সৃষ্টিশীলতার কি বয়সসীমা আছে?
বাংলা একাডেমির সম্মানিত মহাপরিচালকের প্রতি খোলা চিঠি
সম্প্রতি বাংলা একাডেমির সম্মানিত মহাপরিচালকের স্বাক্ষরিত একটি বিজ্ঞপ্তি আমার নজরে এসেছে। বিজ্ঞপ্তিতে বাংলা একাডেমির লেখক ডিরেক্টরিতে নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য বয়সের প্রমাণপত্র, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ এবং কমপক্ষে তিনটি প্রকাশিত বইয়ের তথ্য জমা দেওয়ার শর্ত আরোপ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি ও সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত একজন মানুষ হিসেবে বিষয়টি আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে। সেই দায়বোধ থেকেই এ খোলা চিঠি।
বাংলা একাডেমি কেবল একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নয়; এটি আমাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান প্রতীক। তাই এ প্রতিষ্ঠানের যেকোনো নীতি বা সিদ্ধান্ত দেশের লেখক, কবি, গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মীদের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। লেখক ডিরেক্টরিতে অন্তর্ভুক্তির মতো একটি বিষয়ে এমন কিছু শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে, যেগুলোর যৌক্তিকতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
প্রথম প্রশ্নটি বয়সের প্রমাণপত্র নিয়ে। একজন লেখকের জন্মতারিখ তাঁর সাহিত্যিক যোগ্যতা নির্ধারণে কীভাবে ভূমিকা রাখে? সৃষ্টিশীলতার কি কোনো নির্ধারিত বয়সসীমা আছে? একজন মানুষ তরুণ বয়সে লিখতে শুরু করতে পারেন, আবার কেউ কর্মজীবন শেষ করে অবসরে যাওয়ার পর সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করতে পারেন। জীবনের কোনো নির্দিষ্ট পর্যায়ে এসে লেখক হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায় না।
অনেক সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা অন্য পেশার মানুষ কর্মব্যস্ততার কারণে চাকরিজীবনে বই প্রকাশের সুযোগ পান না। অবসরের পর তাঁরা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ও সঞ্চিত জ্ঞান নিয়ে লেখালেখি শুরু করেন। তাঁদের মধ্যে কেউ হয়তো একটি বা দুটি গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশ করেছেন। শুধু বয়স কিংবা বইয়ের সংখ্যার কারণে তাঁদের বাংলা একাডেমির ডিরেক্টরিতে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা কি ন্যায়সংগত হবে?
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত জন্মসাল বা বয়সসীমার কারণে ১৯৯০ সালের আগে জন্মগ্রহণকারী কোনো লেখক যদি আবেদনের সুযোগ না পান, তবে সেই সীমারেখার সাহিত্যিক ভিত্তি কী
তা পরিষ্কার করা প্রয়োজন। বয়সের গাণিতিক হিসাব দিয়ে একজন লেখকের সৃজনশীলতা, মননশীলতা কিংবা সাহিত্যজীবনের বৈধতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কবি ও লেখকের প্রকৃত পরিচয় তাঁর বয়সে নয়, তাঁর সৃষ্টিতে।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ নিয়ে। বাংলা একাডেমির লেখক ডিরেক্টরি যদি কোনো চাকরির নিয়োগপ্রক্রিয়া না হয়, তবে শিক্ষাগত সনদ বাধ্যতামূলক করার প্রয়োজন কেন? প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সাহিত্যিক প্রতিভা ও সৃষ্টিশীলতার একমাত্র মানদণ্ড কখনোই শিক্ষাগত সনদ হতে পারে না।
আমাদের সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে এমন বহু মনীষী রয়েছেন, যাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পরিধি সীমিত ছিল; কিন্তু তাঁদের সৃষ্টি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে অসামান্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোনো উচ্চতর সনদ অর্জন করেননি। অথচ তাঁর সাহিত্যকর্ম ছাড়া আধুনিক বাংলা সাহিত্য কল্পনাই করা যায় না।
একইভাবে লালন শাহ, শাহ আবদুল করিম কিংবা আরজ আলী মাতুব্বরের সৃষ্টিশীলতা ও মননশীলতাকে কি প্রাতিষ্ঠানিক সনদের মাপকাঠিতে বিচার করা সম্ভব? তাঁরা আজ বেঁচে থাকলে এবং বাংলা একাডেমির কোনো ডিরেক্টরি বা সদস্যপদের জন্য আবেদন করলে শিক্ষাগত সনদের অভাবে তাঁদের আবেদন কি বাতিল করা হতো? এমন সম্ভাবনার কথা ভাবাও আমাদের সাহিত্যবোধকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
তৃতীয় প্রশ্ন, কমপক্ষে তিনটি প্রকাশিত বই থাকার শর্ত কেন? একজন লেখকের বইয়ের সংখ্যা তাঁর সাহিত্যিক মানের নিশ্চয়তা দেয় না। একজন লেখক একটি মাত্র বই লিখেও সাহিত্যে স্থায়ী আসন লাভ করতে পারেন। আবার অনেক বই প্রকাশ করেও কেউ পাঠক ও কালের পরীক্ষায় টিকে না থাকতে পারেন। সাহিত্যকে সংখ্যার হিসাবে মূল্যায়ন করা যায় না।
তিনটি বই প্রকাশ করলেই কেউ প্রতিভাবান কিংবা গুরুত্বপূর্ণ লেখক হয়ে ওঠেন না। একইভাবে একটি বা দুটি বই প্রকাশিত হয়েছে বলে কারও সাহিত্যিক পরিচয় অস্বীকার করা যায় না। একটি বইও যদি মৌলিক, মননশীল ও মানসম্পন্ন হয়, তবে তার লেখককে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত।
এখানে আরও একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন বাংলা একাডেমি “নতুন লেখক” বলতে ঠিক কাদের বোঝাতে চাইছে? নতুন লেখকের সংজ্ঞা কী? বয়সের বিচারে নতুন, প্রকাশনার সময়ের বিচারে নতুন, নাকি বইয়ের সংখ্যার বিচারে নতুন? একজন ষাটোর্ধ্ব মানুষ যদি প্রথম বই প্রকাশ করেন, তিনি কি নতুন লেখক? আবার একজন তরুণ যদি দশটি বই প্রকাশ করেন, তাঁকে কোন শ্রেণিতে রাখা হবে? এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর ছাড়া বয়স ও বইয়ের সংখ্যাভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস বিভ্রান্তি এবং বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে।
আমি নিজে বাংলাদেশে সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। আমার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা সাতটি, যার মধ্যে দুটি ইংরেজিতে। তা সত্ত্বেও বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ জমা দিয়ে লেখক হিসেবে নিজের পরিচয় প্রমাণ করার প্রক্রিয়ায় অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বাংলা একাডেমির সদস্য কিংবা আজীবন সদস্য হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও আপাতত ত্যাগ করছি। এটি কোনো ব্যক্তিগত অভিমান নয়; বরং একটি নীতিগত অবস্থান।
কারও ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য, প্রয়োজনীয়তা এবং তথ্যের নিরাপত্তা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা উচিত। বয়স ও শিক্ষাগত সনদের তথ্য যদি কেবল প্রশাসনিক নথি সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন হয়, তবে সেটি বিজ্ঞপ্তিতে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। কিন্তু এসব তথ্য যদি লেখক হিসেবে যোগ্যতা নির্ধারণের মাপকাঠি হয়, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।
বাংলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়মের বেড়াজাল সৃষ্টি করে লেখকদের দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং প্রকৃত কবি, লেখক, গবেষক ও চিন্তাশীল মানুষদের খুঁজে বের করে তাঁদের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিসর তৈরি করা। প্রয়োজন হলে প্রকাশিত রচনার মান, মৌলিকতা, সাহিত্যিক অবদান, সম্পাদনা ও প্রকাশনার গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করা যেতে পারে। এ জন্য নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন কিংবা লেখার নমুনা মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কিন্তু বয়স, শিক্ষাগত সনদ এবং বইয়ের সংখ্যাকে প্রধান শর্ত বানানো সাহিত্যিক যোগ্যতা নির্ধারণের যথার্থ পদ্ধতি হতে পারে না।
আমি সম্মানিত মহাপরিচালকের কাছে বিনীতভাবে জানতে চাই এই শর্তগুলোর সাহিত্যিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি কী? কোন বিবেচনায় বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে? কেন তিনটি বইকেই লেখক-স্বীকৃতির ন্যূনতম মানদণ্ড ধরা হলো? প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সনদ ছাড়া একজন প্রতিভাবান ও সৃজনশীল মানুষের জন্য কী সুযোগ রাখা হয়েছে?
বাংলা একাডেমি আমাদের সবার প্রতিষ্ঠান। এর দরজা যেন বয়স, সনদ কিংবা প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যার অযৌক্তিক শর্তে সংকুচিত না হয়। লেখক নির্বাচনে স্বচ্ছতা ও মানদণ্ড অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই মানদণ্ড হতে হবে সাহিত্যসম্মত, ন্যায়সংগত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক।
সবশেষে একটি কথাই স্মরণ করিয়ে দিতে চাই সৃষ্টিশীলতার কোনো মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ নেই। একজন লেখকের প্রকৃত সনদ তাঁর সৃষ্টি, তাঁর মনন এবং পাঠকের হৃদয়ে তাঁর লেখার প্রভাব। বইয়ের সংখ্যা দিয়ে লেখকের প্রতিভা মাপা যেমন হাস্যকর, বয়সের সনদ দিয়ে সৃষ্টিশীলতার সীমা নির্ধারণ করাও তেমনি অযৌক্তিক।
বাংলা একাডেমি বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবে এবং দেশের সব প্রজন্মের লেখকের জন্য একটি ন্যায়সংগত, স্বচ্ছ ও মর্যাদাপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন করবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: কলামিস্ট, সংবাদ বিশ্লেষক ও কবি। বোর্ড মেম্বার, পিভিসি কন্টেইনার কর্পোরেশন ইউএসএ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র