সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে কী কী পরিবর্তন এলো

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৯ এএম
আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৫৫ পিএম
Main News Image

জাতীয় সংসদে পাস হওয়া 'ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬'-এর মাধ্যমে ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি নিজের স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি দান (গিফট) করার পরও আমৃত্যু সেটি ভোগদখল করার আইনগত অধিকার ধরে রাখতে পারবেন।

আইনে মূল পরিবর্তন ও প্রেক্ষাপট

ভোগদখলের অধিকার সুরক্ষা: ১৮৮২ সালের প্রচলিত আইন অনুযায়ী সম্পত্তি দান করার সাথে সাথেই সেটির মালিকানা ও ভোগদখল গ্রহীতার কাছে চলে যেত। ফলে অনেক বাবা-মা জীবদ্দশায় সন্তানদের সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর আশ্রয়হীন বা অসহায় হয়ে পড়তেন। নতুন সংশোধিত আইনে দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার (Life Usufruct Rights) নিশ্চিত করা হয়েছে।

স্বতন্ত্র পদ্ধতি: আইনে ১২২এ ও ১২২বি নামে দুটি নতুন ধারা যুক্ত করা হয়েছে। ১২২এ ধারার ৪ নম্বর উপধারা অনুযায়ী, এই নিয়মটি সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি পৃথক ও স্বতন্ত্র পদ্ধতি হিসেবে গণ্য হবে।

দান করার শর্ত ও নিয়মাবলী

নির্দিষ্ট স্বজন: সংশোধনীর ১২২এ (২) ধারা অনুযায়ী এই দান কেবল পিতা-মাতা, দাদা-দাদী, নানা-নানী এবং তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনি (বা বিপরীতক্রমে) এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই করা যাবে।

দলিল রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক: ১৯০৮ সালের রেজিস্ট্রেশন আইনের ১৭(১)(ক) ধারা অনুসরণ করে রেজিস্ট্রি করা দলিলের মাধ্যমে এই দান ঘোষণা করতে হবে।

গ্রহীতার মৃত্যু হলে: দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তি গ্রহীতা মারা গেলেও দাতার আজীবন ভোগদখলের অধিকার বহাল থাকবে। দাতার মৃত্যুর পর সম্পত্তিটি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে হস্তান্তরিত হবে।

দান করা সম্পত্তি বাতিল বা পরিবর্তনের বিধান

আইনের ১২২বি ধারা অনুযায়ী, দান রেজিস্ট্রি হওয়ার পর তা সাধারণত বাতিল করা যায় না। তবে দুটি বিশেষ ক্ষেত্রে রদবদল বা বাতিল করা সম্ভব:

পারস্পরিক সম্মতিতে: আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষাগত বা জরুরি পারিবারিক প্রয়োজনে দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে তা পরিবর্তন করা যাবে।

জেলা জজের অনুমতি: কোনো এক পক্ষ অপ্রাপ্তবয়স্ক, নিখোঁজ, মানসিক ভারসাম্যহীন বা আইনগতভাবে অযোগ্য হলে জেলা জজের কাছে আবেদনের মাধ্যমে দানপত্র পরিবর্তন বা বাতিলের অনুমতি নেওয়া যাবে।

ধর্মীয় আইন ও বিরোধীদের আপত্তি

সংসদে বিলটি উত্থাপনের পর বিরোধী দলের সদস্যরা এটিকে অছিয়ত বা উইলের নীতি এবং ধর্মীয় বিধানের পরিপন্থী বলে প্রতিবাদ জানান। তবে আইনজীবীদের মতে, নতুন এই আইনটি কোনো ধর্মের 'পার্সোনাল ল', ইসলামী হেবা বা প্রচলিত সাধারণ দানের বিকল্প হিসেবে আসেনি এবং সেগুলোর বৈধতা বা কার্যকারিতাকে ক্ষুণ্ন করে না।

এটি একটি সার্বজনীন ও নাগরিক আইন, যা সব ধর্মের মানুষের জন্য সমানভাবে কার্যকর একটি নতুন বিকল্প সুযোগ তৈরি করেছে।

কন্যা সন্তান থাকা পরিবারের প্রভাব

বিদ্যমান উত্তরাধিকার আইনের কারণে যেসব দম্পতির কেবল কন্যা সন্তান রয়েছে, তাদের মৃত্যুর পর সম্পত্তিতে দূরসম্পর্কের স্বজনদের অংশ তৈরি হয়। এই সংশোধনীর ফলে বাবা-মা তাদের জীবদ্দশাতেই কন্যাদের নামে সম্পত্তি দান করে নিশ্চিত হতে পারবেন, আবার আমৃত্যু সেই সম্পত্তিতে নিজেদের ভোগদখলের অধিকার থাকায় শেষ বয়সে আশ্রয়হীন হওয়ার ঝুঁকিও থাকবে না।