শিশুদের বোঝার জন্য সহানুভূতি জরুরি: সোনালি কুলকার্নি
খুদে অতিথিদের নিয়ে ‘হাফ টিকিট ফুল নাগরিক’ নামের একটি নতুন পডকাস্ট শুরু করেছেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী সোনালি কুলকার্নি। একই সঙ্গে মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে তাঁর দু’টি নতুন ছবি—‘দ্য বলিউড ওয়াইভস’ ও ‘দ্য প্যারাডাইস’। পডকাস্টের নেপথ্য ভাবনা, নতুন প্রজন্মের শিশুদের মানসিকতা এবং নিজের দীর্ঘ অভিনয় সফর নিয়ে সম্প্রতি খোলামেলা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন অভিনেত্রী। ভারতীয় অনলাইন থেকে বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য এটির সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হল।
হঠাৎ ছোটদের নিয়ে পডকাস্ট করার কথা মনে হলো কেন?
মা হওয়ার পর বুঝেছি, ছোটদের বক্তব্য শোনাও কতটা জরুরি। কী ভাবে সন্তানদের সঙ্গে কথা বলতে হবে, তা অনেক অভিভাবকই জানেন না। আমার মাথায় এই ভাবনাটা ছিল। আমার লেখায় অনেক বছর ধরেই ছোটদের জীবন আর তাদের নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে লিখেছি। এ বার সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, মাধ্যম বদলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমি ৬ থেকে ১৫ বছর বয়সি শিশুদের জন্য একেবারে আলাদা এই পডকাস্ট শুরু করি।
ছোট্ট অতিথিদের সঙ্গে কথা বলে কী শিখলেন?
সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, ওদের বিশ্বাসের উপর ভরসা রাখা। ওরা পরিবার, বাবা-মা, বড়দের কথা মানতে শেখে। কিন্তু নিজেদের মতামতের জায়গাটাও খুব সুন্দর ভাবে ধরে রাখে। আমরা ওদের শুধু ‘বাচ্চা’ বলে একটা আলাদা ঘরে রেখে দিই। ভাবিই না যে ওদেরও নিজস্ব মত থাকতে পারে। ধর্ম, অর্থনৈতিক সমস্যা—এ সব নিয়েও ওরা খুব নির্ভয়ে কথা বলে। আমরা ছোটবেলায় যে বিষয়গুলো লুকিয়ে রাখতাম বা বলতে লজ্জা পেতাম, এখনকার বাচ্চারা বিষয়গুলো সহজ ভাবে নেয়। তারা ভাবে, বড় হয়ে পরিবারের দায়িত্ব নেবে। প্রায় প্রতিটি পর্বেই এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন আমি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি।
আপনার কি মনে হয়, আজকের শিশুরা আগের প্রজন্মের তুলনায় আবেগের বিষয়ে বেশি সচেতন?
আমি বলব, ওরা পৃথিবীকে অনেক বেশি বোঝে। আবেগের দিক থেকেও এই প্রজন্ম অনেক বেশি স্থির। আগের প্রজন্ম নিজেদের আবেগই ঠিকমতো বুঝতে পারত না। কিন্তু আজকের খুদেদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ। ওরা আবেগকে ভালো ভাবে সামলাতে পারে, অনেক বেশি সচেতন এবং অন্যকে সাহায্য করতেও প্রস্তুত থাকে। কোনও পরিস্থিতিতেই ওরা খুব বেশি ভেঙে পড়ে না, বরং সামনে দাঁড়িয়ে সেটার মোকাবিলা করতে পারে।
নিজের ছোটবেলার অভিজ্ঞতার কথাও বলেছেন, সেই স্মৃতিগুলো কি সাহায্য করেছে?
অবশ্যই করেছে। কারণ নিজের অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করা যায় না। সেই অভিজ্ঞতাই অনুভূতি আর পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। তবে যে সব আবেগ আমাকে কষ্ট দিয়েছে, সেগুলোকে আমি অতিক্রম করতে শিখেছি। আমি সেই কষ্টগুলো আঁকড়ে ধরে রাখিনি। আজ এত বছর পর, আমি সেই ‘ছোট্ট সোনালি’র বন্ধু হতে পারি। বুঝতে পারি, সে কী পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতাগুলো অন্যদের প্রতি আমাকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
তিন দশকেরও বেশি সময় ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার পর শিল্পী হিসেবে আজও কোন বিষয় সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বসিত করে?
এখন আমি সবচেয়ে বেশি উপভোগ করি অভিনয়ের প্রসেসটা। এখন আর আমার মনে হয় না যে আমি অভিনয় করছি; মনে হয় সেই চরিত্রটাই আমি। এখন আমি নিজেকে একটা বাদ্যযন্ত্রের মতো দেখি—যেমন পিয়ানো বা গিটার। আমি জানি, আমি সব ধরনের সুরে বাজাতে পারি। এই আত্মবিশ্বাসটাই আমি সবচেয়ে বেশি উপভোগ করছি।
আপনার দুটো ছবি আসছে, ‘দ্য প্যারাডাইস’ আর ‘দ্য বলিউড ওয়াইভস’। কাজের অভিজ্ঞতা কেমন?
দুটো ছবি দু’ধরনের। ‘দ্য বলিউড ওয়াইভস’-এর জন্য মধুর ভাণ্ডারকর যে ভাবে আমার উপর ভরসা রেখেছেন, তাতে আমি খুশি। একই ভাবে তেলুগু পরিচালক শ্রীকান্তও যে চরিত্র দিয়েছেন, তারও সুবিচার করতে পেরেছি বলে মনে হয়। দুটো বড় বাজেটের ছবিই মুক্তির জন্য প্রস্তুত।
অভিনেত্রী, কলামনিস্ট এবং এখন পডকাস্টার—কোন ক্ষেত্রে মনের কথা খোলাখুলি বলতে পারেন?
আমার মনে হয়, লেখার মাধ্যমে। কারণ পডকাস্টে আমার দায়িত্ব থাকে অতিথিদের মনের কথা তুলে ধরা। ছবিতে আমি অন্য একজন লেখকের লেখা সংলাপ বলি। কিন্তু যখন লিখি, তখন নিজের মনের কথা বলতে পারি।
এই পডকাস্ট জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে সাহায্য করল কি?
অবশ্যই। বুঝতে পারলাম, জীবনে সহানুভূতি খুব জরুরি। আমরা সব সময়ে অন্যের জীবনকে বিচার করি। কিন্তু প্রত্যেক মানুষেরই একটা গল্প থাকে, সেটা মাথায় রাখতে হবে। আমরা যদি শিশুদের প্রতি সহানুভূতিশীল হই, তা হলে ওরাও সেটাই শিখবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুন্দর ভাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদেরই।