সেই দেশ, এই দেশ

শরীফুল আলম, নিউইয়র্ক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৮ পিএম
আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫৩ পিএম
Main News Image

এ দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ২২ সেপ্টেম্বর গ্রীষ্মের সমাপ্তি। এরপর গাছগুলো পাতা হারাতে শুরু করবে। দীর্ঘ একটা সময় তারা পত্রহীন হয়ে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকবে।

এখানে আমি নির্মল বাতাসে শ্বাস নিই, ভেজালমুক্ত খাবার খাই। আমার অভিজ্ঞতায়, ওজনে কেউ কমবেশি দেয় না। মসজিদ কিংবা গির্জা থেকে জুতা চুরি হয় না, বাসায় চোর ঢোকে না, পকেটমারের ভয়ও নেই। অফিসে ঘুষের মুখোমুখি হতে হয় না। ডাক্তার অকারণে একগাদা পরীক্ষা লিখে দেন না; বরং কখনো কখনো রোগীকে ওষুধের নমুনা দিয়ে দেন। পথে নারীদের উত্ত্যক্ত হতে দেখি না। সবাই কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ও নিয়মশৃঙ্খলা মেনে চলে। সময়ের ব্যাপারেও তারা খুব সচেতন।

এখানে আমার দিনগুলো বেশ সুন্দরভাবেই কাটছে। তারপরও প্রিয় শহর ঢাকার কথা মনে হলে কেন জানি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি। খানাখন্দে ভরা রাস্তা, গুমোট আবহাওয়া, ভ্যাপসা গরম, ঘামের গন্ধ, যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা ময়লা আর তার দুর্গন্ধ, মশার কামড়, মানুষের হাঁকডাক, ঠেলাঠেলি, গণপরিবহনে গাদাগাদি—এত কিছুর পরও বাংলাদেশে গেলে আমার একটুও বিরক্ত লাগে না। বরং একধরনের রক্তে ঢেউ তোলা আনন্দ অনুভব করি।

সাফল্যের সংজ্ঞা সবার কাছে এক নয়। আমি অল্পতেই খুশি হওয়া মানুষ। আহামরি কোনো অর্জনও আমার নেই। যা আছে, তা নিয়েই আমি ভীষণ তৃপ্ত। এই বয়সে আর স্বপ্নের পেছনে ছুটি না। যখন যা করতে মন চায়, তা-ই করি। সম্ভবত এটাই আমাকে সজীব ও সতেজ রাখে। আমার মনে হয়, সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য একটি সুস্থ, ফুরফুরে, মুক্ত ও স্বাধীন মনই যথেষ্ট।

একসময় আমার অনেক কিছুই ছিল না। অতি সাধারণ জীবন ছিল আমার। এখন যা আছে, তা নিয়েই ভালো আছি। মনভরা সুখ আছে। একটা মানুষের আর কী চাই?

আমার দাড়ি-গোঁফ নেই। তার মানে এই নয় যে আমি তরুণ। রাখিনি বলেই নেই। নিজেকে বুড়ো দেখাতে আমার একদম ভালো লাগে না। কেন জানি মনে হয়, বুড়ো মানুষকে ভালোবাসার চেয়ে করুণাই বেশি করা হয়। অন্তত আমার অনুভূতি এমনই। জীবনের মেয়াদ যদি ৮০ বছর ধরে নিই, তাহলে আমার হাতে এখনো ১৬ বছর আছে। আমি বিশ্বাস করি, দীর্ঘায়ু পেয়েও শুধু বিছানায় পড়ে থাকার মধ্যে জীবনের সার্থকতা নেই। পোশাক-আশাকেও তাই নিজেকে বুড়ো বানিয়ে রাখি না। অভাব দেখতে আমার একদম ভালো লাগে না। কৃপণ মানুষও পছন্দ করি না। সম্ভবত জীবনকে এভাবে দেখি বলেই নিজেকে বেশ ফুরফুরে লাগে।

আশির দশকের সেই পুরোনো, উদার বাংলাদেশের কথা এখন খুব মনে পড়ে। তখনকার সমাজ আমার কাছে আজকের মতো এতটা রক্ষণশীল মনে হতো না। নব্বইয়ের দশক শুরু হওয়ার পর আমি আমেরিকায় এসেছি। তখন কত কিছুই বুঝতাম না! কথার উচ্চারণ বুঝতে না পেরে কত দিন ভুল খাবারের অর্ডার দিয়েছি। হয়তো না জেনেই হালাল-হারাম নানা খাবার খেয়েছি। এই শীতের দেশে তখন সামান্য ঠান্ডাতেই ঠকঠক করে কাঁপতাম। এত বছর পরও আমি পুরোপুরি বাঙালিই রয়ে গেছি।

এখন সেপ্টেম্বরের শেষ। ঋতু বদলাতে শুরু করেছে। গাছের পাতায় রং ধরছে, পুরোনো পাতা ঝরে পড়ছে। এসবই প্রকৃতির নিয়ম। এভাবেই চলতে থাকবে।

আজ সোমবার, ইহুদিদের প্রায়শ্চিত্তের দিন। আজ থেকে তারা ২৫ ঘণ্টার উপবাস শুরু করবে। এই উপলক্ষে কেউ কেউ অফিস-আদালত কিংবা কাজে যায় না। দিনটি উপাসনালয়ে কাটায়। এখানে আমি যে প্রার্থনার পরিবেশ দেখি, সেখানে মাইক নেই, চেঁচামেচি নেই, চিৎকার নেই; আছে শুধু প্রার্থনা। নিজেদের কৃতকর্মের জন্য তারা দিনরাত প্রার্থনা করে।

এখানকার আরেকটি বিষয় আজ আমার নজর কাড়ল। আমি যেসব শেষকৃত্য দেখেছি, সেখানে কেউ হাউমাউ করে কাঁদে না, হৈচৈ করে না, বুক চাপড়ায় না। সবাই নীরবে মৃতদেহ নিয়ে শেষকৃত্যে যায়। নিজেদের সেরা পোশাক, কোট-প্যান্ট-টাই কিংবা গাউন পরে সারিবদ্ধভাবে একে একে ফুল দেয়। গাড়িগুলোও দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকে।

দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এ দেশে আছি। দিনে কিংবা রাতে কখনো একটুও ভয় লাগেনি। অথচ প্রিয় দেশে গেলে কেন জানি ভয়ে কুঁকড়ে থাকি। না, পকেটমারের ভয়ে নয়; প্রাণ হারানোর ভয়ে।

আমি আইন মেনে চলা একজন নাগরিক। এ দেশে পা রাখার প্রথম দিন থেকে আজ পর্যন্ত আইনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল থেকেছি। আমার যা কিছু অর্জন, সবই নিজের পরিশ্রমে পাওয়া। ফাঁকফোকর খুঁজে সুবিধা নেওয়া আমি বুঝি না। এত কিছুর পরও হৃদয়ে সেই একই সুর বাজে: “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।”