আলোয় ভুবন ভরা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঐতিহাসিক রাশিয়া সফর উদ্যাপন
রাশিয়ান হাউস ইন ঢাকা ও সংস্কৃতি-র যৌথ উদ্যোগে “আলোয় ভুবন ভরা: রাশিয়ায় রবীন্দ্রনাথের যাত্রা—পত্রাবলি, গান ও মনন” শীর্ষক একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
১৯৩০ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঐতিহাসিক সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরের ৯৬তম বার্ষিকী স্মরণে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে কবির রাশিয়া-অভিজ্ঞতা, তাঁর ভাবনা এবং দুই দেশের সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত সম্পর্কের তাৎপর্য তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে সোভিয়েত সমাজ সম্পর্কে কবির উপলব্ধি এবং শিক্ষা, সামাজিক অগ্রগতি, মানবিক মর্যাদা ও সাধারণ মানুষের জীবন সম্পর্কে তাঁর চিন্তাভাবনা বিশেষভাবে আলোচিত হয়। বক্তব্যে রাশিয়ান হাউস ইন ঢাকার পরিচালক মিস আলেকজান্দ্রা এ. খ্লেভনয় সোভিয়েত শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি রবীন্দ্রনাথের গভীর আগ্রহ ও প্রশংসার কথা তুলে ধরেন।
তিনি উল্লেখ করেন, শিক্ষার প্রতি কবির এই দৃষ্টিভঙ্গি আজও রাশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে শিক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি আরও জানান, রাশিয়ায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য রাশিয়ান সরকারি বৃত্তির সংখ্যা প্রতিবছর বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বাংলাদেশের তরুণদের সামনে উচ্চশিক্ষার নতুন নতুন সুযোগ উন্মোচন করছে।
বাংলা ও রুশ ভাষায় কবিতা আবৃত্তি ছিল সন্ধ্যার অন্যতম আকর্ষণ। সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ভেরোনিকা ক্লিমচেঙ্কো, যিনি বিদেশি ভাষা হিসেবে বাংলা অধ্যয়ন করেছেন এবং বর্তমানে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ইন্টার্নশিপ করছেন, অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কবিতা আবৃত্তি করেন। রাশিয়ান হাউস ইন ঢাকার রুশ ভাষা কোর্সের শিক্ষার্থীরাও এই পর্বে অংশগ্রহণ করেন।
সংগীতের সুরে বাংলা ও রাশিয়ার মেলবন্ধন অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। মস্কোর এমজিআইএমও ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা “আমি চিনি গো চিনি তোমারে” গানটি পরিবেশন করেন। অন্যদিকে, মিস ইউলিয়ানা ঝাভোরনকোভা পরিবেশন করেন “গ্রামছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ”। এরপর সংস্কৃতি-র শিল্পীরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নির্বাচিত গান পরিবেশন করেন। এসব সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে কবির সর্বজনীন মানবতাবাদী দর্শন এবং বাংলা ও রাশিয়ার মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক বন্ধন সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়।
রবীন্দ্রনাথের রাশিয়া-অভিজ্ঞতা ও সাহিত্যচর্চা অনুষ্ঠানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। এ পর্বে ড. ইন্দ্রজিৎ রায় রচিত The Soviet Union in Its Early Days: In the Eyes of the Poet Rabindranath Tagore গ্রন্থটির পরিচিতি তুলে ধরা হয় এবং মোশতাক আহমেদ গ্রন্থটির ওপর একটি পর্যালোচনা উপস্থাপন করেন। পাশাপাশি Letters from Russia থেকে নির্বাচিত অংশ পাঠ এবং Tagore in Russia (১৯৬১) প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে অতিথিরা রাশিয়ায় রবীন্দ্রনাথের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও উপলব্ধির সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান।
এই বিশেষ সাংস্কৃতিক আয়োজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাশিয়া সফরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য নতুন করে উপলব্ধি করার পাশাপাশি বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত সম্পর্ক নিয়ে ভাবনার এক অর্থবহ পরিসর সৃষ্টি করে। সাহিত্য, সংগীত ও শিক্ষার মধ্য দিয়ে দুই দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া, শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্বের বন্ধন আরও সুদৃঢ় হয়ে উঠছে।
রাশিয়ান হাউস ইন ঢাকা এই সুন্দর আয়োজন বাস্তবায়নে সহযোগিতার জন্য সংস্কৃতি এবং এর সভাপতি ড. মোখবুল হোসেনের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে। একই সঙ্গে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী সকল শিল্পী, শিক্ষার্থী, গবেষক ও অতিথিদের প্রতিও জানাচ্ছে আন্তরিক ধন্যবাদ। তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও মূল্যবান অবদান অনুষ্ঠানটিকে সার্থক ও স্মরণীয় করে তুলেছে।