লালকেল্লার বিস্ফোরণ থেকে বাংলাদেশের সতর্কবার্তা

জঙ্গিবাদের ছায়া যেন রাজনীতির আশ্রয় না পায়

সহিদুল আলম, জেনেভা, সুইজারল্যান্ড
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৩:১৭ পিএম
আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৮ পিএম
Main News Image

দিল্লির ঐতিহাসিক লালকেল্লার কাছে ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর সংঘটিত গাড়িবোমা হামলার সঙ্গে আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট একিউআইএসের সংশ্লিষ্টতার কথা উঠে এসেছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংগঠনটি বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে এখানে নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা বা সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। এটি বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি নিরাপত্তাসংক্রান্ত সতর্কতা নয়; বরং রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজের জন্য গভীর আত্মসমালোচনার আহ্বান।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আইএসআইএল ও আল-কায়েদা নিষেধাজ্ঞা কমিটির অধীন অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিমের ৩৮তম প্রতিবেদনটি ২০২৬ সালের ১০ আগস্ট প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একিউআইএস বিচ্ছিন্ন একটি সংগঠন থেকে ক্রমে আঞ্চলিক সন্ত্রাসী কাঠামোয় রূপ নেওয়ার চেষ্টা করছে। বড় ও সহজে শনাক্তযোগ্য ইউনিটের পরিবর্তে সংগঠনটি ছোট, বিকেন্দ্রীভূত ও ছড়িয়ে থাকা সেলের মাধ্যমে কাজ করছে এবং নিজেদের আর্থিক ও লজিস্টিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিবেদনের তালিকা⁠

এ ধরনের কাঠামো প্রচলিত নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য বিশেষভাবে বিপজ্জনক। কারণ, বড় কোনো প্রশিক্ষণশিবির বা দৃশ্যমান সাংগঠনিক কার্যালয় ছাড়াই ছোট ছোট গোষ্ঠী অনলাইনে মতাদর্শ গ্রহণ, অর্থ সংগ্রহ, সদস্য নিয়োগ এবং হামলার পরিকল্পনা করতে পারে। দিল্লির লালকেল্লার কাছে বিস্ফোরণটি একিউআইএসের সঙ্গে “আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পৃক্ত” বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে হতাহতের সংখ্যা পরিবর্তিত হলেও পরবর্তী হিসাবে প্রায় ১৫ জন নিহত ও ২০ জনের বেশি আহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনটির সংবাদভিত্তিক বিবরণ⁠

তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো একিউআইএসের কথিত কৌশলগত আগ্রহ। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির প্রাথমিক লক্ষ্য বাংলাদেশে নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা বা বিদ্যমান যোগাযোগ সম্প্রসারণ করা। এই পর্যবেক্ষণকে আতঙ্ক সৃষ্টি কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করে একটি বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা-সতর্কতা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

“বাংলাদেশের পরিস্থিতি থেকে সুবিধা নেওয়া” কথাটির অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জঙ্গিবাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এর অর্থ হলো, সংগঠনটি দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক বিভাজন, ধর্মীয় আবেগ, তরুণদের হতাশা কিংবা প্রশাসনিক শূন্যতাকে নিজেদের সম্প্রসারণের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করছে। আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো সাধারণত এমন পরিবেশই খোঁজে, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল, রাজনৈতিক পক্ষগুলো সংঘাতে লিপ্ত এবং নাগরিকদের একটি অংশ ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ।

বাংলাদেশ অতীতেও জঙ্গিবাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী একযোগে বোমা বিস্ফোরণ থেকে শুরু করে হলি আর্টিজান হামলা প্রতিটি ঘটনা দেখিয়েছে, উগ্রবাদকে অস্বীকার করলে কিংবা “বিচ্ছিন্ন ঘটনা” বলে পাশ কাটালে বিপদ আরও গভীরে প্রবেশ করে। আবার এটিও সত্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ বহু জঙ্গি নেটওয়ার্ককে দুর্বল করতে সক্ষম হয়েছে। সেই সাফল্য আত্মতুষ্টির কারণ হতে পারে না।

একিউআইএসের নতুন কৌশলের বড় ক্ষেত্র হচ্ছে ডিজিটাল জগৎ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগব্যবস্থা, অনলাইন সাময়িকী এবং ধর্মীয় বক্তব্যের বিকৃত ব্যাখ্যার মাধ্যমে তারা শিক্ষিত তরুণদের কাছেও পৌঁছানোর চেষ্টা করে। জঙ্গিবাদ এখন আর কেবল দরিদ্র কিংবা মাদ্রাসাশিক্ষিত তরুণদের সমস্যা এমন ধারণা বহু আগেই ভুল প্রমাণিত হয়েছে। উচ্চশিক্ষিত, প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিও অনলাইন প্রচারণার মাধ্যমে উগ্রবাদে আকৃষ্ট হতে পারেন।

তাই শুধু গ্রেপ্তার ও অভিযান দিয়ে এই বিপদ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন বহুমাত্রিক প্রতিরোধব্যবস্থা। প্রথমত, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন এবং নাগরিকদের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। রাজনৈতিক সংঘাত ও প্রতিহিংসা যত বাড়বে, চরমপন্থীরা তত বেশি বিভাজনের সুযোগ নেবে।

দ্বিতীয়ত, দেশের মসজিদ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় ও অনলাইন পরিসরে উগ্রবাদবিরোধী বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে রাষ্ট্রের অংশীদারত্ব প্রয়োজন; তবে সেটি যেন নজরদারি বা নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক না হয়ে বিশ্বাস, শিক্ষা ও সচেতনতার সম্পর্ক হয়। শান্তি, সহনশীলতা এবং মানবিকতার পক্ষে ইসলামের বক্তব্য আরও কার্যকরভাবে তরুণদের সামনে তুলে ধরতে হবে।

তৃতীয়ত, সন্ত্রাসে অর্থায়নের উৎস শনাক্ত করতে আর্থিক গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো জরুরি। হুন্ডি, ছদ্মবেশী দাতব্য কার্যক্রম, ক্রিপ্টো সম্পদ, অনলাইন অনুদান এবং ক্ষুদ্র লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের নতুন পদ্ধতিগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত মানবিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে হয়রানি না করে ঝুঁকিভিত্তিক এবং প্রমাণনির্ভর ব্যবস্থা নিতে হবে।

চতুর্থত, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময় বাড়ানো প্রয়োজন। জঙ্গিবাদ সীমান্ত বা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব মানে না। তবে আঞ্চলিক সহযোগিতা অবশ্যই পারস্পরিক সম্মান, যাচাইযোগ্য তথ্য এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত হতে হবে। কোনো দেশের রাজনৈতিক বয়ানকে বিনা প্রশ্নে গ্রহণ যেমন উচিত নয়, তেমনি বাস্তব নিরাপত্তা হুমকিকে শুধুই “বিদেশি প্রচারণা” বলে প্রত্যাখ্যান করাও বিপজ্জনক।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই প্রতিবেদনকে ঘিরে বাংলাদেশের কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে সন্দেহের চোখে দেখা যাবে না। সন্ত্রাসবাদীর কোনো ধর্মীয় প্রতিনিধিত্ব নেই। নির্বিচার গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জঙ্গিবাদের অভিযোগ কিংবা ভিন্নমতকে উগ্রবাদ হিসেবে চিহ্নিত করা প্রকৃত সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমকেই দুর্বল করে। এতে নিরাপত্তা সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয় এবং চরমপন্থীরা নিজেদের নিপীড়িত হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ পায়।

বাংলাদেশকে তাই দুটি বিপরীত প্রবণতা থেকে দূরে থাকতে হবে একদিকে হুমকিকে অস্বীকার করা, অন্যদিকে হুমকিকে অতিরঞ্জিত করে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়া। রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, প্রমাণভিত্তিক এবং আইনের শাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সরকারের উচিত জাতিসংঘের প্রতিবেদনটি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করে জনগণকে জানানো কোন তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সম্পর্কে এমন পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে এবং তা মোকাবিলায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

লালকেল্লার বিস্ফোরণ ভৌগোলিকভাবে দিল্লিতে ঘটলেও এর সতর্কবার্তা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার জন্য। একটি দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কিংবা নিরাপত্তার দুর্বলতা তৈরি হলে তার প্রভাব প্রতিবেশী দেশগুলোকেও স্পর্শ করে। বাংলাদেশকে প্রমাণ করতে হবে, তার ভূখণ্ড কোনো আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর আশ্রয়, নিয়োগক্ষেত্র বা আর্থিক করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হবে না।

এই লড়াইয়ে শক্তিশালী গোয়েন্দা ব্যবস্থা প্রয়োজন, কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, ন্যায়বিচার, সামাজিক সম্প্রীতি এবং তরুণদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ। কারণ, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা শুধু অস্ত্রধারী বাহিনী নয় একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সচেতন সমাজ।