সেই দেশ, এই দেশ (৮ম পর্ব)

শরীফুল আলম, নিউইয়র্ক , মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২০ পিএম
আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:৩৩ এএম
Main News Image

শুদ্ধ বাংলা সংস্করণ
আজ ৩০ অক্টোবর। কাল ৩১ অক্টোবর। হ্যাঁ, আমেরিকার এমন একটি দিনের কথাই আমি বলছি, যা "হ্যালোইন" নামে পরিচিত। এই দিনে এখানকার মানুষ ভয় পেতে ভালোবাসে, আর শুধুমাত্র এই ভয়ের উৎসবকে ঘিরেই এ দেশে প্রতিবছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়।

তাহলে এত অর্থ ব্যয়ের পরও এই "হ্যালোইন"-এর তাৎপর্য কী?

উত্তর হলো, প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী মৃত আত্মারা এই দিনে পৃথিবীতে ফিরে আসে। ফসলের ক্ষতিকর ভূত-প্রেত তাড়ানোর প্রতীকী উদ্দেশ্যে মানুষ অদ্ভুত ধরনের পোশাক পরে এবং প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় বড় বড় কুমড়া, যা ফসলের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত, সাজিয়ে রাখে। ছোট ছোট শিশুরা এদিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে ক্যান্ডি বা চকলেট সংগ্রহ করে।

এই দিনটির সঙ্গে আমাদের, অর্থাৎ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সংস্কৃতির একটি চমৎকার মিল আমি খুঁজে পাই। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা একটি উৎসব পালন করেন, যার নাম "ভূত চতুর্দশী"। কালীপূজার ঠিক আগের রাতে এই উৎসব পালিত হয়। এটিও মূলত মৃত আত্মীয়-স্বজনদের আত্মার শান্তি কামনার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি আচার।

মুসলিম ধর্মীয় সংস্কৃতিতেও কিছুটা কাঠামোগত মিল রয়েছে এমন একটি উপলক্ষের সঙ্গে। ছোটবেলায় দেখেছি, শবে বরাতের রাতে মানুষ কবরস্থানে গিয়ে দোয়া-দরুদ পাঠ করত। মৃত আত্মীয়-স্বজনদের জন্য মাগফিরাত কামনা করা হতো। অনেকের বিশ্বাস, এই রাতে মৃতদের রূহের জন্য দোয়া করা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ফলে ছোটবেলায় দেখেছি, বাড়ি বাড়ি মা-চাচিরা হালুয়া, শিন্নি, চাল, ডাল কিংবা গুড়ের পিঠা বিতরণ করতেন। এসবই মৃতদের স্মরণ এবং তাদের জন্য কল্যাণ কামনার অংশ ছিল।

সে যাই হোক, আজকের আমেরিকা আর ২০০০ সালের আমেরিকা এক নয়। আমি প্রায় সেই সময়ের কাছাকাছিই আমেরিকায় এসেছিলাম। তখন এখানে আজকের মতো এত রেস্তোরাঁ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পিকনিক কিংবা এত বেশি সামাজিক সংগঠন ছিল না।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাপনের ধরণ বদলেছে। ব্যস্ততা বেড়েছে, সামাজিকতার ধরন পরিবর্তিত হয়েছে, গ্লোবালাইজেশনের রূপও নতুন মাত্রা পেয়েছে। এখন বিভিন্ন অনুষ্ঠান-আয়োজনে বাংলায় কথা বলার কলরব শোনা যায়। এখানে এখন ঈদ উদ্‌যাপিত হয়, পূজা-অর্চনা হয়, পিকনিক হয়, পহেলা বৈশাখ পালিত হয়, জাতীয় দিবসগুলোও যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়।

বিশেষ দিনগুলোতে দেশি খাবারের সুবাস, শাড়ি পরা নারীদের উপস্থিতি এবং পাঞ্জাবি পরিহিত মানুষদের দেখলে মনে হয়, যেন প্রবাসের মাটিতে বাংলাদেশেরই একটি ক্ষুদ্র অংশ বেঁচে আছে।

বিদেশে এলেই বোধহয় দেশের প্রতি মমত্ববোধ আরও বেড়ে যায়। এক ধরনের অদৃশ্য বন্ধন অনুভূত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন দেশের সংস্কৃতি, জীবনযাপন এবং পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়। কিন্তু শিকড়ের টান কি এত সহজে ভোলা যায়?

মানুষ পৃথিবীর যে প্রান্তেই যাক না কেন, তার প্রথম ভাষা, প্রথম স্মৃতি এবং প্রথম ভালোবাসার অনুভূতি চিরকাল হৃদয়ের গভীরে বেঁচে থাকে।

বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি। এটি আমার শৈশবের দেশ, আমার কৈশোরের দেশ, আমার স্মৃতির দেশ এবং আমার শিকড়ের দেশ। আর এই দেশ, আমেরিকা, আমাকে আমার স্বপ্ন পূরণের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।