১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ: প্রান্তিক চাষিদের মুখে হাসির ঝলক

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৪ এএম
আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৫ পিএম
Main News Image

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সারাদেশে ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন কৃষকের সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফ করেছে। সরকারের এ পদক্ষেপে ঋণের বোঝা থেকে স্বস্তি পেয়েছেন প্রান্তিক কৃষকেরা, যার ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হচ্ছে।

দীর্ঘদিনের ঋণের বোঝা ও খেলাপি হওয়ার কারণে নতুন করে ব্যাংকঋণ না পাওয়া সংকটগ্রস্ত এসব কৃষকের পক্ষে সুদসহ মোট ১ হাজার ৩৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে সরকার।

১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণগ্রহণকারী কৃষকদের মূল ঋণের ওপর জমা হওয়া সম্পূর্ণ আসল ও সুদ মওকুফ করা হয়েছে। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ও কৃষকবান্ধব নীতির অংশ হিসেবে বাস্তবায়িত এ কর্মসূচিকে প্রান্তিক কৃষকদের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্টরা।

প্রান্তিক কৃষকদের স্বস্তি ও প্রতিক্রিয়া
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও বাজার মন্দায় জর্জরিত প্রান্তিক চাষিরা ঋণ পরিশোধের দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেয়ে নতুন উদ্যমে কৃষিকাজে মনোনিবেশ করছেন। চড়া সুদের মহাজনি দাদন ব্যবসার শৃঙ্খল ভেঙে কৃষকরা পুনরায় আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ধারায় ফিরে আসছেন।

যশোর সদর উপজেলার কয়েকজন কৃষকের অভিজ্ঞতায় এই স্বস্তির চিত্র ফুটে উঠেছে:

ফারুক হোসেন (নারাঙ্গলী গ্রাম): ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে দুশ্চিন্তায় ছিলেন। ঋণ শোধের জন্য গরু বা গাছ বিক্রির কথা ভাবছিলেন। ঋণ মওকুফ হওয়ায় তাঁকে আর সম্পদ বিক্রি করতে হয়নি।

মো. মহিউদ্দিন (ঝাউদিয়া গ্রাম): ঋণ শোধের চাপ থেকে বেঁচে গিয়ে জানান, "নির্বাচনের আগের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার গঠন করেই ঋণ মওকুফ করে আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে।"

এছাড়া চাঁচড়া ইউনিয়নের ইদ্রিস আলী এবং আরবপুর ইউনিয়নের হায়দার আলীসহ অসংখ্য কৃষক সরকারের এই সিদ্ধান্তে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।

ব্যাংকভিত্তিক ঋণ মওকুফের তথ্য

দেশব্যাপী এ কর্মসূচির সিংহভাগ সুবিধা দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে।

ব্যাংক / মাধ্যম সুবিধাপ্রাপ্ত কৃষক মওকুফকৃত অর্থের পরিমাণ

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ৭ লাখ ৯ হাজার ৬৭ ৯ জন ৬০৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা

অন্যান্য ব্যাংক (রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক) ৭ লাখ ২৪ হাজার ৮০৩ জন ৭৪৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা

সর্বমোট ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন ১,৩৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা

সাধারণ কৃষকদের যেন কোনো হয়রানির শিকার হতে না হয়, সেজন্য সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সমন্বয়ে একটি নির্দিষ্ট দাপ্তরিক নীতিমালার মাধ্যমে সরাসরি এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতামত ও খাদ্য নিরাপত্তা
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বড় উপহার। কৃষক বাঁচলে উৎপাদন বাড়বে, আর উৎপাদন বাড়লে দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে।’

তিনি আরও উল্লেখ করেন:আন্তর্জাতিক বাজারে সংকট দেখা দিলে ভিয়েতনাম বা থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো চড়া দামে খাদ্য বিক্রি করে। তাই বিদেশ থেকে বেশি দামে খাদ্য আমদানি এড়াতে দেশীয় কৃষিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

টেকসই স্বাবলম্বী করতে শুধু ঋণ মওকুফই যথেষ্ট নয়; উৎপাদন ব্যয় কমানো, কৃষি উপকরণ নিশ্চিত করা ও ভর্তুকি বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে।

কৃষি ঋণপ্রবাহ ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্যমাত্রা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল ১১.৮৫ শতাংশ। দেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে কৃষি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

২০২৪-২০২৫ অর্থবছর: কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ ছিল ৩৭,৩২৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

২০২৫-২০২৬ অর্থবছর: নির্ধারিত ৩৯,০০০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে অর্জিত হয় ৪২,৮৩৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা (বছরে বৃদ্ধি ১৪.৭৬%)।

২০২৬-২০২৭ অর্থবছর (চলতি): লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৫৩.৮৫% বাড়িয়ে ৬০,০০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে (ব্যাংকগুলোর নিট ঋণ ও অগ্রিমের ৪%।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণ মওকুফের অর্থ সরকার সরাসরি ব্যাংকগুলোকে পরিশোধ করায় স্থানীয় শাখাগুলোর তারল্য সংকট দূর হবে, যার ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন ঋণপ্রবাহ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে।