হিমবাহ ধসে নেপাল-তিব্বতে ভয়াবহ বন্যা কারণ বিশ্লেষণ বিজ্ঞানীদের

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১৬ পিএম
আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২৩ পিএম
Main News Image

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া আকস্মিক প্রলয়ঙ্করি বন্যার পেছনে প্রাথমিক তদন্তে একটি বিশাল 'হিমবাহ ধস'-কে (Glacier Collapse) প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিজ্ঞানীরা। এই বিপর্যয়ে অন্তত ৪৮৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং এখনো ৯০০ জনেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। হিমালয় অঞ্চলের বরফ আশঙ্কাজনক দ্রুতগতিতে গলে যাওয়ার জলজ্যান্ত প্রমাণ হিসেবে এই ঘটনাটি নতুন করে বিশ্বজুড়ে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

১. ভূকম্পনের ভুল ধারণা ও হিমবাহ ধসের প্রকৃত কারণ

দুর্যোগের প্রাথমিক পর্যায়ে আঘাত হানা কম্পনের খবর পেয়ে অনেকেই ধারণা করেছিলেন যে ভূমিকম্পের ফলেই ভূমিধস ও পরবর্তী বন্যার সূত্রপাত ঘটেছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) অনুসন্ধান শেষে নিশ্চিত করেছে যে, ঘটনাটি কোনো ভূকম্পনজনিত ভূমিধস ছিল না; বরং একটি হিমবাহ বা হিমবাহের বিশালাকার অংশ মূল বরফক্ষেত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভেঙে পড়ার ফলে এই দুর্যোগ ঘটে। ইউএসজিএস এবং গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশালাকার হিমবাহটি উপত্যকার তলদেশে আছড়ে পড়ার সময় এতটাই প্রচণ্ড অভিঘাত তৈরি করেছিল যে, তা রিখটার স্কেলে ৫.২ মাত্রার শক্তিশালী ভূকম্পন হিসেবে রেকর্ড হয়।

২. বিপর্যয়ের উৎপত্তিস্থল ও লেন্দে খোলায় তোড়

যুক্তরাজ্যের ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ ড. সাইমন কুকের নেতৃত্বাধীন গবেষণা দলের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নেপালের লাংটাং লিরুং (Langtang Lirung) শৃঙ্গের কাছে অবস্থিত একটি হিমবাহের নিচের অংশ প্রথম ধসে পড়ে। দুর্ঘটনাস্থলটি বন্যাকবলিত প্রধান অঞ্চল থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার (৯ মাইল) পশ্চিমে অবস্থিত। হিমবাহটি উত্তর-পশ্চিম দিকে ভেঙে পড়ার পর বরফ, পাথর ও পানির সংমিশ্রণে বিশাল প্রবাহ তৈরি করে এবং তা দ্রুত পশ্চিমের উপত্যকার দিকে ধাবিত হয়।

আন্তর্জাতিক পাহাড় গবেষণা সংস্থা 'আইসিআইএমওডি' (ICIMOD)-এর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, পাহাড়ের অত্যন্ত উচ্চ স্থান থেকে নেমে আসা বিশাল বরফ-পাথরের ধসটি সরাসরি ভোটেকোশী নদীর শাখা 'লেন্দে খোলা'-য় আছড়ে পড়ে। এর ফলে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে নদীটির পানির উচ্চতা ৭ থেকে ৯ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। পলি, কাদা ও দানবাকৃতির পাথর মিশ্রিত প্রলয়ঙ্করি পানির তোড় ভাটির দিকে ধাবিত হয়ে পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ধ্বংস করে দেয়। বিশেষ করে নেপালের রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলায় এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

৩. কৃত্রিম বাঁধ সৃষ্টি ও খাড়া ভূপ্রকৃতির ভূমিকা

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট আর্থ সাইন্টিস্ট অধ্যাপক মাইক সার্ল ব্যাখ্যা করেন, ধসের সূচনা থেকে চূড়ান্ত প্লাবনে রূপ নেওয়ার প্রক্রিয়াটি ঘটতে কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ধ্বংসাবশেষের বিপুল ঢেউ দেখে মনে হচ্ছে, প্রথমে হয়তো ভূমিধস হয়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে গিয়েছিল এবং একটি কৃত্রিম হ্রদ তৈরি হয়। পরবর্তীতে অতিরিক্ত পানির চাপে সেই বাঁধ ভেঙে এক বিশাল বন্যার আকারে পানি ভাটির দিকে নেমে আসে।

এর পাশাপাশি এলাকার ভূপ্রকৃতিও বন্যার ভয়াবহতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। লাংটাং লিরুং পর্বতটির দুই পাশে অত্যন্ত খাড়া ঢাল ও সংকীর্ণ উপত্যকা রয়েছে। এই ভূপ্রকৃতি জমে থাকা পানি ও কাদার স্রোতকে আরও বেশি গতিতে নিচের দিকে প্রবাহিত হতে সাহায্য করেছে।

৪. পর্বতের টেকটোনিক উত্থান ও হিমবাহ ধসের অস্বাভাবিকতা

হিমবাহটি কেন হঠাৎ পুরোটা ভেঙে পড়ল তা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা টেকটোনিক সঞ্চালনের কথা উল্লেখ করেছেন। টেকটোনিক প্লেটের ক্রমাগত চাপের কারণে লাংটাং লিরুং পর্বতমালা ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে—যা অনেকটা গাড়ির নিচে জ্যাকিং করে ওপরে তোলার মতো। পর্বত যত উঁচুতে উঠছে, এর ঢাল ও হিমবাহগুলো তত বেশি খাড়া হয়ে পড়ছে।

স্বাভাবিক নিয়মে পর্বতের খাড়া অংশ থেকে ছোট ছোট বরফখণ্ড খসে পড়ে নদীকে সাময়িক আটকে দেয় এবং তা সহজেই পানির স্রোতে ভেসে যায়। কিন্তু এবারের দুর্যোগে অস্বাভাবিকভাবে পুরো হিমবাহটি 'একসঙ্গে' ধসে পড়েছে, যা বিজ্ঞানীদের মতে অত্যন্ত বিরল ও অস্বাভাবিক একটি ঘটনা।

৫. জলবায়ু পরিবর্তন ও ভবিষ্যতের ঝুঁকি

বিজ্ঞানীদের মতে, এই বিপর্যয়টি মূলত দুটি ভিন্ন প্রক্রিয়ার যৌথ ফল: একদিকে হিমালয়ের দীর্ঘমেয়াদি ভূত্বকীয় গতিবিধির কারণে পর্বতের উচ্চতা বৃদ্ধি, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বরফ গলে যাওয়া।

আইসিআইএমওডি (ICIMOD)-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০০০ সালের তুলনায় বর্তমানে হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো দ্বিগুণ হারে বরফ হারাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা স্মরণ করিয়ে দেন যে ২০২১ সালে ভারতের চামোলি উপত্যকায় এমনই এক হিমবাহ ধসে প্রায় ২০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, যার অভিঘাত ছিল ১৫টি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণের সমতুল্য। জলবায়ু উষ্ণ হওয়ার সাথে সাথে বহু বছর ধরে জমে থাকা 'পারমাফ্রস্ট' (জমাটবদ্ধ মাটি ও পাথর) গলতে শুরু করায় পর্বতগাত্রগুলোর গাঠনিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে, যার ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রলয়ঙ্করি হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাবে।