৮৫ বছরের রহস্য উন্মোচন
কোয়ান্টাম বিজ্ঞানে বাংলাদেশের জাহিদ হাসানের ঐতিহাসিক পদচিহ্ন
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউজিন হিগিন্স অধ্যাপক ড. এম. জাহিদ হাসান। টপোলজিক্যাল কোয়ান্টাম ম্যাটার গবেষণায় তিনি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী পরীক্ষামূলক পদার্থবিজ্ঞানী। ছবি: Danielle Capparella, Princeton University
নোবেল মনোনয়নের তথ্য গোপন থাকায় তাঁকে আনুষ্ঠানিক প্রার্থী বলার সুযোগ নেই। তবে ওয়েইল ফার্মিয়ন শনাক্তকরণসহ টপোলজিক্যাল কোয়ান্টাম ম্যাটার গবেষণায় তাঁর বৈপ্লবিক অবদান তাঁকে সমকালীন বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি নোবেল পুরস্কার ঘিরে প্রতিবছরই নানা পূর্বাভাস এবং সম্ভাব্য বিজয়ীর নাম আলোচনায় আসে। কিন্তু নোবেল কমিটি মনোনীত ব্যক্তিদের নাম কখনো আগাম প্রকাশ করে না। মনোনয়ন এবং বাছাইসংক্রান্ত সব তথ্য ৫০ বছর পর্যন্ত গোপন রাখার বিধান রয়েছে। ফলে কোনো বিজ্ঞানীকে নোবেল পুরস্কারের আনুষ্ঠানিক প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করানো তথ্যগতভাবে সঠিক নয়।
তবে বিশ্বের বিজ্ঞানীদের মধ্যে এমন কিছু নাম থাকে, যাঁদের গবেষণা নিজ নিজ ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে এবং ভবিষ্যতে নোবেল স্বীকৃতি পাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশের সন্তান অধ্যাপক ড. এম. জাহিদ হাসান তাঁদের অন্যতম। তাঁর নোবেল মনোনয়ন বা সম্ভাব্য বিজয় সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য না থাকলেও আধুনিক কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান এবং টপোলজিক্যাল ম্যাটার গবেষণায় তাঁর অবদান নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক।
বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের Eugene Higgins Professor of Physics। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, টপোলজিক্যাল কোয়ান্টাম ম্যাটার গবেষণায় তিনি বিশ্বের অন্যতম অগ্রগণ্য পরীক্ষামূলক পদার্থবিজ্ঞানী। তাঁর ২৮০টির বেশি পিয়ার রিভিউড গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে।
টপোলজিক্যাল ইনসুলেটর, কোয়ান্টাম ম্যাগনেট, ওয়েইল সেমিমেটাল, চিরাল ম্যাটেরিয়াল এবং নতুন ধরনের কোয়ান্টাম কণাসদৃশ অবস্থার অনুসন্ধানে তিনি একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকল্পের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর গবেষণা শুধু পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজেনি, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্যও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
বিখ্যাত জার্মান গণিতবিদ ও পদার্থবিজ্ঞানী হারমান ওয়েইল ১৯২৯ সালে তাত্ত্বিকভাবে এ ধরনের ভরহীন কণার ধারণা দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রায় ৮৫ বছর ধরে বাস্তবে এর নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছিল না। ড. জাহিদ হাসানের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণা সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটায়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন। গবেষকেরা মহাশূন্যে কোনো স্বাধীন মৌলিক কণা হিসেবে ওয়েইল ফার্মিয়ন আবিষ্কার করেননি। তাঁরা বিশেষ ধরনের স্ফটিকের ভেতরে ইলেকট্রনের সম্মিলিত আচরণে সৃষ্টি হওয়া কোয়াসিপার্টিকেল বা কণাসদৃশ অবস্থার প্রমাণ পেয়েছিলেন। কঠিন পদার্থের মধ্যে এই অবস্থা ওয়েইলের সমীকরণ অনুযায়ী আচরণ করায় একে ওয়েইল ফার্মিয়ন বলা হয়।
ড. হাসানের দল উন্নত ফটোইমিশন স্পেকট্রোস্কোপি ব্যবহার করে স্ফটিকটির ভেতরে ওয়েইল পয়েন্ট এবং এর পৃষ্ঠে বিশেষ ধরনের ফার্মি আর্ক পর্যবেক্ষণ করে। গবেষণাটি ২০১৫ সালে বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিক সাময়িকী Science এ প্রকাশিত হয়। একই বছর Physics World আবিষ্কারটিকে বছরের শীর্ষ বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
এই সাফল্য আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের একটি দীর্ঘদিনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি টপোলজিক্যাল কোয়ান্টাম পদার্থ গবেষণায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
২০১৫ সালে ওয়েইল ফার্মিয়ন শনাক্তকারী প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের সদস্যদের সঙ্গে অধ্যাপক ড. এম. জাহিদ হাসান। বাঁ দিক থেকে ইলিয়া বেলোপলস্কি, ড্যানিয়েল সানচেজ, গুয়াং বিয়ান, এম. জাহিদ হাসান এবং হাও ঝেং। ছবি: Danielle Alio, Princeton University
এ কারণে ওয়েইল এবং অন্যান্য টপোলজিক্যাল পদার্থ ভবিষ্যতের দ্রুতগতির ইলেকট্রনিকস, কম শক্তি ব্যবহারকারী যন্ত্র, স্পিনট্রনিকস এবং কোয়ান্টাম প্রযুক্তি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এসব সম্ভাবনার বড় অংশ এখনো গবেষণা এবং পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। ওয়েইল ফার্মিয়ন শনাক্ত হওয়ার ফলেই অল্প সময়ের মধ্যে বাণিজ্যিক কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি হয়ে যাবে, এমন দাবি করা অতিরঞ্জিত হবে। বরং আবিষ্কারটি বিজ্ঞানীদের সামনে এমন এক নতুন শ্রেণির কোয়ান্টাম পদার্থ উন্মুক্ত করেছে, যার বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে রূপান্তরমূলক প্রযুক্তি তৈরি হতে পারে।
ড. হাসানের গবেষণা ওয়েইল ফার্মিয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। টপোলজিক্যাল ইনসুলেটর, টপোলজিক্যাল ম্যাগনেট, চিরাল ক্রিস্টাল এবং কক্ষতাপমাত্রায় বিশেষ কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করতে পারে এমন পদার্থ নিয়েও তাঁর দল গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছে।
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর গবেষণা নতুন ধরনের পদার্থ, কোয়ান্টাম অবস্থা এবং ফার্মিয়নিক কোয়াসিপার্টিকেল অনুসন্ধানে একাধিক নতুন গবেষণাক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে।
পুরস্কারের আনুষ্ঠানিক উদ্ধৃতিতে উন্নত স্পিন এবং অ্যাঙ্গেল রিজলভড ফটোইমিশন স্পেকট্রোস্কোপি ব্যবহার করে পদার্থের নতুন দশা এবং নতুন ফার্মিয়নিক কোয়াসিপার্টিকেল আবিষ্কারে তাঁর মৌলিক অবদানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।
তিনি Mustafa Prize সহ আরও একাধিক আন্তর্জাতিক সম্মাননা অর্জন করেছেন। তাঁর গবেষণা Science, Nature এবং অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির ফেলো এবং আমেরিকান একাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেসের নির্বাচিত সদস্য।
তাঁকে নোবেলের আনুষ্ঠানিক প্রার্থী বা নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নোবেলজয়ী হিসেবে উপস্থাপন করাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাঁকে সম্ভাব্য নোবেলজয়ী হিসেবে বিবেচনা করতে পারে, কিন্তু সেটি নোবেল কমিটির স্বীকৃতি বা আনুষ্ঠানিক মনোনয়নের প্রমাণ নয়।
নোবেল প্রসঙ্গ বাদ দিলেও তাঁর বৈজ্ঞানিক কৃতিত্বের গুরুত্ব বিন্দুমাত্র কমে না। প্রায় নয় দশকের একটি তাত্ত্বিক ধারণাকে স্ফটিক পদার্থে পরীক্ষামূলক বাস্তবতায় নিয়ে আসা এবং টপোলজিক্যাল কোয়ান্টাম ম্যাটারের নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করা নিজেই বিশ্বমানের অর্জন।
বাংলাদেশ থেকে উঠে এসে প্রিন্সটনের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানে মৌলিক গবেষণার নেতৃত্ব দিয়ে ড. এম. জাহিদ হাসান দেখিয়েছেন, মেধা, অধ্যবসায়, উপযুক্ত সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার সমন্বয় ঘটলে একজন বাংলাদেশিও বৈশ্বিক বিজ্ঞানের গতিপথ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
তাঁর অর্জন বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থী এবং গবেষকদের জন্যও বড় অনুপ্রেরণা। এটি মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞানচর্চায় সাফল্যের জন্য শুধু প্রতিভা নয়, প্রয়োজন প্রশ্ন করার সাহস, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, আধুনিক গবেষণাগার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।
নোবেল পুরস্কার শেষ পর্যন্ত তাঁর হাতে উঠবে কি না, তার উত্তর ভবিষ্যতের কাছে। কিন্তু একটি সত্য ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত। আধুনিক কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান এবং টপোলজিক্যাল ম্যাটারের ইতিহাসে ড. এম. জাহিদ হাসানের নাম স্থায়ীভাবেই লেখা হয়ে গেছে।