তারেক রহমানের বিএনপি: অতীতের উত্তরাধিকার, ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে যে দলের যাত্রা শুরু হয়েছিল, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সেই বিএনপি পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে। দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতির পর এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি প্রবেশ করছে নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায়। ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর ৪৮ বছরে বাংলাদেশের রাজনীতি যেমন বদলেছে, তেমনি বদলেছে বিএনপির অবস্থান, নেতৃত্ব ও কৌশল। তবে এই পরিবর্তনের মধ্যেও দলটির রাজনীতিতে কিছু মৌলিক ধারাবাহিকতা রয়েছে—জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব।
বিএনপির জন্ম হয়েছিল স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের একটি জটিল রাজনৈতিক সময়ে। ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, রাষ্ট্রীয় অস্থিরতা ও পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের মধ্যে জিয়াউর রহমান নতুন একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন। ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও পেশার মানুষকে একটি দলের অধীনে আনার চেষ্টা করেন।
জিয়ার রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় ধারণা ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। একই সঙ্গে তিনি বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা, উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন এবং আত্মনির্ভর অর্থনীতির ওপর গুরুত্ব দেন। ফলে বিএনপির প্রতিষ্ঠা শুধু একটি নতুন দলের আত্মপ্রকাশ ছিল না; বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে একটি নতুন রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণের প্রচেষ্টাও ছিল। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরও সেই রাজনৈতিক কাঠামো টিকে থাকা বিএনপির দীর্ঘস্থায়ী সাংগঠনিক সক্ষমতার একটি দিক তুলে ধরে।
জিয়ার পর বিএনপির সামনে বড় প্রশ্ন ছিল নেতৃত্বের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দলটির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অস্তিত্ব ধরে রাখা। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ের মধ্য দিয়ে দলটি নতুন করে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়াতেও বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৯১ সালের সরকার বিএনপির জন্য ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার একটি বড় অভিজ্ঞতা। ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ২০০১ সালে আবার ক্ষমতায় ফিরে দলটি নির্বাচনী রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করে। দ্বিতীয় দফার সরকার পরিচালনা বিএনপিকে নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করে। এরপর ২০০৭-০৮ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং বিরোধী রাজনীতির মধ্য দিয়ে দলটিকে সাংগঠনিকভাবে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হয়। এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই তারেক রহমানের নেতৃত্ব ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বের সামনে তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের উত্তরাধিকার বহন করার প্রশ্ন নেই; রয়েছে সেই উত্তরাধিকারকে পরিবর্তিত বাংলাদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলার প্রশ্নও। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি সাংগঠনিক রাজনীতির পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনা ও নীতিগত প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান নতুনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। এর একটি উদাহরণ ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাব, যেখানে নির্বাচনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের বিভিন্ন প্রস্তাব রয়েছে।
এখানেই বিএনপির সামনে বড় একটি পরীক্ষা। জিয়ার সময়ের বাংলাদেশ আর বর্তমান বাংলাদেশ এক নয়। অর্থনীতির পরিসর বেড়েছে, বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে দেশের সংযোগ গভীর হয়েছে এবং মানুষের প্রত্যাশাও বদলেছে। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, রপ্তানি, বৈদেশিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ; এসব এখন রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। জিয়ার উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক চিন্তাকে বর্তমান বাস্তবতায় কীভাবে কার্যকর নীতিতে রূপ দেওয়া যায়, সেটি তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
বিশেষ করে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার চাপ কমানোর বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। এর জন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও বদলে গেছে বাস্তবতা। জিয়ার সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের একটি ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা ছিল। বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা, ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব, বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও নতুন অর্থনৈতিক জোট বাংলাদেশের জন্য নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। ফলে বিএনপিকে পুরোনো পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে।
আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে রাজনৈতিক প্রজন্মে। জিয়া যখন বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন, তখনকার তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা আর আজকের তরুণদের অভিজ্ঞতা এক নয়। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক প্রত্যাশাকে আরও স্পষ্ট করেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহি, ন্যায়বিচার, রাজনৈতিক সংস্কার এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির প্রশ্ন এখন আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই প্রজন্মকে শুধু পুরোনো রাজনৈতিক ভাষা দিয়ে আকৃষ্ট করা কঠিন। বিএনপিকে তাই জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্রের মতো ঐতিহ্যগত রাজনৈতিক ধারণাকে নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কারের যে কথা দলটি বলছে, তার প্রতিফলন নিজেদের দলীয় কাঠামোতেও কতটা ঘটছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
কারণ রাষ্ট্র সংস্কারের পাশাপাশি দলীয় সংস্কারের প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। একটি দল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির মধ্যে আনার কথা বললে তার নিজের সাংগঠনিক কাঠামোতেও জবাবদিহি, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, নেতৃত্বের বিকাশ এবং মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার প্রশ্ন আসে। বিএনপির দীর্ঘ ইতিহাসে নেতৃত্বের কেন্দ্রীভবন যেমন দেখা গেছে, তেমনি তৃণমূলে শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তিও দলটির বড় সম্পদ। ভবিষ্যতের বিএনপির জন্য এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাস তাই কেবল একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতায় যাওয়া-আসার ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনেরও একটি অংশ। জিয়ার হাতে যে দলের যাত্রা শুরু, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে যে দল নির্বাচনী রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে সেই দল এখন নতুন বাংলাদেশের বাস্তবতার মুখোমুখি।
এই পর্যায়ে বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত উত্তরাধিকারের নয়, উত্তরাধিকারকে কীভাবে নতুন করে অর্থবহ করা যায় সেটি। জিয়ার রাজনৈতিক ধারণা, খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা এবং তারেক রহমানের নতুন রাজনৈতিক চিন্তার সমন্বয়ে বিএনপি কি ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকর রাজনৈতিক প্রকল্প দাঁড় করাতে পারবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
কারণ বিরোধী দলে থেকে সরকারের সমালোচনা করা আর রাষ্ট্র পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। রাষ্ট্রক্ষমতায় বিএনপিকে প্রমাণ করতে হবে, তারা শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন চায়নি; রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি, প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আনতে চেয়েছে। ৪৮ বছরের উত্তরাধিকার তখনই নতুন অর্থ পাবে, যখন তা ভবিষ্যতের বাংলাদেশের প্রয়োজনের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত হতে পারবে।
হানিফ রাশেদীন: কবি ও সাংবাদিক