প্রকৌশল থেকে কূটনীতি, জাতিসংঘের উপদেষ্টা কমিটিতে সুফিউর রহমান
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক মোহাম্মদ সুফিউর রহমান। জেনেভায় পরিষদের ৬৩তম অধিবেশনে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত আসন থেকে তাঁকে নির্বাচিত করা হয়। প্রকৌশল ও ব্যবসায় প্রশাসনে পড়াশোনার পর তিন দশকের বেশি সময় কূটনীতিতে কাটানো এই বাংলাদেশি এবার মানবাধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা ও পরামর্শ প্রদানের দায়িত্বে যুক্ত হলেন।
বুধবার, ৭ অক্টোবর জাতিসংঘের প্রকাশিত অধিবেশনের সমাপনী বিবরণীতে তাঁর নির্বাচনের তথ্য জানানো হয়। একই অঞ্চল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার রীভা গাঙ্গুলি দাসও। এবার চারটি আঞ্চলিক গোষ্ঠী থেকে মোট ছয়জনকে কমিটিতে নির্বাচিত করা হয়েছে।
সুফিউর রহমানের শিক্ষাজীবন ও পেশাগত যাত্রায় রয়েছে বৈচিত্র্য। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশিত তাঁর জীবনবৃত্তান্ত অনুযায়ী, তিনি ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুরকৌশলে স্নাতক এবং ১৯৯৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। কূটনৈতিক পেশায় যোগ দেওয়ার আগে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, ঢাকায় পুরকৌশলের প্রভাষক হিসেবেও কাজ করেছেন।
বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারের নবম ব্যাচের কর্মকর্তা সুফিউর রহমান কর্মজীবনে অস্ট্রেলিয়া ও শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার এবং মিয়ানমারে রাষ্ট্রদূত ছিলেন। সর্বশেষ তিনি সুইজারল্যান্ডে রাষ্ট্রদূত ও জেনেভায় জাতিসংঘ কার্যালয়ে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদে বাংলাদেশ মিশন এবং কাঠমান্ডুতে সার্ক সচিবালয়ে কাজ করেছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়েও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
নতুন দায়িত্বের সঙ্গে তাঁর জেনেভার অভিজ্ঞতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। নিজের জীবনবৃত্তান্তে তিনি মানবাধিকার পরিষদের বিভিন্ন বৈঠক, পরিষদের কার্যদল এবং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করার কথা উল্লেখ করেছেন। ২০২৩ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির সর্বজনীন পর্যায়ক্রমিক পর্যালোচনা বা ইউপিআর প্রক্রিয়াতেও তিনি যুক্ত ছিলেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতিসংঘের শরণার্থী ও অভিবাসনবিষয়ক সংস্থাগুলোর আলোচনায় অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর।
এই শিক্ষাগত ও পেশাগত পটভূমি বিবেচনায় তাঁর সম্ভাব্য অবদানের কয়েকটি দিক সামনে আসে। প্রকৌশলের শিক্ষা সমস্যা বিশ্লেষণ ও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নের ভিত্তি দিতে পারে। ব্যবসায় প্রশাসনের জ্ঞান কাজে আসতে পারে নীতির বাস্তবায়ন, সম্পদের ব্যবহার ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বোঝার ক্ষেত্রে। তবে মানবাধিকারবিষয়ক নতুন দায়িত্বে তাঁর সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা হলো বহুপক্ষীয় আলোচনা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ এবং মানবিক সংকটের কূটনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে পরিচিতি।
বিশেষ করে মিয়ানমারে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা বাস্তুচ্যুতি, নাগরিকত্ব ও শরণার্থী সুরক্ষার মতো বিষয় পর্যালোচনায় সহায়ক হতে পারে। সার্ক ও অর্থনৈতিক কূটনীতিতে কাজের অভিজ্ঞতাও উন্নয়ন, দারিদ্র্য এবং অধিকার সুরক্ষার পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝার সুযোগ দিয়েছে। এগুলো তাঁর সম্ভাব্য অবদানের ক্ষেত্র; কমিটিতে তাঁর নির্দিষ্ট কাজ নির্ভর করবে পরিষদের দেওয়া দায়িত্বের ওপর।
মানবাধিকার পরিষদের উপদেষ্টা কমিটি ১৮ জন স্বাধীন বিশেষজ্ঞ নিয়ে গঠিত। পরিষদের অনুরোধে নির্দিষ্ট বিষয়ে গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ প্রদান করে এটি। সদস্যরা তিন বছরের জন্য নির্বাচিত হন এবং নিজ নিজ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, ব্যক্তিগত যোগ্যতায় স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে সুফিউর রহমানের এই নির্বাচন একজন বাংলাদেশি পেশাজীবীর জন্য উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক অর্জন হলেও তাঁর দায়িত্ব হবে সব দেশের মানুষের অধিকার বিবেচনায় নিরপেক্ষভাবে কাজ করা।
অবসরের পর সুফিউর রহমান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্সে জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো হিসেবে যুক্ত রয়েছেন। কূটনীতির মাঠের অভিজ্ঞতার সঙ্গে গবেষণার এই সংযোগ নতুন দায়িত্বে সহায়ক হতে পারে। এখন তাঁর সামনে সুযোগ সেই অভিজ্ঞতাকে মানবাধিকার সুরক্ষায় কার্যকর, তথ্যনির্ভর ও বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশে রূপ দেওয়ার।