সেবা ও রাজনীতিতে স্বচ্ছতা আনতে ফিরছে ‘গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থা

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৫৭ পিএম
আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫২ পিএম
Main News Image

ঢাকা, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬: সামাজিক নিরাপত্তা ও স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রমে গতি আনতে এবং স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে চার দশকেরও বেশি সময় পর দেশে পুনরায় চালু হতে যাচ্ছে ‘গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থা।

ইতিমধ্যে ‘গ্রাম সরকার আইন ২০২৬’-এর একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং এর ওপর সর্বসাধারণের মতামত আহ্বান করা হয়েছে। আগামী ১৭ নভেম্বরের মধ্যে নাগরিকরা স্থানীয় সরকার বিভাগের ওয়েবসাইটে উল্লেখিত ই-মেইল ঠিকানায় তাদের মতামত পাঠাতে পারবেন। জনসাধারণের মতামত বিশ্লেষণের পর খসড়াটি চূড়ান্ত করে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে।

প্রেক্ষাপট ও সিদ্ধান্ত: 
গত ৫ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে গ্রাম সরকার পুনর্বহালের বিষয়ে নীতিগত আলোচনা হয়। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে রহিত হওয়া ‘গ্রাম সরকার আইন ২০০৩’ পরিমার্জন করে নতুন আইনের খসড়াটি তৈরি করা হয়।

এ বিষয়ে সাবেক সচিব ও সুশাসনকর্মী এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার জানান, গ্রাম সরকার একটি অত্যন্ত ইতিবাচক উদ্যোগ। এটি রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াবে। তবে এই ব্যবস্থাকে কার্যকর ও সফল করতে হলে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিতে হবে।

গঠনকাঠামো ও নির্বাচন প্রক্রিয়া:
প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিটি ওয়ার্ডে ১৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি করে গ্রাম সরকার গঠিত হবে:

প্রধান: সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য।

উপদেষ্টা: সংরক্ষিত নারী আসনের ইউপি সদস্য।

সদস্য: ১৫ জন।

সারা দেশের সাড়ে ৪ হাজারের বেশি ইউনিয়নের প্রায় ৪১ হাজার ওয়ার্ডে অনুষ্ঠিতব্য এ প্রক্রিয়ায় অন্তত ৭ লাখ স্থানীয় প্রতিনিধি যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে সদস্যদের নির্বাচিত করবেন, যেখানে অন্তত ১০ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। গ্রাম সরকারের মেয়াদ হবে ৫ বছর।

কার্যক্রম ও পরিচালনা:
গ্রাম সরকারগুলো উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, আইন-শৃঙ্খলা ও সামাজিক সমস্যা (যেমন: নারী ও শিশু নির্যাতন, মাদক, জুয়া) প্রতিরোধ, শিক্ষা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, সমবায় ও পরিবেশ সুরক্ষায় কাজ করবে।

এছাড়া নতুন খসড়ায় যুগের সাথে সামঞ্জস্য রেখে কিছু নতুন দায়িত্ব যুক্ত করা হয়েছে:

সরকারের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রধানদের কার্ড ও ক্রীড়া কার্ড বিতরণ ও তথ্য সংগ্রহ।

ভিজিএফ (VGF) ও ভিজিডি (VGD) কার্যক্রমে সহায়তা।

পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে উৎসাহিতকরণ।

গ্রাম সরকার প্রতি দুই মাসে অন্তত একবার পরিচালনা সভা এবং ছয় মাসে অন্তত একবার সাধারণ সভা আহ্বান করবে। কাজের সুবিধার্থে এতে বিভিন্ন কমিটি ও সাব-কমিটি থাকবে। এদের আলাদা তহবিল থাকবে, যাতে ইউনিয়ন পরিষদ ও অন্যান্য উৎস থেকে অর্থ জমা হবে। জেলা প্রশাসক প্রয়োজনে কোনো অনিয়ম তদন্তপূর্বক কারণ দর্শানোর সুযোগ দিয়ে গ্রাম সরকার বাতিল করতে পারবেন।

ইতিহাস:
দেশে ১৯৮০ সালে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে প্রথম ‘গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। ১৯৮২ সালে এরশাদ সরকারের আমলে এটি বিলুপ্ত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে ‘গ্রাম পরিষদ আইন’ এবং ২০০৩ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার পুনরায় ‘গ্রাম সরকার আইন ২০০৩’ প্রণয়ন করে। সর্বশেষে ২০০৯ সালের ৬ এপ্রিল তৎকালীন সরকার আইনটি বাতিল করেছিল।