প্রশ্নফাঁস, ছাত্রবিক্ষোভ ও ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’
ভারতের গণতন্ত্র কি এক নতুন সন্ধিক্ষণে?
ভারতের গণতন্ত্র দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে পরিচিত। নিয়মিত নির্বাচন, শক্তিশালী সাংবিধানিক কাঠামো, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেশটির অন্যতম পরিচয়। কিন্তু গণতন্ত্র কেবল ভোটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা, বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা এবং রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ববোধের ওপর। সাম্প্রতিক সময়ে নিট (NEET) পরীক্ষাসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সরব অবস্থান এবং নতুনভাবে আলোচনায় আসা ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-এর আন্দোলন ভারতীয় রাজনীতিকে এমন এক সন্ধিক্ষণে এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে শুধু একটি পরীক্ষা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় বিশ্বাসযোগ্যতা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্মের ওপর। সেই তরুণদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো যোগ্যতার ভিত্তিতে ন্যায়সঙ্গত প্রতিযোগিতার সুযোগ। যখন একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু কয়েক হাজার বা কয়েক লাখ পরীক্ষার্থী নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা। ভারতের মতো দেশে, যেখানে কোটি কোটি শিক্ষার্থী সরকারি চাকরি ও উচ্চশিক্ষার সুযোগের জন্য কঠোর পরিশ্রম করে, সেখানে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক জনঅসন্তোষের জন্ম দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ নামে পরিচিত ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলন একটি প্রতীকী রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করেছে। নামটি অস্বাভাবিক ও ব্যঙ্গাত্মক হলেও এর অন্তর্নিহিত বার্তা স্পষ্ট যাদের সমাজ অবহেলা করে, তারাও একদিন সংগঠিত হয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। আন্দোলনকারীদের অবস্থানও তাৎপর্যপূর্ণ। তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে কোনো গোপন বৈঠক বা মন্ত্রীর বাসভবনে আলোচনায় তারা যাবে না; বরং জনগণের সামনে, যন্তর মন্তরের উন্মুক্ত পরিবেশেই আলোচনা হতে হবে। এই অবস্থান গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতার দাবি হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে।
এখানে লক্ষণীয় যে আন্দোলনটি দ্রুতই শিক্ষার্থীদের গণ্ডি অতিক্রম করে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, উদ্ধব শিবসেনা, তৃণমূল কংগ্রেসসহ বিভিন্ন বিরোধী দল আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমা প্রার্থনা এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেছেন। তাদের বক্তব্য, একটি গণতান্ত্রিক সরকার যদি জনগণের প্রশ্নের জবাব না দেয়, তবে সেই নীরবতা নিজেই রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে সরকারের বক্তব্যও সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ অভিযোগ করেছেন যে কিছু রাজনৈতিক শক্তি শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চাইছে। বাস্তবতা হলো, বিশ্বের প্রায় প্রতিটি গণতন্ত্রেই ছাত্র আন্দোলন রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন বা বিরোধিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ফলে প্রশ্নটি হওয়া উচিত আন্দোলনকে কে সমর্থন করছে, তা নয়; বরং আন্দোলনের মূল দাবি কতটা যৌক্তিক এবং রাষ্ট্র সেই দাবির জবাব কীভাবে দিচ্ছে।
গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য পরিমাপের অন্যতম মানদণ্ড হলো রাষ্ট্র কীভাবে ভিন্নমতকে মোকাবিলা করে। যদি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের জবাব হয় সংলাপ, তাহলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। কিন্তু যদি প্রথম প্রতিক্রিয়া হয় অতিরিক্ত পুলিশি বলপ্রয়োগ, গণগ্রেপ্তার কিংবা ভীতি প্রদর্শন, তাহলে গণতন্ত্রের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তাদের ওপর অপ্রয়োজনীয় কঠোরতা দেখানো হয়েছে। সরকার অবশ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সত্য নির্ধারণের দায়িত্ব স্বাধীন তদন্ত ও বিচারব্যবস্থার।
এই আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সমাজকর্মী ও পরিবেশবাদী সোনম ওয়াংচুকের সম্পৃক্ততা। তিনি শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে অনশন শুরু করেন এবং পরবর্তীতে আটক শিক্ষার্থীদের মুক্তির মতো শর্ত সামনে আনেন। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরাও তার স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে অনশন প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছে। এই পারস্পরিক সংবেদনশীলতা আন্দোলনের একটি মানবিক দিক তুলে ধরে, যা রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিচয় বহন করে।
ঘটনার আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও উপেক্ষণীয় নয়। নিউইয়র্ক, সান হোসে, লন্ডন ও ডাবলিনে প্রবাসী ভারতীয়দের একাংশের বিক্ষোভ দেখিয়ে দিয়েছে যে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও শিক্ষাবিষয়ক সংকট এখন বৈশ্বিক ভারতীয় সমাজেরও আলোচনার বিষয়। বৈশ্বিক যুগে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট আর কেবল অভ্যন্তরীণ থাকে না; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং প্রবাসী সম্প্রদায়ের মাধ্যমে তা দ্রুত আন্তর্জাতিক পরিসরে পৌঁছে যায়। ফলে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা এখন আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সঙ্গেও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
রাহুল গান্ধীর দাবি অনুযায়ী গত এক দশকে শতাধিক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে এবং কোটি কোটি শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে, তবে মূল প্রশ্নটি সংখ্যার নয়; মূল প্রশ্ন হলো পরীক্ষা ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন। যদি বারবার একই ধরনের অভিযোগ ওঠে, তবে তা রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে প্রশাসনিক সংস্কারের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
এখন সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নটি হলো ভারত কি গণতন্ত্র থেকে ফ্যাসিবাদের দিকে এগোচ্ছে?এই প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে নয়, তথ্য ও রাজনৈতিক বাস্তবতা দিয়ে খুঁজতে হবে। ফ্যাসিবাদ একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ, যেখানে রাষ্ট্র সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়, বিরোধী মতকে পদ্ধতিগতভাবে দমন করা হয়, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হয় এবং নির্বাচন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার এবং বিরোধী রাজনীতির পরিসর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশিত হয়েছে। একই সময়ে এটিও সত্য যে দেশে এখনও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, বিরোধী দল সক্রিয় রয়েছে, আদালত বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করছে এবং রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
অতএব, ভারতকে সরাসরি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র ঘোষণা করা যেমন অতিসরলীকরণ হবে, তেমনি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগকে অস্বীকার করাও দায়িত্বশীল বিশ্লেষণ হবে না। বরং বলা যায়, ভারত এমন এক পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে যেখানে তার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থিতিশীলতা ও জবাবদিহিতার সক্ষমতাই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা নয়, বরং জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করা। একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত, প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তি, পরীক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উন্মুক্ত সংলাপ এবং সংসদে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা এসব পদক্ষেপ রাজনৈতিক উত্তেজনা অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারে।
অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে এই ইস্যুকে কেবল সরকারবিরোধী আন্দোলনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করে শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের রূপরেখা উপস্থাপন করা। কারণ সরকার পরিবর্তনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্যবস্থার পরিবর্তন।
ভারতের ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে সংকটের সময়েও দেশটি গণতান্ত্রিক পথেই সমাধান খুঁজতে সক্ষম হয়েছে। জরুরি অবস্থার অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পরিবর্তন সবই সেই ঐতিহ্যের অংশ। বর্তমান সংকটও সেই ঐতিহ্যের আরেকটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় জয়ী হতে হলে প্রয়োজন সংলাপ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতি অটল অঙ্গীকার।
‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ হয়তো ভবিষ্যতে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে, আবার হয়তো কেবল একটি প্রতীকী ছাত্র আন্দোলন হিসেবেই ইতিহাসে থেকে যাবে। কিন্তু তাদের উত্থান একটি বাস্তব বার্তা দিয়েছে যখন তরুণ সমাজ মনে করে তাদের কণ্ঠস্বর উপেক্ষিত হচ্ছে, তখন তারা নতুন ভাষা, নতুন প্রতীক এবং নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে দ্বিধা করে না।
ভারতের সামনে আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই কোনো একটি দলের ভবিষ্যৎ নয়; বরং রাষ্ট্র কি সমালোচনাকে শত্রু হিসেবে দেখবে, নাকি গণতন্ত্রের স্বাভাবিক শক্তি হিসেবে গ্রহণ করবে? কারণ গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য ক্ষমতার স্থায়িত্বে নয়, বরং ভিন্নমতকে সম্মান জানিয়ে জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের সক্ষমতায়। ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা সেই সক্ষমতারই এক কঠিন, কিন্তু ঐতিহাসিক পরীক্ষা।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি