চট্টগ্রাম বন্দরে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি বৃদ্ধি

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৮ পিএম
আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৫৩ এএম
Main News Image

ছবি: সংগৃহিত

চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যা রাজস্ব সুরক্ষায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অডিট, ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিসার্চ (এআইআর) শাখা মিথ্যা ঘোষণার সন্দেহে ৪৬৭টি আমদানি চালান জব্দ করেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৯.৪ শতাংশ বেশি। রাজস্ব ফাঁকি রোধে কাস্টমস তদারকি জোরদার করলেও সংঘবদ্ধ চক্রের নতুন কৌশল ও অতিরিক্ত কড়াকড়িতে বৈধ ব্যবসার সম্ভাব্য ক্ষতি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

প্রথম প্রান্তিকে জব্দ চালান ও রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যান

চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতি বছরই মিথ্যা ঘোষণার চালান আটক ও মামলার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছর (প্রথম তিন মাস): চট্টগ্রাম কাস্টমস ১৬৭টি চালান জব্দ করে এবং ২২৮টি মামলা দায়ের করে। সে সময় রাজস্ব ও জরিমানা বাবদ সর্বমোট ২৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছিল।

২০২৫-২৬ অর্থবছর (প্রথম তিন মাস): এআইআর শাখা ৩৬১টি চালান জব্দ করে এবং ১৯৯টি মামলা করে। এই সময়ে আদায়কৃত রাজস্ব ও জরিমানার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩১ কোটি ৭ লাখ টাকায়।

২০২৬-২৭ অর্থবছর (প্রথম তিন মাস): চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে জব্দ চালানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬৭টিতে। এসব ঘটনায় ২৭০টি মামলা দায়েরের মাধ্যমে রাজস্ব ও জরিমানা বাবদ আদায় হয়েছে ৫৮ কোটি ২ লাখ টাকা।

বিশেষ করে, চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর মাসেই চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ১৬৮টি চালান জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ১৩৯টি চালানের শতভাগ কায়িক পরীক্ষা সম্পাদন করা হলে দেখা যায়, ৫৫টি চালান সঠিক থাকলেও ৮৪টি চালানে সরাসরি শুল্ক সংক্রান্ত অনিয়ম ধরা পড়েছে।

একইভাবে, পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সে বছর এআইআর শাখা মোট ১ হাজার ৪৫১টি চালান জব্দ করেছিল। কায়িক পরীক্ষা ও তদন্তের পর ৮৪৩টি চালানে অনিয়ম নিশ্চিত হয়ে মামলা করা হয়। উক্ত অর্থবছরটিতে ৫২ কোটি ৮ লাখ টাকা বকেয়া রাজস্ব এবং ৫৯ কোটি ৬৩ লাখ টাকা জরিমানা সহ সর্বমোট ১১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা রাজস্ব কোষাগারে জমা হয়েছিল।

পণ্য আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণার কৌশল ও ধরন

কাস্টমস কর্মকর্তাদের মতে, কিছু অসাধু আমদানিকারক শুল্ক ফাঁকি দিতে নানামুখী কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছেন। সচরাচর যেসব উপায়ে এই অনিয়ম সংঘটিত হয়, সেগুলোর মধ্যে প্রধান হলো: ১. ভুল ট্যারিফ ক্ল্যাসিফিকেশন (HS Code): উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্যের শ্রেণীকরণ পরিবর্তন করে কম শুল্কের কোডে পণ্য খালাসের চেষ্টা। ২. পরিমাণ ও মূল্য কম দেখানো (Under-invoicing): চালানের প্রকৃত পণ্যের ওজন, সংখ্যা বা মূল্য কাগজপত্রে কম প্রদর্শন করা। ৩. অন্য পণ্যের আড়ালে গোপন চালান: কম বা শূন্য শুল্কের ঘোষণার ভেতর উচ্চ শুল্ক ও বিলাসবহুল পণ্য লুকিয়ে আনা।

সাম্প্রতিক সময়ে আটক করা বেশ কিছু চালানে অভিনব কৌশল দেখা গেছে। কাস্টমসের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে স্ক্র্যাপ বা পুরোনো লোহালক্কড় ঘোষণার আড়ালে শিল্প কারখানার ভারী যন্ত্রপাতি ও বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি করা হচ্ছে। এছাড়া প্রসাধনী সামগ্রী আনা হচ্ছে ‘মডেলিং ক্লে’ (এক ধরণের কাদা মাটি বা প্লাস্টিক সামগ্রী) ঘোষণা দিয়ে, অন্যান্য সাধারণ শুল্কের পণ্যের ভেতর ব্র্যান্ডের মোবাইল ফোন লুকিয়ে আনা হচ্ছে এবং বন্ড বা শুল্ক সুবিধা অপব্যবহারের উদ্দেশ্যে ভুল ঘোষণায় বড় বড় কাপড়ের চালান খালাসের চেষ্টা করা হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়া ও কাস্টমসের অবস্থান

চট্টগ্রাম কাস্টমসের সহকারী কমিশনার ও মুখপাত্র মোহাম্মদ শরীফ আল আমিন জানান, বন্দর দিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আনার মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ তাদের সার্বক্ষণিক তদারকি ও তল্লাশি অভিযান জোরদার করেছে। এআইআর শাখা ছাড়াও শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) যৌথভাবে বন্দরে সন্দেহজনক চালান চিহ্নিতকরণে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ডিজিটাল নজরদারি ও অন্যান্য সংস্থার সাথে এনবিআরের তথ্যের সমন্বয় বাড়িয়ে অসাধু চক্রগুলোর ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে।

অন্যদিকে, বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী সমাজের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে সতর্কতা উচ্চারণ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক এবং চট্টগ্রাম কাস্টম অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য মো. ইসমাইল খান মন্তব্য করেন যে, মিথ্যা ঘোষণার অন্তরালে প্রায়ই একটি সংঘবদ্ধ ও শক্তিশালী চক্র সক্রিয় থাকে। ইচ্ছাকৃতভাবে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া এসব অসাধু আমদানিকারক ও চক্রের বিরুদ্ধে কাস্টমসের কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে এ-ও উল্লেখ করেন যে, তদারকি ও তল্লাশির নামে অতিরিক্ত কড়াকড়ির কারণে যেন বন্দরে জট না তৈরি হয় এবং সাধারণ সৎ ও বৈধ আমদানিকারকদের পণ্য খালাসে অযথা বিলম্ব বা ব্যবসায়িক ক্ষতির শিকার হতে না হয়। প্রশাসন ও ব্যবসায়ীদের যৌথ প্রচেষ্টায় বৈধ বাণিজ্য সুগম রেখেই রাজস্ব ফাঁকি পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।