নভি পিল্লাইয়ের নোবেল জয়ের পরই আইসিসির ওপর ট্রাম্পের কড়া নিষেধাজ্ঞা
(বাঁ দিকে) নভানেথেম ‘নভি’ পিল্লাই এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প (ডান দিকে)
২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানবাধিকার আইনজীবী নবীনীতম ‘নভি’ পিল্লাইয়ের নাম ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আন্তর্জাতিক আদালত এবং এর সার্বিক কর্মকাণ্ডের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
ট্রাম্প প্রশাসন শুক্রবার আইসিসি-কে একটি ‘বিপথগামী সংস্থা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর কার্যক্রম পঙ্গু করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ বিষয়ে ঘোষণা দিয়ে বলেন, “আইসিসির সঙ্গে মার্কিন সব প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় যোগাযোগ ও লেনদেন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আমাদের এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো আমেরিকার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।”
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ তদন্তের জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত এই সংস্থার প্রতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই উষ্মা প্রকাশ করে আসছেন। গত দুই বছরে তাঁর প্রশাসন ধাপে ধাপে আইসিসির মোট ১৭ জন শীর্ষ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, যাদের মধ্যে রয়েছেন ৯ জন বিচারক এবং প্রধান কৌঁসুলি (প্রসিকিউটর)। এমনকি গত আগস্টে আইসিসির প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞার নোটিশ জারি করা হয়েছিল।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের জারি করা এই নিষেধাজ্ঞার ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, তাঁদের ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা এবং মার্কিন কোনো কোম্পানির সেবা বা সুবিধা গ্রহণ বন্ধ করার মতো কঠোর পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। আইসিসি এক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে, “যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের পদক্ষেপ আইনের শাসন এবং আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তির ওপর সরাসরি ও পরিকল্পিত আঘাত।” অন্যদিকে আইসিসির ডেপুটি প্রসিকিউটর নাজহাত শামীম খান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, “মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কাজ কোনোভাবেই থেমে থাকবে না।”
কাকতালীয়ভাবে, নভি পিল্লাইয়ের নোবেল জয়ের মাত্র কয়েক দিন আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন যে, তিনিই বিশ্বশান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পাওয়ার সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি।
নোবেলজয়ী নভি পিল্লাইয়ের কৃতিত্ব:
ঐতিহাসিক বিচার: ১৯৯৫ সালে রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারক হিসেবে যোগ দেন নভি পিল্লাই। ১৯৯৮ সালের ঐতিহাসিক জঁ-পল আকায়েসু মামলায় তিনি রায় দেন যে—যুদ্ধকালীন নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে ‘গণহত্যা’ (Genocide) হিসেবে গণ্য করা হবে। আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে নারীদের অধিকার রক্ষায় এটিকে অন্যতম যুগান্তকারী পদক্ষেপ ধরা হয়।
আইসিসিতে ভূমিকা: ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) অন্যতম শীর্ষ বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার বিচারে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন।
অন্যান্য অবদান: মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সংগঠিত নির্যাতন ও গণহত্যার মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় তিনি যুক্ত ছিলেন। এছাড়া দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড সম্পর্কিত জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনেরও নেতৃত্ব দিয়েছেন এই বরেণ্য আইনি বিশেষজ্ঞ।