ভিএআর ন্যায়বিচারকে হার মানায়: আইএফএবি’র স্বীকারোক্তি ও সতর্কবার্তা

সহিদুল আলম স্বপন, জেনেভা, সুইজারল্যান্ড
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ১১:৩২ এএম
আপডেট: ০১ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৫ পিএম
Main News Image

আইএফএবি রেফারিদের জন্য তাদের নির্দেশনা পুনর্ব্যাখ্যা করে নিশ্চিত করেছে যে, ২০২৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের স্ট্রাইকার ব্রিল এমবোলোকে লাল কার্ড দেখানোর সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল না।

ফুটবলকে আরও নির্ভুল, স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েই ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR)-এর যাত্রা শুরু। প্রযুক্তির সহায়তায় মানবিক ভুল কমানোর যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, সেটি কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর কাছে আশার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু প্রযুক্তি তখনই কার্যকর, যখন সেটি সঠিকভাবে পরিচালিত হয়। প্রযুক্তির ব্যবহারেই যদি ভুল হয়, তবে সেই ভুলের প্রভাব কেবল একটি সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না তা পুরো ম্যাচের ন্যায্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও সুইজারল্যান্ডের কোয়ার্টার ফাইনাল সেই বাস্তবতারই একটি আলোচিত উদাহরণ। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার নয় দিন পর ফুটবলের আইন প্রণয়নকারী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড (IFAB) স্বীকার করেছে যে ম্যাচটিতে ‘মিসটেকেন আইডেন্টিটি’ বা ভুল খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়ার বিধান ভুলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সিমুলেশন বা ডাইভিংয়ের ঘটনায় এই বিধান আদৌ প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ আইন ছিল একদিকে, আর মাঠে তার প্রয়োগ হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে।

এটি নিছক একটি রেফারিং ত্রুটি নয়। এটি ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে প্রযুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থার একটি গুরুতর ব্যর্থতা। এমন ভুলের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দল হারিয়ে ফেলে ন্যায্য প্রতিযোগিতার সুযোগ, আর বিজয়ী দলও অযাচিত বিতর্কের মুখে পড়ে। আর্জেন্টিনার জয় ইতিহাসের পাতায় থেকে যাবে, কিন্তু সেই জয়ের পাশে আইএফএবি’র এই স্বীকারোক্তিও সমানভাবে আলোচিত হবে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ভুল স্বীকার করা হয়েছে তখন, যখন বিশ্বকাপ শেষ, ট্রফি তুলে দেওয়া হয়েছে এবং ম্যাচের ফল পরিবর্তনের আর কোনো সুযোগ নেই। প্রশ্ন উঠতেই পারে যদি ভুল সংশোধনের সুযোগ না-ই থাকে, তবে প্রযুক্তির উদ্দেশ্য কতটা সফল?

VAR-এর মূল দর্শন ছিল মানবিক ভুল কমানো। কিন্তু প্রযুক্তিও শেষ পর্যন্ত মানুষের হাতেই পরিচালিত হয়। তাই দক্ষতা, সঠিক আইনগত ব্যাখ্যা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং তাৎক্ষণিক জবাবদিহি ছাড়া প্রযুক্তি কখনোই ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দিতে পারে না।

আইএফএবি’র এই স্বীকারোক্তি তাই শুধুমাত্র অতীতের একটি ভুলের ব্যাখ্যা নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। ফুটবলের আইন প্রয়োগে আরও স্বচ্ছতা, VAR কর্মকর্তাদের উন্নত প্রশিক্ষণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অধিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা জনসমক্ষে প্রকাশের সংস্কৃতি গড়ে তোলা উচিত, যাতে সমর্থকদের আস্থা অটুট থাকে।

ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়; এটি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আবেগ। সেই আবেগের ভিত্তি হলো ন্যায্য প্রতিযোগিতা। প্রযুক্তি সেই ন্যায্যতাকে শক্তিশালী করার জন্য এসেছে, প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য নয়।

আইএফএবি’র এই পর্যালোচনা তাই একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক আইন, দক্ষ পরিচালনা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতা। কারণ শেষ পর্যন্ত ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নয়, বরং ন্যায়বিচারের প্রতি অটল বিশ্বাস।