পরাশক্তির ছায়ায় বাংলাদেশ: কেন বারবার ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’-এর প্রশ্ন ওঠে?

সহিদুল আলম স্বপন, জেনেভা, সুইজারল্যান্ড
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪৫ এএম
আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০৯ এএম
Main News Image

বাংলাদেশ কি সত্যিই বারবার কোনো বৃহৎ শক্তির ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ হয়ে পড়ে, নাকি দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরনির্ভর অর্থনীতির সুযোগ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলো এই অভিধা ব্যবহার করে? প্রশ্নটির উত্তর শুধু দিল্লি, ওয়াশিংটন, বেইজিং, মস্কো বা ইসলামাবাদের ভূমিকায় পাওয়া যাবে না। এর মূল অনুসন্ধান করতে হবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং ক্ষমতা অর্জনের অভ্যন্তরীণ কৌশলের মধ্যে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় ক্লায়েন্ট স্টেট বলতে সাধারণত এমন একটি রাষ্ট্রকে বোঝায়, যার নিরাপত্তা, অর্থনীতি কিংবা ক্ষমতাসীন সরকারের টিকে থাকা কোনো প্রভাবশালী রাষ্ট্রের সমর্থনের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। কিন্তু বাংলাদেশকে সরাসরি এই সংজ্ঞার মধ্যে আটকে দেওয়া কঠিন। দেশটি কোনো একটি শক্তির স্থায়ী উপগ্রহ নয়। বরং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার নিজেদের রাজনৈতিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রয়োজন কিংবা কূটনৈতিক স্বীকৃতির জন্য কোনো না কোনো বৃহৎ শক্তির দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকেছে। তাই বাংলাদেশের প্রধান সংকট সম্ভবত স্থায়ী পরাধীনতা নয়; সংকটটি হচ্ছে স্বনির্ভর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে বহিরাগত সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল ক্ষমতার রাজনীতি।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মই হয়েছিল এক জটিল আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিসংঘাতের মধ্যে। মুক্তিযুদ্ধে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন যেমন স্বাধীনতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনি পাকিস্তানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অবস্থানও নতুন রাষ্ট্রটির প্রাথমিক বৈদেশিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে একই সঙ্গে যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়েছিল। ফলে বৈদেশিক সাহায্য ও রাজনৈতিক সমর্থন তখন কোনো বিলাসিতা ছিল না; ছিল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজন।

কিন্তু জরুরি সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম সীমারেখা রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বহু সময় সেই সীমারেখা রক্ষা করতে পারেনি। অভ্যন্তরীণ বৈধতা দুর্বল হলে সরকারগুলো বাইরের শক্তির স্বীকৃতিকে জনগণের সম্মতির বিকল্প হিসেবে দেখেছে। আবার বিরোধী দলগুলোও ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম করতে বিদেশি রাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাপ বা নীরব সমর্থন প্রত্যাশা করেছে। এতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধ ক্রমে আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিযোগিতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

এখানেই ক্লায়েন্ট স্টেট হওয়ার প্রথম শর্ত তৈরি হয়। যে রাষ্ট্রে নির্বাচনী ব্যবস্থা বিশ্বাসযোগ্য, বিচার বিভাগ স্বাধীন, প্রশাসন পেশাদার এবং সংসদ কার্যকর সেই রাষ্ট্রের সঙ্গে বিদেশি শক্তি দর-কষাকষি করে। কিন্তু যেখানে ক্ষমতার বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দলীয় স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, সেখানে বিদেশি শক্তি রাষ্ট্রের বদলে ব্যক্তি, দল বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। তখন পররাষ্ট্রনীতি জাতীয় কৌশল না হয়ে ক্ষমতা রক্ষার বীমাপত্রে পরিণত হয়।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়েছে। দেশটি প্রায় তিন দিক থেকে ভারতবেষ্টিত; দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও বাণিজ্যের জন্য বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগর ভারত মহাসাগরীয় ভূরাজনীতির একটি উদীয়মান কেন্দ্র। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতি, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, জাপানের অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজার সবকিছুর সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ।

এই অবস্থান বাংলাদেশের জন্য যেমন সুযোগ, তেমনি বিপদও। দক্ষ রাষ্ট্রনীতি থাকলে প্রতিযোগী শক্তিগুলোর কাছ থেকে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, বাজার ও নিরাপত্তা সহযোগিতা আদায় করা যায়। কিন্তু দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং অস্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবেশে একই প্রতিযোগিতা বাংলাদেশকে প্রভাববলয়ের সম্পদে পরিণত করতে পারে। তখন কোনো বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, রেলপথ, প্রতিরক্ষা ক্রয় কিংবা ডিজিটাল অবকাঠামো কেবল অর্থনৈতিক প্রকল্প থাকে না; তা হয়ে ওঠে ভূকৌশলগত আনুগত্য যাচাইয়ের উপকরণ।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এই বাস্তবতার সবচেয়ে সংবেদনশীল উদাহরণ। দুই দেশের ইতিহাস, সীমান্ত, নদী, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ভারতের স্বার্থের অংশ, আবার ভারতের বাজার ও ভূখণ্ড বাংলাদেশের যোগাযোগ ও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সম্পর্কটি যখন রাষ্ট্রের বদলে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত বলে প্রতীয়মান হয়, তখন সহযোগিতাও সন্দেহের শিকার হয়। পানিবণ্টন, সীমান্তে প্রাণহানি, বাণিজ্যবৈষম্য কিংবা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ তখন জনমনে ভারতবিরোধী ক্ষোভ সৃষ্টি করে। অসমতার অনুভূতি যত বাড়ে, ‘বন্ধুত্ব’ তত সহজে ‘আধিপত্য’ হিসেবে ব্যাখ্যাত হয়।

চীনের সঙ্গে সম্পর্কেও বিপরীত ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও উন্নয়ন অর্থায়নে চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ভারতের ওপর অতিনির্ভরতা কমাতে চীনকে ভারসাম্যের শক্তি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু প্রকল্প বাছাই, ঋণের শর্ত, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক লাভ-ক্ষতির হিসাব স্বচ্ছ না হলে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা নতুন নির্ভরতা তৈরি করতে পারে। ভারতীয় প্রভাব থেকে মুক্তির নামে চীনা প্রভাবের দিকে অন্ধভাবে ঝুঁকে পড়া স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি নয়; সেটি কেবল পৃষ্ঠপোষক পরিবর্তন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সম্পর্ক দ্বিমাত্রিক। পশ্চিমা বাজার বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রধান ভিত্তি। শ্রম অধিকার, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, নিষেধাজ্ঞা ও নির্বাচন নিয়ে তাদের অবস্থান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরাসরি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এক পক্ষ এগুলোকে প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক জবাবদিহি বলে দেখে, অন্য পক্ষ সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ বলে চিহ্নিত করে। বাস্তবে বাজারনির্ভরতা যত বেশি এবং রপ্তানিপণ্য যত কম বৈচিত্র্যময় থাকবে, নীতিগত মতবিরোধে বাংলাদেশের দর-কষাকষির ক্ষমতা তত সীমিত হবে।

অর্থনৈতিক দুর্বলতাই রাজনৈতিক নির্ভরতার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন ছিল প্রায় ৪৫৬ বিলিয়ন ডলার; কিন্তু প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ছিল জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৬ সালের বিশ্বব্যাংক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ বছরের মধ্যে প্রথমবার ৭ শতাংশের নিচে নেমে যায়; ব্যাংকিং খাতেও গুরুতর মূলধন ও সুশাসনের দুর্বলতা রয়েছে। বিশ্বব্যাংক

যে রাষ্ট্র নিজের জনগণের কাছ থেকে কার্যকরভাবে রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারে না, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা সংস্কার করতে পারে না এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়, তাকে বাজেট সহায়তা, বৈদেশিক ঋণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বাইরের শর্ত মেনে নিতে হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও বাংলাদেশের দুর্বল রাজস্ব আহরণ, ব্যাংক খাতের ভঙ্গুরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং আর্থিক সংস্কারের ঘাটতিকে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আইএমএফ

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বোঝা দরকার। বৈদেশিক ঋণ নেওয়া বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্মসূচিতে যাওয়া নিজে ক্লায়েন্ট স্টেট হওয়ার প্রমাণ নয়। সমস্যা সৃষ্টি হয় যখন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ অস্বচ্ছ থাকে, ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল সক্ষমতা না বাড়িয়ে রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক প্রকল্পে ব্যয় হয় এবং দায় শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপর চাপানো হয়। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে সংসদীয় ও জনপর্যায়ের জবাবদিহি না থাকলে ঋণদাতা কিংবা বিনিয়োগকারীর প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে।

দক্ষিণ এশিয়ায় বছরে প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলারের আঞ্চলিক বাণিজ্য হয়, যদিও সম্ভাবনা অন্তত ৬৭ বিলিয়ন ডলার বলে বিশ্বব্যাংকের হিসাব। বিশ্বব্যাংক⁠ প্রতিবেশীদের মধ্যে রাজনৈতিক অবিশ্বাসের কারণে দেশগুলো দূরবর্তী পরাশক্তির বাজার, অস্ত্র, ঋণ ও কূটনৈতিক আশ্রয়ের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কার্যকর সার্ক, বিবিআইএন সহযোগিতা, আঞ্চলিক বিদ্যুৎবাজার এবং সহজ যোগাযোগ গড়ে উঠলে ছোট দেশগুলোর দর-কষাকষির শক্তি বাড়ত।

বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভাজনও বিদেশি প্রভাবকে সহজ করে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ বনাম বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম ধর্মীয় পরিচয়, মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার বনাম ভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা এসব প্রশ্ন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার স্বাভাবিক বিষয় হতে পারত। কিন্তু এগুলোকে প্রায়ই এমন চূড়ান্ত শত্রুতায় রূপ দেওয়া হয়েছে, যেখানে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে বিদেশি সমর্থন গ্রহণও গ্রহণযোগ্য মনে হয়। এক পক্ষকে ‘ভারতের দালাল’, অন্য পক্ষকে ‘পাকিস্তানপন্থী’, আর ভিন্নমতকে কখনো ‘চীনপন্থী’ বা ‘পশ্চিমাদের এজেন্ট’ বলা হয়। এই সংস্কৃতি জাতীয় স্বার্থের ন্যূনতম ঐকমত্যকেও ধ্বংস করে।

ক্লায়েন্ট স্টেট হওয়ার আরেকটি লক্ষণ হলো জ্ঞানগত পরনির্ভরতা। বাংলাদেশের নীতি আলোচনা অনেক সময় নিজস্ব গবেষণা, তথ্য ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনার বদলে বিদেশি থিংকট্যাংক, দূতাবাস কিংবা উন্নয়ন সংস্থার নির্ধারিত ভাষায় পরিচালিত হয়। অথচ ১৭ কোটির বেশি মানুষের একটি দেশের নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কৌশল অন্যের নীতিপত্র থেকে ধার করে টেকসই করা যায় না। শক্তিশালী বিশ্ববিদ্যালয়, স্বাধীন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, দক্ষ কূটনৈতিক কাঠামো এবং পেশাদার প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণ ছাড়া ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ কেবল স্লোগান হয়েই থাকবে।

বাংলাদেশের ঘোষিত পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ আজও যৌক্তিক। কিন্তু বন্ধুত্ব মানে সব দাবিতে সম্মতি নয় এবং ভারসাম্য মানে প্রতিটি শক্তিকে সমান সুবিধা দেওয়াও নয়। প্রকৃত ভারসাম্য হলো প্রতিটি সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের পরিমাপযোগ্য জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কোন প্রকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, কোন ঋণ পরিশোধযোগ্য, কোন প্রতিরক্ষা ক্রয় বাস্তব নিরাপত্তা বাড়াবে, কোন সংযোগব্যবস্থা বাংলাদেশের বাণিজ্যিক লাভ নিশ্চিত করবে এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ্য ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত হতে হবে।

ক্লায়েন্ট স্টেটের ফাঁদ থেকে বের হতে প্রথমেই নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তনের বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকারকে বিদেশি স্বীকৃতির ওপর টিকে থাকতে হয় না। দ্বিতীয়ত, সংসদে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও কৌশলগত প্রকল্প পর্যালোচনার বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যাংকিং খাত, করব্যবস্থা, জ্বালানি ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সংস্কার করে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব বাড়াতে হবে। চতুর্থত, তৈরি পোশাক ও প্রবাসী আয়ের পাশাপাশি ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণ, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং উচ্চমূল্যের উৎপাদনে রপ্তানি বৈচিত্র্য আনতে হবে। সর্বোপরি, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য ও আসিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ককে দলীয় আনুগত্যের বদলে সমান্তরাল জাতীয় অংশীদারত্বে রূপ দিতে হবে।

বাংলাদেশ বারবার ক্লায়েন্ট স্টেট হয় এ কথা চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বলা সম্ভবত অতিসরলীকরণ। বরং বলা যায়, দেশটি বারবার এমন পরিস্থিতিতে পড়ে যেখানে দুর্বল প্রতিষ্ঠান, বিভক্ত রাজনীতি, অর্থনৈতিক পরনির্ভরতা এবং ক্ষমতার বৈধতার সংকট বিদেশি প্রভাবের দরজা খুলে দেয়। বাইরের শক্তি সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করে; কিন্তু দরজাটি অধিকাংশ সময় ভেতর থেকেই খোলা হয়।

বাংলাদেশের সামনে তাই পৃষ্ঠপোষক বেছে নেওয়ার প্রশ্ন নয়, রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করার প্রশ্ন। দিল্লি, বেইজিং কিংবা ওয়াশিংটনের মধ্যে কাকে বেশি কাছে রাখা হবে এ বিতর্কের চেয়েও জরুরি হলো ঢাকা নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার কতটা সক্ষমতা অর্জন করছে। কারণ স্বাধীনতার প্রকৃত পরীক্ষা শুধু পতাকা, মানচিত্র বা জাতীয় সংগীতে নয়; পরীক্ষা হলো রাষ্ট্রটি তার জনগণের সম্মতি, নিজস্ব অর্থনৈতিক শক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক আত্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে কি না। সেই সক্ষমতা অর্জিত না হলে পৃষ্ঠপোষকের নাম বদলাবে, কিন্তু নির্ভরতার রাজনীতি বদলাবে না।