জবাবদিহির রাজনীতির বার্তা

সহিদুল আলম স্বপন, জেনেভা, সুইজারল্যান্ড
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৫ পিএম
আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৬ পিএম
Main News Image

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রের শক্তি শুধু জনপ্রিয় নেতৃত্বে নয়, বরং প্রতিষ্ঠান, নিয়মনীতি এবং জবাবদিহির সংস্কৃতিতে নিহিত থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্ক এবং তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সেই জবাবদিহির প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে।

মাদকবিরোধী কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দ্বিমত থাকার সুযোগ খুব কম। সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য মাদক একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, আইনের শাসনের ভিত্তি হলো দায়িত্ব ও ক্ষমতার সুনির্দিষ্ট সীমারেখা। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা পরস্পর পরিপূরক হলেও একে অপরের বিকল্প নয়।

এই বাস্তবতায় একজন প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়ার ঘটনা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ঘটনাটির পেছনে উদ্দেশ্য যাই থাকুক না কেন, জনপরিসরে এর প্রতীকী অর্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনায় শুধু কাজের উদ্দেশ্য নয়, কাজের পদ্ধতিও সমানভাবে বিবেচ্য। বিশেষ করে মন্ত্রিসভার সদস্যদের আচরণ সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের নীতি ও সংস্কৃতির প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়।

এখানে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সধারী কেউ আত্মরক্ষার প্রয়োজনে অস্ত্র বহনের অধিকার রাখলেও অস্ত্র প্রদর্শনের ক্ষেত্রে আইন ও বিধিমালার নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কোনো পরিস্থিতিতে অস্ত্র প্রদর্শন যৌক্তিক ছিল কি না, আইন লঙ্ঘিত হয়েছে কি না কিংবা নিরাপত্তার হুমকি কতটা বাস্তব ছিল, তা তদন্ত ও আইনগত মূল্যায়নের বিষয়। এ কারণে সংশ্লিষ্ট সংস্থার তদন্ত শেষ হওয়ার আগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেমন সমীচীন নয়, তেমনি জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টিকারী কোনো ঘটনার জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা, অপরাধী গ্রেপ্তার বা আইন প্রয়োগের দায়িত্ব মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। জনপ্রতিনিধিরা এ বিষয়ে উদ্যোগ, তদারকি ও জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারেন; কিন্তু সরাসরি আইন প্রয়োগকারী ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে দায়িত্ব ও কর্তৃত্বের সীমারেখা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর জন্যও অনাকাঙ্ক্ষিত দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বার্তা হিসেবে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। এটি ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা এবং সরকারের সামষ্টিক দায়বদ্ধতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। একই সঙ্গে এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসনের প্রশ্নে শুধু সাফল্য নয়, আচরণগত মানদণ্ডও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এ ঘটনাকে কেবল শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। বরং এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে জবাবদিহি, আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তার একটি স্মারক। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নেতৃত্বের দৃঢ়তার পাশাপাশি ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

একটি পরিণত গণতন্ত্রে ব্যক্তি যত প্রভাবশালীই হোন না কেন, তাঁর কর্মকাণ্ডকে প্রতিষ্ঠান, আইন এবং জনআস্থার মানদণ্ডে বিচার করা হয়। ইশরাক হোসেনকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্ক ও পরবর্তী সিদ্ধান্ত সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। মাদকবিরোধী অবস্থানের প্রয়োজনীয়তা যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমারেখা মেনে চলাও অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে তাই শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হিসেবে নয়, বরং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করার একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত জনগণের আস্থা সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী হয় তখনই, যখন রাষ্ট্র প্রমাণ করতে পারে যে নীতি ও আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।