শাহজালাল বিমানবন্দরের বিতর্ক: আখতারুজ্জামান নন, কাঠগড়ায় রাষ্ট্রের সেবাও

সহিদুল আলম স্বপন জেনেভা, সুইজারল্যান্ড
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৮ পিএম
আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৫৪ এএম
Main News Image

একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, ট্রলির সংকট কিংবা সমন্বয়হীনতা যাত্রীদের ক্ষুব্ধ করতেই পারে। কিন্তু সেই ক্ষোভ যদি সরকারি কর্মকর্তাকে হুমকি, নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে সংঘাত বা প্রতিষ্ঠানের বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে রূপ নেয়, তখন ঘটনাটি আর কেবল একজন ব্যক্তির আচরণের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে রাষ্ট্রের সেবার মান, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং আইনের সমান প্রয়োগের বাস্তবতা।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাও ঠিক সেই কারণেই একটি সাধারণ রাজনৈতিক বিতর্ক নয়। এটি একই সঙ্গে নাগরিকসেবা, জবাবদিহি, নেতৃত্বের সংযম এবং আইনের শাসনের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১ অক্টোবর মদিনা থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটের যাত্রীরা লাগেজ সংগ্রহে বিলম্ব এবং ট্রলির সংকটে পড়েন। এতে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। পরদিন বিমানবন্দরের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা, নিরাপত্তাকর্মীকে আঘাত এবং হুমকিসহ একাধিক অভিযোগে মামলা করেন। অভিযোগপত্রে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক ও দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগের সত্যতা এখনও তদন্তাধীন। আইন ও ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি হচ্ছে, অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। তবে জনস্বার্থের প্রশ্নে ঘটনাটি নিয়ে অনুসন্ধান, আলোচনা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত।

এই ঘটনার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিমানবন্দরের সেবার মান। যদি সত্যিই যাত্রীরা দীর্ঘ সময় লাগেজের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন, পর্যাপ্ত ট্রলি না পান এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থার অভাব অনুভব করেন, তবে সেটি কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ত্রুটি নয়। দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বারে এমন পরিস্থিতি শুধু যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ায় না, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ করে।

কোনো বিমানবন্দরের মর্যাদা কেবল আধুনিক ভবন, ঝকঝকে টার্মিনাল বা বড় উন্নয়ন প্রকল্প দিয়ে নির্ধারিত হয় না। শেষ পর্যন্ত বিচার হয় একজন যাত্রী কতটা দ্রুত, নিরাপদ, সম্মানজনক এবং কার্যকর সেবা পেয়েছেন তার ওপর। সে কারণেই বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে কিছু মৌলিক প্রশ্নের জবাব প্রয়োজন। কেন ট্রলির ঘাটতি ছিল? লাগেজ সরবরাহে বিলম্বের কারণ কী? যাত্রীদের অভিযোগ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত জনবল ও কার্যকর ব্যবস্থা কি উপস্থিত ছিল? যদি ঘাটতি থেকে থাকে, তবে তা দূর করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?

জনসন্তুষ্টি নিশ্চিত করতে শুধু ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়, দৃশ্যমান সংস্কারও জরুরি। তবে সেবার ব্যর্থতা এবং ব্যক্তিগত আচরণের প্রশ্নকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। যাত্রীরা প্রতিবাদ করতে পারেন, অভিযোগ জানাতে পারেন, এমনকি আইনি প্রতিকারও চাইতে পারেন। একজন রাজনৈতিক নেতাও জনস্বার্থে কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি দাবি করতে পারেন। কিন্তু কোনো পরিস্থিতিই কাউকে আইন বা প্রতিষ্ঠানের নিয়মের ঊর্ধ্বে অবস্থান করার অধিকার দেয় না।

অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে, বিমানবন্দরের মতো সংবেদনশীল অবকাঠামোতে হুমকি, শারীরিক সংঘাত বা নিরাপত্তা বিধি অমান্য করার কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা থাকতে পারে না।

এখানেই নেতৃত্বের প্রকৃত মানদণ্ড সামনে আসে। মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং সাবেক সংসদ সদস্য। এই পরিচয় তাঁকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ভিত্তি নয়; বরং তাঁর কাছ থেকে আরও বেশি সংযম, দায়িত্বশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধা প্রত্যাশিত। প্রকৃত নেতৃত্বের শক্তি কণ্ঠস্বরের উচ্চতায় নয়, সংকটময় মুহূর্তে আত্মনিয়ন্ত্রণের সক্ষমতায়।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রভাবশালী পরিচয় অনেক সময় নিয়মের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দলীয় অবস্থান, সাবেক পদ-মর্যাদা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় কোনো নাগরিককে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারে না। একইভাবে, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে তদন্তের আগেই অপরাধী আখ্যা দেওয়াও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

আইনের শাসনের মৌলিক শর্ত হলো নিরপেক্ষ তদন্ত, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং প্রমাণভিত্তিক বিচার।

এই প্রেক্ষাপটে তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিসিটিভি ফুটেজ, নিরাপত্তা নথিপত্র, প্রবেশ রেকর্ড, ফ্লাইট-সংশ্লিষ্ট তথ্য এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য দ্রুত সংরক্ষণ ও যাচাই করা উচিত। কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিকভাবে পরিচিত কি না, অথবা অভিযোগকারী সরকারি কর্মকর্তা কি না, তা তদন্তের ফলাফল নির্ধারণ করতে পারে না।

অভিযোগকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সত্য ধরে নেওয়া যেমন অনুচিত, তেমনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আগেভাগেই বাতিল করে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের নিজেদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখতে হবে। যদি যাত্রীসেবা-সংক্রান্ত ব্যর্থতা এই ঘটনার সূত্রপাত ঘটিয়ে থাকে, তবে লাগেজ ব্যবস্থাপনা, ট্রলি সরবরাহ, জনবল সমন্বয় এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা জরুরি। ব্যস্ত সময়ে যাত্রীচাপ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো এবং সেবার মান উন্নয়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে একই ধরনের অসন্তোষ ভবিষ্যতেও পুনরাবৃত্ত হবে।

মূলত এই ঘটনায় দুটি পৃথক কিন্তু সমান গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। একদিকে বিমানবন্দরের সেবাগত দুর্বলতার অভিযোগ, অন্যদিকে একজন জনপরিচিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আচরণগত ও আইনভঙ্গের অভিযোগ। একটি প্রশ্ন অন্যটিকে আড়াল করতে পারে না।

যাত্রীসেবার ঘাটতি থাকলে তা সংশোধন করতে হবে। আবার আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় নির্বিশেষে ব্যবস্থা নিতে হবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো দক্ষ সেবা নিশ্চিত করা, নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং সবার জন্য একই আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

শেষ পর্যন্ত শাহজালাল বিমানবন্দরের এই ঘটনা আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে: প্রভাবশালী বা পরিচিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও কি প্রতিষ্ঠান তার নিয়ম কার্যকর করতে সক্ষম? একই সঙ্গে, কোনো ব্যর্থতার ক্ষেত্রে কি সেই প্রতিষ্ঠান নিজেও জবাবদিহি করতে প্রস্তুত?

এই দুই প্রশ্নের উত্তরেই রাষ্ট্রের সক্ষমতা, প্রশাসনিক সংস্কৃতি এবং গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠবে।

বিমানবন্দরের ট্রলি সংকট কিংবা লাগেজ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দূর করা কঠিন নয়। কিন্তু যদি ক্ষমতার প্রভাবকে নিয়মের বিকল্প হতে দেওয়া হয়, অথবা প্রশাসনিক ব্যর্থতার জবাবদিহি নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে সমস্যার শিকড় আরও গভীরে পৌঁছাবে।

একটি রাষ্ট্রের শক্তি প্রভাবশালী ব্যক্তি কতটা স্বাধীনভাবে চলতে পারেন, তা দিয়ে পরিমাপ করা হয় না; বরং তিনি কতটা একই আইনের অধীন এবং প্রতিষ্ঠান কতটা নিরপেক্ষভাবে সেই আইন প্রয়োগ করতে পারে, সেটিই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের মর্যাদার প্রকৃত মানদণ্ড।


লেখক: সহিদুল আলম স্বপন
জেনেভাভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, প্রাইভেট ব্যাংকিং ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম কমপ্লায়েন্স বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি।