‘ক্লান্ত দেখে শুটিং বাতিল করেছিলেন’ : রাজা সেনের স্মৃতিতে পাওলি দামের শ্রদ্ধাঞ্জলি

বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫০ পিএম
আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৬ পিএম
Main News Image

বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম প্রথিতযশা ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত নির্দেশক রাজা সেনেরপ্রয়াণে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে টলিপাড়ায়। ২০২৬ সালের ১৬ অগস্ট সকালে তাঁর প্রয়াণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েন সাংস্কৃতিক জগতের ব্যক্তিত্বরা। বর্ষীয়ান এই পরিচালকের প্রয়াণে স্মৃতিবিহ্বল হয়ে পড়েছেন বিশিষ্ট অভিনেত্রী পাওলি দাম। রাজা সেনের পরিচালনায় ‘তিন মূর্তি’ ও ‘মায়ামৃদঙ্গ’—এই দুটি চলচ্চিত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে স্মৃতির সরণি বেয়ে প্রয়াত পরিচালককে শ্রদ্ধা জানালেন অভিনেত্রী।

শিক্ষানবিশির দিনগুলি ও প্রথম কাজ

পাওলি দামের স্মৃতিচারণায় বারবার ফিরে এসেছে রাজা সেনের অসামান্য শিক্ষাদানের ক্ষমতা। ২০০৯ সালে ‘তিন মূর্তি’ ছবিতে অভিনয় করার মাধ্যমে রাজা সেনের সঙ্গে পাওলির পেশাগত যাত্রা শুরু হয়। সেই সময়ে রূপালী পর্দায় পাওলি ছিলেন নতুন মুখ, চলচ্চিত্র জগতের জটিলতা ও অভিনয়শৈলী শেখার চেষ্টা করছিলেন। পাওলির কথায়, রাজাদার সেটে কাজ করাটা কেবল এক-একটি দৃশ্য শুট করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল একটি ফিল্ম স্কুলের পাঠশালা। একজন নতুন শিল্পীকে কীভাবে স্বাধীনতার সঙ্গে কাজ করতে দেওয়া উচিত এবং কীভাবে সহজভাবে বুঝিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, তা অসামান্য দক্ষতায় সামলাতেন রাজা সেন।

‘মায়ামৃদঙ্গ’ ও নজিরবিহীন সহমর্মিতা

পরবর্তীকালে ২০১৬ সালে ‘মায়ামৃদঙ্গ’ ছবিতে পুনরায় কাজ করার সুযোগ পান পাওলি। ততদিনে তিনি নিজেকে একজন পরিপক্ব অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তবে সেই সময়কার একটি ঘটনা আজও পাওলির হৃদয়ে অমলিন। তখন বাংলাদেশে অভিনেতা শাকিব খানের সঙ্গে ‘সত্তা’ ছবির শুটিংয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ত ছিলেন পাওলি। দিন-রাত এক করে চলা সেই কঠোর শুটিং শেষ করেই তিনি সরাসরি পৌঁছান ‘মায়ামৃদঙ্গ’-র সেটে। পাওলির চোখেমুখে তখন স্পষ্ট ভেসে উঠছিল মারাত্মক ক্লান্তির ছাপ।

একজন সংবেদনশীল পরিচালকের চোখে তা এড়ায়নি। পাওলির শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি দেখে রাজা সেন এক মুহূর্ত দেরি না করে সেদিনের মতো শুটিং বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন। পাওলি জানান, "রাজাদা আমার অবস্থা দেখে সোজা বলে দিলেন—‘আজ আর শুটিং করব না, কাল করব।’" আজকের চরম ব্যস্ত ও বাণিজ্যিক ইন্ডাস্ট্রিতে, যেখানে মাত্র ১১-১২ দিনের মধ্যে টাইট শিডিউলে ছবি শেষ করার চাপ থাকে, সেখানে এমন মানবিক সহানুভূতি পাওয়া অসম্ভব। কাজের বাইরেও একজন শিল্পী ও সহকর্মীর সুস্থতাকে প্রাধান্য দেওয়ার এই মানসিকতা আজ বিরল।

গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি

কেবল দক্ষ পরিচালনাই নয়, সেট ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্বের দিক থেকেও রাজা সেন ছিলেন অনন্য। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত নির্দেশক হওয়া সত্ত্বেও তাঁর মধ্যে বিন্দুমাত্র অহংকার ছিল না। শুটিং সেটে মেকআপ আর্টিস্ট থেকে পোশাকশিল্পী—সকলের মতামত নিয়ে তিনি গণতান্ত্রিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতেন। অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ আবহে কাজ আদায় করার অসামান্য ক্ষমতা ছিল তাঁর। পাওলির মতে, তাঁর কাছ থেকে কেবল অভিনয়ের কৌশলই নয়, বরং একজন সত্যিকারের মানবিক মানুষ হওয়ার পাঠ পাওয়া যেত।

শেষ দেখা ও চিরন্তন উত্তরাধিকার

গত বছর টরন্টোতে শেষবারের মতো রাজা সেনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল পাওলির। তখনও তাঁর মধ্যে ছিল সেই চেনা আন্তরিকতা ও উষ্ণতা। তিনি যে আড়ালে কতটা অসুস্থ ছিলেন, তা কাউকে বুঝতে দেননি। রাজা সেনের এই চলে যাওয়া বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তবে প্রিয় রাজাদাকে তাঁর কালজয়ী চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়েই আজীবন স্মৃতিতে বাঁচিয়ে রাখতে চান অভিনেত্রী পাওলি দাম।