ইলিশের উৎসব পেরিয়ে স্বার্থের কূটনীতি

সহিদুল আলম স্বপন, জেনেভা, সুইজারল্যান্ড
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৬ এএম
আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০২:১১ এএম
Main News Image

ইলিশ দিয়ে আপ্যায়ন করা যায়, সম্পর্কের বরফও কিছুটা গলানো যায়। কিন্তু নদীর পানির হিস্যা, সীমান্তে নাগরিকের নিরাপত্তা কিংবা বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন অন্য ধরনের প্রস্তুতি। সেখানে সৌজন্যের সঙ্গে চাই যুক্তি, তথ্য, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং দরকষাকষির ক্ষমতা। রাষ্ট্রের কূটনীতি কতটা সফল, তার বিচার উৎসবের আয়োজন দিয়ে হয় না; হয় জাতীয় স্বার্থে অর্জিত ফল দিয়ে। নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক উপস্থিতির মূল্যায়নেও এই প্রশ্নটিই সামনে থাকা উচিত।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আবেগের বিষয় হতে পারে, কিন্তু তার ব্যবস্থাপনা আবেগ দিয়ে চলে না। অভিন্ন নদী, দীর্ঘ সীমান্ত, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোটি মানুষের জীবন। এই সম্পর্কের কোনো অমীমাংসিত প্রশ্নই কেবল দুই রাজধানীর আনুষ্ঠানিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়। নদীর পানি কমলে তার চাপ পড়ে কৃষকের ওপর, সীমান্তে প্রাণ গেলে শোক নামে একটি পরিবারে, বাণিজ্যবাধার খেসারত দেন ব্যবসায়ী ও ভোক্তা। ফলে দিল্লিতে বাংলাদেশের কূটনীতির কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের স্বার্থরক্ষার প্রশ্ন।

সেই কার্যকারিতা যাচাইয়ে অবশ্য সতর্কতা প্রয়োজন। প্রকাশ্যে কতটি বৈঠক হয়েছে, তা দিয়ে কূটনীতির পুরো হিসাব মেলে না। অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয় নীরবে। আবার প্রভাবশালী কারও সঙ্গে একটি ছবি মানেই নীতিগত অগ্রগতি নয়। একজন হাইকমিশনারের উচ্চপর্যায়ে সাক্ষাৎ না হওয়ার পেছনেও ব্যক্তিগত উদ্যোগের ঘাটতি ছাড়াও রাজনৈতিক কারণ থাকতে পারে। তাই মূল্যায়নের ভিত্তি হওয়া উচিত যোগাযোগের ধারাবাহিকতা, আলোচনার বিষয়বস্তু এবং তার ফলাফল। দৃশ্যমানতার অভাব যেমন ব্যর্থতার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়, তেমনি গোপন তৎপরতার দাবি সাফল্যের সনদ হতে পারে না।

আমাদের কূটনৈতিক চর্চা নিয়ে আলোচনায় এই পার্থক্য প্রায়ই হারিয়ে যায়। অনুষ্ঠান আয়োজন, অতিথির উপস্থিতি, প্রশংসাসূচক বক্তব্য এবং সংবাদ প্রকাশকে অর্জন হিসেবে তুলে ধরা সহজ। কিন্তু কোন বাণিজ্যবাধা দূর হলো, কোন অমীমাংসিত আলোচনা সচল হলো, বাংলাদেশের কোন উদ্বেগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে গুরুত্ব পেল, সেসবের উত্তর দেওয়া কঠিন। অথচ রাষ্ট্রের অর্থে পরিচালিত একটি মিশনের মূল্যায়নে কঠিন প্রশ্নগুলোরই অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা।

টাঙ্গাইল শাড়ি, জামদানি ও ইলিশ আমাদের ঐতিহ্য এবং গর্ব। এগুলোকে সামনে আনা প্রয়োজন। সংস্কৃতি মানুষের কৌতূহল তৈরি করে, দূরত্ব কমায় এবং কখনো আনুষ্ঠানিক আলোচনার বাইরেও সম্পর্কের দরজা খুলে দেয়। সমস্যা সংস্কৃতির ব্যবহারে নয়; সমস্যা শুরু হয় যখন সাংস্কৃতিক আয়োজনকেই পররাষ্ট্রনীতির সাফল্যের বিকল্প হিসেবে হাজির করা হয়। একটি উৎসব থেকে ব্যবসায়িক যোগাযোগ তৈরি হলো কি না, বাংলাদেশের পণ্য নতুন ক্রেতা পেল কি না কিংবা প্রভাবশালী মহলে আলোচনার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হলো কি না, সেই অনুসরণ না থাকলে আয়োজনের সম্ভাবনা অপূর্ণ থেকে যায়।

ইলিশ উৎসব নিজে তিস্তার জট খুলবে না। জামদানি প্রদর্শনীও সীমান্তে প্রাণহানি বন্ধের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করবে না। এসব বিষয়ে প্রয়োজন পৃথক কর্মপরিকল্পনা, রাজনৈতিক উদ্যোগ এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা। সাংস্কৃতিক কূটনীতি সেই প্রচেষ্টাকে সহায়তা করতে পারে, তার জায়গা নিতে পারে না। এই সাধারণ সত্যটি ভুলে গেলে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব ধীরে ধীরে অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

দিল্লির মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজধানীতে বাংলাদেশের যোগাযোগও একটি মন্ত্রণালয় বা কয়েকজন কর্মকর্তার মধ্যে আটকে থাকতে পারে না। কেন্দ্রীয় সরকার, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সংসদ সদস্য, ব্যবসায়ী সংগঠন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং বাংলাদেশের সঙ্গে স্বার্থসংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোর সঙ্গে নিয়মিত সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। নদীর পানি নিয়ে আলোচনা, পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট পক্ষও এক নয়। কাজেই প্রতিটি বিষয়ে কোথায় সিদ্ধান্ত হয়, কার উদ্বেগ কী এবং কোন যুক্তি কার্যকর হতে পারে, তার স্পষ্ট ধারণা থাকা চাই।

এ ধরনের যোগাযোগের উদ্দেশ্য অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া নয়। উদ্দেশ্য বাংলাদেশের অবস্থান বোঝানো, ভুল ধারণা দূর করা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ক্ষেত্র চিহ্নিত করা। কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ককে একটি দল বা ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল করে তুললে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যোগাযোগও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। টেকসই সম্পর্কের ভিত্তি হতে হয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও বহুমাত্রিক যোগাযোগ। বাংলাদেশেরও সেই ভিত্তি শক্ত করা প্রয়োজন।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্ষমতা, অর্থনীতি ও সম্পদের পার্থক্য আছে। এই বাস্তবতা অস্বীকার করে কূটনীতি হয় না। কিন্তু অসম শক্তির সম্পর্ক মানেই এক পক্ষ শুধু দাবি করবে, অন্য পক্ষ মানিয়ে নেবে, এমনও নয়। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, বাজার এবং আঞ্চলিক সহযোগিতায় ভূমিকার গুরুত্ব রয়েছে। প্রশ্ন হলো, সেই গুরুত্বকে আমরা কতটা সুসংগঠিত প্রস্তাব ও আলোচনার সক্ষমতায় রূপ দিতে পারছি। নিজের দরকষাকষির শক্তি বোঝার জন্য প্রতিপক্ষের প্রয়োজনও বুঝতে হয়।

এখানেই প্রস্তুতির গুরুত্ব। শুধু অভিযোগের তালিকা নিয়ে আলোচনায় গেলে চলে না; প্রয়োজন বাস্তবায়নযোগ্য প্রস্তাব, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং বিকল্প ব্যবস্থা। কোনো দাবি তাৎক্ষণিকভাবে আদায় না হলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, কোন ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সমাধান সম্ভব এবং কোথায় দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন, তা আগে থেকেই নির্ধারিত থাকা চাই। প্রতিটি বৈঠক নতুন করে শুরু হলে এবং কর্মকর্তার বদলির সঙ্গে আলোচনার স্মৃতিও হারিয়ে গেলে ধারাবাহিক সাফল্য আসে না।

অবশ্য সব দায় নয়াদিল্লির মিশনের ওপর চাপিয়ে দিলেও সুবিচার হবে না। হাইকমিশন ঢাকার পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান। রাজধানী থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা না এলে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর অবস্থানে সমন্বয় না থাকলে কিংবা প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকলে মিশনের উদ্যোগও আটকে যায়। আবার দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক অচলাবস্থা দূর করতে এমন পর্যায়ের যোগাযোগ প্রয়োজন হতে পারে, যা একজন হাইকমিশনারের এখতিয়ারের বাইরে। তাই জবাবদিহি শুধু মিশনের নয়, নীতিনির্ধারণী ব্যবস্থারও।

সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত ভারতসংক্রান্ত অগ্রাধিকারগুলো নির্দিষ্ট করা। পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ ও বিনিয়োগের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে লক্ষ্য, দায়িত্ব এবং পর্যালোচনার সময়সীমা থাকতে হবে। কোন আলোচনা কোথায় আটকে আছে, বাধা দূর করতে কার সিদ্ধান্ত প্রয়োজন এবং পরবর্তী উদ্যোগ কী, তার লিখিত হিসাব চাই। লক্ষ্য নির্ধারণে বাস্তববাদী হতে হবে; অপর পক্ষের সম্মতি ছাড়া যে ফল অর্জন সম্ভব নয়, তার নিশ্চয়তা দাবি করা অর্থহীন। কিন্তু যথাসময়ে উদ্যোগ, যথাযথ প্রস্তুতি এবং ধারাবাহিক অনুসরণের হিসাব অবশ্যই চাওয়া যায়।

দ্বিতীয়ত, মিশনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ভারতীয় রাজনীতি ও প্রশাসন বোঝেন, বাণিজ্যসংক্রান্ত সমস্যা বিশ্লেষণ করতে পারেন এবং সংশ্লিষ্ট মহলে কার্যকর যোগাযোগ গড়ে তুলতে সক্ষম, এমন কর্মকর্তার প্রয়োজন। দক্ষতা অর্জনের সুযোগ, প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি সংরক্ষণ এবং দায়িত্ব হস্তান্তরের কার্যকর ব্যবস্থাও জরুরি। শুধু পদায়ন দিয়ে কূটনৈতিক সক্ষমতা তৈরি হয় না; প্রয়োজন বিশেষজ্ঞ জ্ঞান, দায়িত্বের ধারাবাহিকতা এবং কাজের যথাযথ মূল্যায়ন।

তৃতীয়ত, সাংস্কৃতিক ও জনসংযোগ কার্যক্রমকেও উদ্দেশ্যনির্ভর করতে হবে। আয়োজনের আগে ঠিক করা দরকার কাদের কাছে পৌঁছাতে চাই এবং কেন। আয়োজনের পরে দেখতে হবে নতুন যোগাযোগ থেকে কী সুযোগ তৈরি হলো। একই সঙ্গে অমীমাংসিত রাষ্ট্রীয় প্রশ্নে কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তার উপযুক্ত তথ্য জনগণকে জানাতে হবে। আলোচনার সব বিবরণ প্রকাশ করা যায় না, কিন্তু গোপনীয়তার যুক্তিতে জবাবদিহির পুরো দরজা বন্ধ রাখা গ্রহণযোগ্য নয়।

কূটনীতির ফল সব সময় দ্রুত আসে না। বহু বছরের বিরোধ একটি বৈঠকে মেটে না, আর প্রতিবেশীর অনমনীয়তার দায় একা বাংলাদেশের নয়। কিন্তু এসব বাস্তবতা যেন আত্মতুষ্টির আশ্রয় না হয়। কোথায় চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, কেন হয়েছে এবং কৌশল কীভাবে বদলানো প্রয়োজন, সেই সৎ মূল্যায়ন ছাড়া অগ্রগতিও সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হলে প্রশংসার পাশাপাশি প্রশ্ন সহ্য করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

বাংলাদেশের হাতে থাকতে হবে সুস্পষ্ট দাবি, বিশ্বাসযোগ্য তথ্য ও কার্যকর প্রস্তাব। উৎসবের সাফল্য উদ্‌যাপন করা যায়; তা দিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের হিসাব মেলানো যায় না। নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের কূটনীতির আসল পরীক্ষা কতজন অতিথি এলেন, সেখানে নয়। পরীক্ষা হলো, বাংলাদেশের কথা কতটা শোনা হলো এবং তার মানুষের স্বার্থ কতটা রক্ষিত হলো।

লেখক:  জেনেভাভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, প্রাইভেট ব্যাংকিং ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম কমপ্লায়েন্স বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বৈশ্বিক আর্থিক স্বচ্ছতা ও কৌশলগত বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখেন।
ই-মেইল: shahidul.alam@bluewin.ch