ইনানীতে অনবরত জ্বলছে গ্যাস, রিলিফ কূপ খননের সিদ্ধান্ত: পেট্রোবাংল

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৭ এএম
আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:০২ এএম
Main News Image

ছবি: সংগৃহিত

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানীতে নলকূপ বসাতে গিয়ে ভূগর্ভ থেকে আচমকা অনিয়ন্ত্রিত গ্যাস নির্গমন ও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। টানা চার দিন ধরে জ্বলতে থাকা এই আগুন নিয়ন্ত্রণে না আসায় পরিস্থিতি ক্রমেই আশঙ্কাজনক রূপ নিচ্ছে। অগ্নিকাণ্ড ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ এড়াতে স্থানীয় প্রশাসন ঘটনাস্থলের ২০০ মিটার এলাকা জুড়ে ১৪৪ ধারা জারি করে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ করলেও উৎসুক জনতার ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। এই সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে দেশের প্রধান জ্বালানি সংস্থা পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, গ্যাসের প্রবাহ ও সার্বিক অবস্থা টানা ১৫ দিন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হবে এবং প্রয়োজন হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ‘রিলিপ কূপ’ (Relief Well) খননের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিন আগে ইনানী সৈকত সংলগ্ন এলাকায় একটি গভীর নলকূপ বসানোর কাজ শুরু হয়। পাইপ বসানোর সময় ভূগর্ভের সুনির্দিষ্ট এক গভীরতায় পৌঁছাতেই হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে গ্যাস বের হতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যেই সেই গ্যাসে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়। আজ টানা চার দিন ধরে সেই আগুনের শিখা অবিরত জ্বলছে এবং বাতাস ও গ্যাসের চাপের কারণে শিখার উচ্চতা মাঝে মাঝেই আশঙ্কাজনকভাবে ওঠানামা করছে।

আগুনের তীব্রতা ও ভূগর্ভস্থ অতিরিক্ত চাপের কারণে আশপাশের বসতি ও পর্যটন এলাকার নিরাপত্তায় বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত এই গ্যাস নির্গমন দীর্ঘায়িত হলে ভূগর্ভস্থ স্তর ধসে পড়ার বা আশেপাশের বিস্তৃত এলাকায় বিস্ফোরণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় দুর্ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শনে যান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলা এবং বাপেক্সের একটি প্রতিনিধিদল। উচ্চপর্যায়ের এই কারিগরি দলে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) ভূতাত্ত্বিক বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুকতাদির এবং বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব।

পরিদর্শন শেষে প্রতিনিধিদলের প্রধান ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তারা জরুরি বৈঠক করেন। বৈঠকে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে সার্বিক সুরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, গ্যাসের প্রকৃত উৎস, ভূগর্ভস্থ রিজার্ভারের ধরন এবং মজুতের সঠিক পরিমাপ না জেনে হঠাৎ করে কোনো যান্ত্রিক হস্তক্ষেপ বা আগুন নেভানোর চেষ্টা করা অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে।

বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ধারণা করা হচ্ছে, এটি কোনো গভীর গ্যাসক্ষেত্র নাও হতে পারে। সাধারণত বাংলাদেশে ১.৫ কিলোমিটার থেকে শুরু করে ৫ কিলোমিটার বা তারও বেশি গভীরে বাণিজ্যিকভাবে গ্রহণযোগ্য প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান মজুত পাওয়া যায়। তবে ইনানীর ক্ষেত্রে অতি কম গভীরতায় গ্যাসের সন্ধান মেলায় বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এটি ভূগর্ভের অগভীর পকেট বা ‘শ্যালো রিজার্ভার’ (Shallow Reservoir) হতে পারে।

ভূতাত্ত্বিকদের মতে, উপকূলীয় এবং পার্বত্য পলিমাটি সমৃদ্ধ এলাকায় মাটির নিচে বহু বছর ধরে পচে যাওয়া জৈব পদার্থ থেকে এই ধরণের পকেট গ্যাস জমা হতে পারে। তবে এই শ্যালো পকেটে গ্যাসের চাপ ঠিক কতটা বা এর আয়তন কত বড়, তা পরীক্ষা ছাড়া বলা সম্ভব নয়। এটি কয়েক দিনের মধ্যে নিজে থেকেই নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে, আবার দীর্ঘ মেয়াদে গ্যাস নির্গমন অব্যাহত রেখে বড় বিপদের কারণও হতে পারে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স যৌথভাবে ১৫ দিনের একটি কঠোর মনিটরিং ও পর্যবেক্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই সময়সীমার মধ্যে কারিগরি টিমের কাজগুলো হবে:

আগুনের শিখার উচ্চতা ও গ্যাসের চাপ পরিমাপ: প্রতিদিন গ্যাস নির্গমনের মাত্রা এবং শিখার শক্তির পরিবর্তন নিখুঁতভাবে রেকর্ড করা।

ভূগর্ভস্থ কম্পন পর্যবেক্ষণ: গ্যাস বের হওয়ার কারণে মাটির নিচের স্তরে কোনো পরিবর্তন বা ধসের শঙ্কা আছে কি না তা দেখা।

রাসায়নিক উপাদান পরীক্ষা: নির্গত গ্যাসের মধ্যে মিথেন বা অন্যান্য বিপজ্জনক উপাদানের ঘনত্ব নির্ণয় করা।

বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, যদি আগামী ১৫ দিনের পর্যবেক্ষণে দেখা যায় গ্যাসের প্রবাহ কমছে না বা এটি প্রাকৃতিক উপায়ে বন্ধ হওয়ার কোনো আলামত নেই, তবে ভূগর্ভের সেই চাপীয় পকেটের চাপ কমাতে এবং মূল পাইপের বিকল্প হিসেবে পার্শ্ববর্তী স্থানে ‘রিলিপ কূপ’ খননের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। রিলিফ কূপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে গ্যাস নিষ্কাশন করে আগুন নিভিয়ে ফেলা সম্ভব হবে।

ঘটনাস্থলে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে এবং সাধারণ মানুষের জানমালের সুরক্ষায় উখিয়া উপজেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দুর্ঘটনাস্থলের চারপাশের ২০০ মিটার এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। উক্ত এলাকার মধ্যে জনসাধারণের প্রবেশ, অবস্থান বা কোনো ধরনের আলো বা আগুন জ্বালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও কক্সবাজারে আসা বহু উৎসুক পর্যটক প্রতিনিয়ত প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অঘটনস্থলে ভিড় জমানোর চেষ্টা করছেন, যা উদ্ধার ও তদারকি কাজে চরম ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দুর্ঘটনাস্থল ঘিরে কর্ডন তৈরি করেছে এবং সাধারণ মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার আহ্বান জানাচ্ছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ে রাখতে স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস ইউনিটগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।