সেই দেশ, এই দেশ (পর্ব-২)
এই অক্টোবর মাসটা এলেই এখানকার গাছেরা গায়ে মেখে নেয় নানা রঙ। তারা ঝরে পড়ে আগামীর জন্য। রাস্তায় বেরুলেই সেই গানটি মনে পড়ে, “ঝরা পাতা গো, আমি তোমারই দলে।”
প্রতি বছর এই সময়টাই আসলে শুরু হয় ভালো না লাগার অনুভূতি নিয়ে। তাই বলে জীবন তো আর থেমে থাকবে না। এখানকার দৃশ্যমান জীবন অদৃশ্যমান কষ্টে ভরা। দুঃখ-কষ্টগুলো কম-বেশি প্রায় সবারই একই রকম। ভেতরে রক্তক্ষরণ, অথচ বাইরে আধুনিকতার অভিব্যক্তি। এখানে স্ট্রেস বেশি। ফলে বাতাসে সীসার গন্ধ কম হলেও হৃদরোগীর সংখ্যা বেশি। এখানে জীবনের ক্ষত এবং ক্ষতি, জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সমান তালে চলে।
আমেরিকায় সমসংখ্যক বছরের নভেম্বর মাসে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ভিড় এড়াতে চাইলে আপনি অক্টোবর মাসেও আগাম ভোট দিতে পারেন। অমোচনীয় কালির প্রচলন এই দেশে নেই। এখানে ভোট দিতে হলে আপনাকে শুধু আপনার আইডি কার্ড দেখাতে হবে।
এবার আগাম ভোট দিতে গিয়ে একটি মজার বিষয় লক্ষ করলাম। ১৮ বছর বয়স না হলেও, এমনকি ভোটার না হয়েও, অনলাইনে প্রশিক্ষণ নিয়ে ছোট ছোট বাচ্চারা এখানে ভোট গ্রহণের কাজে অংশ নিচ্ছে। অথচ আমাদের দেশে ভোটের দিন সমস্ত অফিস-আদালত বন্ধ করে সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভোটের কাজে নিয়োজিত করা হয়। রাষ্ট্রের কর্মঘণ্টা নষ্ট করে ভোটের আয়োজন করা হয়।
যা বলছিলাম, ছোট ছোট বাচ্চারা (ছেলে-মেয়ে উভয়ই), কিংবা অবসরে যাওয়া ৭০-৮০ বছরের বৃদ্ধরাও কী সুন্দর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এসব কাজ করছে! আমি ঠিক এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্নই দেখেছিলাম, যেখানে সুষ্ঠু, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও ভয়হীন পরিবেশে ভোটাররা তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
দেশে গেলে আমি নিজের মতো করে থাকতেই পছন্দ করি। ইচ্ছেমতো ঘুমাব, নিজের মতো উঠব, ইচ্ছেমতো বের হব, আবার ফিরব। কিন্তু অন্যের রুটিনের সঙ্গে নিজের রুটিন কেন যেন মিলাতে পারি না।
কেউ যদি আমাকে দাওয়াত দিয়ে বলে, “বাসায় আসবেন”, আর কেউ যদি বলে, “আসবেন কিন্তু”, তাহলে এই দুই কথার পার্থক্য আমি ঠিকই বুঝি। কারও বাসায় মেহমান হওয়া সুন্দর, আপ্যায়ন আরও সুন্দর। দুটোই আমার ভালো লাগে।
কিন্তু সমস্যায় পড়ি বাথরুমে গেলে। অবশ্য সব বাথরুমের কথা বলছি না। বাথরুম ব্যবহার করতেও সবার একটি পরিচ্ছন্ন ও শালীন পরিবেশের প্রয়োজন হয়। ওয়াশরুমে টিস্যু থাকতে হবে, হ্যান্ড সোপ থাকতে হবে, পেপার টাওয়েল থাকতে হবে। অনেক পরিবারেই এসবের দেখা মেলে না।
সম্ভবত সে কারণেই ভারতীয় লেখক খুশবন্ত সিংয়ের একটি বইয়ে পড়েছিলাম, “একটি দেশকে চেনার তিনটি উপায় আছে। প্রথমত, প্লেন থেকে নেমে দেখতে হবে সেই দেশের বিমানবন্দর কেমন এবং বাথরুমের পরিবেশ কেমন। দ্বিতীয়ত, শহরে উঠে দেখতে হবে দেশটির ট্রাফিক ব্যবস্থা কেমন এবং মানুষ কতটা তা মেনে চলে। তৃতীয়ত, দেখতে হবে সেই দেশের রেড লাইট এলাকার ট্রাফিক সিগন্যালের অবস্থা কেমন; অর্থাৎ, লাল বাতির নির্দেশ অমান্য করে কয়টি যানবাহন চলাচল করে।”
কিছুদিন আগে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে একটি জরুরি প্রয়োজনে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি, মূল সড়ক অবরোধ করে মারমুখী কিছু বাঙালি একদল আরেক দলের ওপর চড়াও হয়েছে। এইজন ওজনের ওপর চেয়ার ছুড়ে মারছে।
সেদিন ছিল জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের দিন। স্থানীয় লোকজন অবাক হয়ে সেই দৃশ্য দেখছিল। কিছুক্ষণ পর সেখানে পুলিশ এলো। সম্ভবত একজন পুলিশ অন্যজনকে প্রশ্ন করছিল, “এই লম্বা, বাঁকা, ত্যাড়া চেহারার মানুষগুলো কোন দেশের?”
যখন শুনল তারা বাংলাদেশের, তখন হয়তো বিরক্ত হয়ে বলেই ফেলল, “Get out of our country and go back to your country and fight each other.”
এই সমস্ত চিড়িয়াদের উৎপাতে সত্যিই আমাদের শান্তির জীবনে অশান্তি নেমে আসে। তারা কি জানে না, এসবের চর্চা করে বিদেশে কোনো লাভ হয় না? উল্টো দেশেরই বদনাম হয়।