‘নিজের মানুষকে হারালাম’, স্মৃতিকাতর ইন্দ্রাণী হালদার

বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫৮ পিএম
আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৫ এএম
Main News Image

বাংলা চলচ্চিত্র জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটল। ১৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে প্রয়াত হলেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত বর্ষীয়ান পরিচালক রাজা সেন। সম্প্রতি বাড়িতে আচমকা পড়ে গিয়ে কোমরে গুরুতর চোট পেয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই বিশিষ্ট চিত্রপরিচালক। তাঁর এই আকস্মিক প্রয়াণে সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্র মহলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তবে কেবল এক জন সফল নির্দেশক হিসেবেই নয়, সহকর্মী ও স্বজনদের কাছে রাজা সেন ছিলেন এক অত্যন্ত স্নেহশীল, শান্ত ও বিনম্র স্বভাবের অভিভাবক।

পর্দার আড়ালের এক গভীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক

রাজা সেনের বিয়োগে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ইন্দ্রাণী হালদার। তাঁর কাছে রাজা সেনের পরিচয় কেবল পেশাগত পরিচালক হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না; সেই সম্পর্ক ছিল পারিবারিক ও ব্যক্তিগত স্নেহের। স্মৃতির সরণি বেয়ে ইন্দ্রাণী হালদার জানান, রাজা সেনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় শৈশব থেকে। বিখ্যাত ধারাবাহিক ‘তেরো পার্বণ’-এর সময় থেকেই সেন পরিবারের সঙ্গে গড়ে উঠেছিল গভীর যোগাযোগ। রাজা সেন ছিলেন তাঁর প্রয়াত বাবার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাই ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন তাঁর প্রিয় ‘রাজাকাকু’।

ইন্দ্রাণী হালদারের কথায়, “রাজাকাকুর সঙ্গে আমার তো শুধুই একজন অভিনেত্রী ও পরিচালকের সম্পর্ক ছিল না। উনি ছিলেন আমার বাবার অত্যন্ত কাছের মানুষ। আমার বাবার শ্রাদ্ধানুষ্ঠানেও তিনি এসেছিলেন, উপস্থিত থেকে বাবাকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করেছিলেন। মানুষটা যে এভাবে হুট করে চলে যাবেন, তা ভেবে উঠতে পারছি না। মনে হচ্ছে যেন নিজেরই খুব কাছের কাউকে হারালাম। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।”

কাজের সুযোগ ও সুগভীর আস্থা

পরিচালক রাজা সেনের সঙ্গে বড় পর্দায় কাজ করার সুযোগ ইন্দ্রাণী হালদারের জীবনে খুব বেশি আসেনি। তবে যেটুকুই কাজ হয়েছে, তাতেই গড়ে উঠেছিল অগাধ পারস্পরিক আস্থা। রাজা সেনের পরিচালিত ‘চক্রব্যুহ’ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন ইন্দ্রাণী। সেই ছবিতে তাঁর সঙ্গে আরও অভিনয় করেছিলেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ও ইন্দ্রজিৎ।

কাজের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে অভিনেত্রী বলেন, “কাজের সংখ্যা হয়তো কম ছিল, কিন্তু আমার ক্ষমতার ওপর ওঁর আস্থা ছিল অপরিসীম। সব সময় বলতেন, ‘মামণি ঠিক সব করে নেবে।’ পরবর্তীতে হয়তো মেগা ধারাবাহিকের কাজে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ার কারণে সময় দিতে পারব না ভেবেই আমাকে আর নতুন কোনো কাজের জন্য ডাকেননি। কিন্তু সম্পর্কের উষ্ণতা সব সময় একই রকম ছিল।”

আড়ম্বরহীন জীবন ও বিআড়ম্বরহীন জীবন ও বিনম্র ব্যক্তিত্ব

রাজা সেন ছিলেন একেবারেই এক জন মাটির মানুষ। এত বড় মাপের পরিচালক হওয়া সত্ত্বেও কোনো দিন অহংবোধ তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। শান্ত, ধীর-স্থির ও আড়ম্বরহীন জীবনযাপন করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন তিনি। রূপালি পর্দার চকমকে পরিমণ্ডলে থেকেও নিজেকে আড়াল করে রাখতেন শুধুই নিজের সৃষ্টিশীল কাজের মধ্যে।

ইন্দ্রাণী হালদার যোগ করেন, “আমি ওঁর ব্যক্তিগত রূপটি খুব কাছ থেকে দেখেছি। এত শান্ত, ধীর-স্থির মানুষ বলে ওঁর প্রতি আলাদা শ্রদ্ধা কাজ করত। কোনো ধরনের অহংকার ছিল না। আড়ম্বরহীন এক জন মানুষ, যিনি শুধুই নিজের কাজটুকু নিয়ে থাকত। নিঃসন্দেহে ওঁর চলে যাওয়া বাংলা চলচ্চিত্র জগতের জন্য এক বিরাট ও অপূরণীয় ক্ষতি।”

বর্ষীয়ান এই পরিচালকের অন্তর্ধানে চলচ্চিত্র অনুরাগী থেকে শুরু করে টলিউডের সহকর্মীরা আজ গভীর শোকাহত। রাজা সেনের সৃষ্টিকর্ম যেমন বাংলা সিনেমার ইতিহাসে চিরকাল সংরক্ষিত থাকবে, তেমনই তাঁর সহমর্মী ব্যক্তিত্ব বেঁচে থাকবে প্রিয়জনদের স্মৃতিতে।