কেন বাড়ছে যুব সমাজের হৃদরোগ ঝুঁকি

এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০২ এএম
আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:০৭ এএম
Main News Image

ছবি: সংগৃহিত

হৃদরোগ (ইংরেজিতে Coronary Heart Disease) বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রধান স্বাস্থ্যসমস্যা। আগে একসময় মানুষ হৃদরোগকে বয়স্ক মানুষের রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তরুণদের মধ্যেও হৃদরোগ দেখা দিয়েছে। রিসার্চ গেইট (Research Gate) ওয়েবসাইটে রিপোর্ট বলা হয়েছে বাংলাদেশে প্রায় ৩৪% মানুষ হৃদরোগে মারা যাচ্ছে এবং এই হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, ধূমপান, মানসিক চাপ এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এর অন্যতম কারণ। বাংলাদেশের যুব সমাজের মধ্যে এটি একটি উদ্বেগজনক সমস্যা। দেশের ভবিষ্যতের কর্ণধার যুবকদের সুস্থ রাখতে হৃদরোগের ঝুঁকি, কারণ, প্রতিরোধ ও সচেতনতা সম্পর্কে জানা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। 

যুব সমাজের মধ্যে হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধির পেছনের বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে।

১) অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: বর্তমানে অনেক তরুণ ফাস্টফুড, অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার, ভাজাপোড়া, কোমল পানীয় এবং অতিরিক্ত লবণ-চিনিযুক্ত খাবার খেতে অভ্যস্ত। এসব খাবার নিয়মিত গ্রহণের মাধ্যমে দেহের স্থুলতা, উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল মাত্রা বেড়ে যায়। 

২) শারীরিক পরিশ্রমের অভাব: গ্রাম এখন শহরে রুপান্তরিত হচ্ছে। প্রযুক্তি বেশ উন্নতি হচ্ছে। ফলে আমাদের কায়িকশ্রমে পরিমাণ অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। তাই আমাদের নিয়মিত খেলাধুলা ও শ্রমের অভাবে অতিরিক্ত চর্বি জমে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে থাকে। একটি কথা বলে রাখি আমেরিকার জনসংখ্যার মধ্যে স্থুলতা সংখ্যা বেশি তাই এদের মধ্যে হৃদরোগ সংখ্যা সবচেয়ে বেশি থাকে। সেন্ট্রাল ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন ওয়েবসাইট এক রিপোর্ট প্রকাশ পেয়েছে যে, ২০২৩ সালে প্রায় নয় লক্ষ মানুষ হৃদরোগ মারা গিয়েছিলো। 

৩) ধূমপান ও মাদকগ্রহণ: সিগারেট, জর্দা, গুল এবং অন্যান্য তামাকজাত ফুসফুস, হৃদযন্ত্র ও ফুসফুস ক্ষতি করে। ধূমপান ফলে রক্তনালি সরু হয়ে যায় এবং হার্ট অ্যাটাক ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। 

৪) মানসিক চাপ: পড়াশোনা, চাকরি, বেকারত্ব, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও পারিবারিক সমস্যার কারণে অনেক তরুণ দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপে ভোগে। এই মানসিক চাপ থেকে হৃদরোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। 

অল্প বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হলে ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার ও কর্মজীবনে বিরূপ প্রভাব পড়ে। অসুস্থতার কারণে পড়াশোনা ও কর্মক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। চিকিৎসার ব্যয় পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। গুরুতর ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাক বা আকস্মিক হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যায় প্রাণহানিও ঘটতে পারে। যুবসমাজ দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। তাই তাদের হৃদ্‌স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে জাতীয় উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। 

যুবসমাজের মধ্যে হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে ব্যক্তিগত সচেতনতা, পারিবারিক সহযোগিতা ও সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত সুষম ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে হবে। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, স্বাস্থ্যকর প্রোটিন রাখতে হবে। ফাস্টফুড, অতিরিক্ত চিনি-লবণ, তেল-চর্বিযুক্ত খাবার, অতিরিক্ত ঝাল-মসলা খাবার কমাতে হবে। 

দ্বিতীয়ত নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করতে হবে। প্রাপ্ত বয়স্কদের কমপক্ষে ১৫০ মিনিট মাঝারি শারীরিক কার্যকলাপ, যেমন: হাঁটা-চলা, সাইকেল চালানো ইত্যাদি করতে হবে। পাশাপাশি এক টানা বসে থাকা এড়িয়ে চলতে হবে। 

তৃতীয়ত, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবে। মাদক গ্রহণ থেকেও দূরে থাকতে হবে। পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত বিশ্রাম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য ধ্যান, বিনোদন ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো যেতে পারে।

চতুর্থত, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন। রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মাত্রা পরীক্ষা করলে ঝুঁকির বিষয়গুলো আগেভাগে শনাক্ত করা সম্ভব। পরিবারে অল্প বয়সে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, গণমাধ্যম ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে তরুণদের মধ্যে হৃদ্‌স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

হৃদরোগ প্রতিরোধে সচেতনতাই সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপগুলোর একটি। তরুণদের বুঝতে হবে যে সুস্থ হৃদ্‌যন্ত্র গড়ে তোলার অভ্যাস অল্প বয়স থেকেই শুরু করা প্রয়োজন। শুধু অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়া নয়, বরং অসুস্থতা প্রতিরোধে নিয়মিত স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে হবে।

বুকে ব্যথা বা চাপ, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ঘাম কিংবা ব্যথা বাহু, পিঠ বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। এসব লক্ষণকে অবহেলা করা উচিত নয়।

যুবসমাজের মধ্যে হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। তবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, তামাক ও মাদক পরিহার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে এ ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সুস্থ যুবসমাজই একটি সুস্থ, শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের ভিত্তি। তাই স্বাস্থ্য রক্ষায় আজ থেকেই সচেতন হওয়া প্রয়োজন। 

লেখক : শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ, সেশন: ২০২০-২১