে।
মনস্তত্ত্ব, প্রান্তিক ও ভিন্ন ধারার চিত্রায়ণ (অতনু, কৌশিক, ইন্দ্রনীল ও সৃজিত)
মনস্তত্ত্ব ও স্মৃতির শহরের দেখা মেলে অতনু ঘোষের সিনেমায়। তার ‘অ্যাবি সেন’, ‘বিনিসুতোয়’ ও ‘শেষ পাতায়’ ছবিতে আশির দশক ও একুশ শতকের কলকাতার সংঘাত, মানুষের একাকিত্ব এবং স্মৃতির শহর প্রাধান্য পেয়েছে।
প্রান্তিক জীবন ও শব্দকথায় কলকাতা বিমূর্ত হয়েছে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের সিনেমাতে। তার ‘শব্দ’, ‘সিনেমাওয়ালা’ ও ‘নগরকীর্তন’-এ একক প্রেক্ষাগৃহ থেকে মাল্টিপ্লেক্সের পরিবর্তন, প্রান্তিক জীবন এবং ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের আশ্রয়স্থল হিসেবে শহরটিকে দেখানো হয়েছে।
দুঃস্বপ্ন ও রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি কলকাতাকে দেখা যায় ইন্দ্রনীল রায় চৌধুরীর সিনেমায়। তার ‘মায়ার জঞ্জাল’-এ শহরের রোমান্টিকতার বিপরীতে টিকে থাকার লড়াই এবং সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘২২শে শ্রাবণ’-এ কবিতানির্ভর থ্রিলারের আবহ দিয়ে শহরকে এক দমবন্ধ দুঃস্বপ্ন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।