রোববার থেকে সুইজারল্যান্ডে ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পেছাবে, ফিরছে স্ট্যান্ডার্ড টাইম

সহিদুল আলম স্বপন, জেনেভা, সুইজারল্যান্ড
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৬ পিএম
আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৮ পিএম
Main News Image

সুইজারল্যান্ড ও ইউরোপের অধিকাংশ দেশে আগামী রোববার ভোর ৩টা থেকে আবার কার্যকর হচ্ছে স্ট্যান্ডার্ড টাইম। এ উপলক্ষে ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পেছানো হবে। ফলে শনিবার গভীর রাত থেকে রোববার ভোর পর্যন্ত মানুষ অতিরিক্ত এক ঘণ্টা সময় পাবেন।

ইউরোপজুড়ে প্রতি বছর অক্টোবরের শেষ রোববার ডে-লাইট সেভিং টাইম বা সামার টাইমের সমাপ্তি ঘটে এবং অঞ্চলটি স্ট্যান্ডার্ড টাইমে ফিরে যায়। এর ফলে দিনের সূচনা তুলনামূলক আগে হলেও সন্ধ্যায় দ্রুত অন্ধকার নেমে আসে।

সুইস ফেডারেল ইনস্টিটিউট অব মেট্রোলজি (মেটাস) জানিয়েছে, সাধারণভাবে ব্যবহৃত ‘উইন্টার টাইম’ পরিভাষাটি প্রযুক্তিগতভাবে সঠিক নয়। তাদের মতে, মূলত দুটি সময়ব্যবস্থা রয়েছে, সামার টাইম এবং স্ট্যান্ডার্ড টাইম। অক্টোবরে ঘড়ির কাঁটা পেছানোর মাধ্যমে সময় আসলে তার স্বাভাবিক বা মানক অবস্থায় ফিরে যায়।

তেল সংকট থেকে যাত্রা

ইউরোপে ১৯৭৩ সালের তেল সংকটের পর জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে ডে-লাইট সেভিং টাইম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। দিনের আলোকে বেশি কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোর লক্ষ্যেই এ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল।

সুইজারল্যান্ড ১৯৮১ সালে এ ব্যবস্থায় যোগ দেয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সময়ের সামঞ্জস্য বজায় রাখা এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা সহজ করাই ছিল এর অন্যতম কারণ। সেই থেকে প্রতি বছর মার্চ মাসের শেষ রোববার ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে এবং অক্টোবরের শেষ রোববার এক ঘণ্টা পেছানো হচ্ছে।

আগামী বছর ২৮ মার্চ ২০২৭ আবার ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে দিয়ে সামার টাইম চালু করা হবে।

স্থায়ী সামার টাইম নিয়ে বিতর্ক

বহু বছর ধরেই ইউরোপে বছরে দুবার ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। জনমত জরিপে দেখা গেছে, একটি বড় অংশ এই প্রথা বাতিল করে স্থায়ী কোনো সময়ব্যবস্থা চালুর পক্ষে।

তবে কোন সময়ব্যবস্থা স্থায়ী হবে তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অনেকেই স্থায়ী সামার টাইমের পক্ষে থাকলেও সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলো ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।

কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার গবেষক রেমন্ড লামের নেতৃত্বে পরিচালিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সকালের প্রাকৃতিক আলো মানুষের জৈবিক ঘড়িকে ২৪ ঘণ্টার দৈনন্দিন চক্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে সন্ধ্যার দীর্ঘ আলো শরীরের স্বাভাবিক ছন্দকে পিছিয়ে দিতে পারে।

গবেষকদের মতে, সারা বছর সামার টাইম চালু থাকলে শীতকালে মানুষকে দীর্ঘ সময় অন্ধকারের মধ্যে দিন শুরু করতে হবে। স্কুলগামী শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ এবং ভোরে বাইরে বের হওয়া ব্যক্তিরা এর প্রভাব বেশি অনুভব করবেন।

স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা

ঘুম ও জৈবিক ছন্দ নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ সংগঠনগুলো মনে করে, ঘড়ি পরিবর্তনের ব্যবস্থা বাতিল করা হলে স্থায়ী স্ট্যান্ডার্ড টাইমই স্বাস্থ্যগতভাবে অধিক উপযোগী হবে।

তাদের মতে, সকালের পর্যাপ্ত সূর্যালোক মানুষের ঘুম, মানসিক স্বাস্থ্য এবং কর্মক্ষমতার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিপরীতে শীতকালে দীর্ঘ সময় অন্ধকারে থাকার ফলে মৌসুমি বিষণ্নতা বা ‘সিজনাল অ্যাফেকটিভ ডিসঅর্ডার’-এর ঝুঁকি বাড়তে পারে।

অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা

স্থায়ী সামার টাইম নিয়ে বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতাও খুব উৎসাহব্যঞ্জক নয়। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৪ সালের জ্বালানি সংকটের সময় এ ব্যবস্থা চালু করলেও এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তা বাতিল করতে বাধ্য হয়।

রাশিয়া ২০১১ সালে স্থায়ী সামার টাইম চালু করেছিল, তবে জনঅসন্তোষ এবং নানা সমালোচনার মুখে ২০১৪ সালে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। একইভাবে চিলিও স্থায়ী সামার টাইমের নীতি পরবর্তীকালে বাতিল করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সময় পরিবর্তনের বর্তমান ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকলেও মানবদেহের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দ, ঘুমের গুণগত মান এবং জনস্বাস্থ্যের দিক থেকে স্ট্যান্ডার্ড টাইমের পক্ষে এখনও শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে। তাই সময় পরিবর্তনের প্রথা একদিন বিলুপ্ত হলেও স্থায়ী স্ট্যান্ডার্ড টাইমই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।