নেপালে ভয়াল বান: নিখোঁজ বহু পর্যটক

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৫৫ পিএম
আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪১ এএম
Main News Image

রোদ ঝলমলে দিনে কোনো পূর্ব আভাস ছাড়াই এক লহমায় তছনছ হয়ে গেল উত্তর নেপালের বিস্তৃত এলাকা। বুধবার সকালে তিব্বতের দিক থেকে তীব্র গতিতে ধেয়ে আসা বিপুল জল ও কাদামাটির প্রবল স্রোতে ভোতেকোশি নদীর দুই তীর প্লাবিত হয়ে ভেসে গেছে একাধিক গ্রাম, জনবসতি, বাজার, রাস্তা ও সেতু। ভয়াল এই হড়পা বানের তোড়ে খেলনার মতো দুমড়ে-মুচড়ে ধ্বংস হয়ে গেছে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সেতু। রাসুয়া জেলাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় নেমে আসা এই অভূতপূর্ব দুর্যোগে নিশ্চিত হয়েছে অন্তত আটজনের মৃত্যু। ভয়াবহ এই পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও দ্রুত ত্রাণ পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে তড়িঘড়ি মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠক ডেকেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ।

নেপাল ট্যুরিজ়ম বোর্ডের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এই বিপর্যয়ে ১০৫ জন ভারতীয় ও ২৯১ জন বিদেশি পর্যটকসহ মোট ৩৮৪ জন পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। এ ছাড়া স্থানীয় সংবাদের দাবি অনুযায়ী, ৪১ জন পুলিশ কর্মী এবং ১৪ জন শুল্ক দপ্তরের কর্মীসহ খোঁজ মিলছে না হাজারেরও বেশি সাধারণ মানুষের। তিব্বত সীমান্তবর্তী স্যাব্রুবেশি ও তিমুরে বাজারসহ রাসুয়া জেলার স্যাফ্রুবেশি, বেত্রাবতী, মাইলুং, শান্তিবাজার ও ত্রিশুলির মতো প্রায় এক ডজন গ্রাম প্লাবনের তোড়ে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেছে। বানের জলে ভেসে গেছে চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ স্থানীয় বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, যার ফলে সমগ্র জেলা অন্ধকারে ডুবে গিয়ে উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে। এমনকি স্থানীয় হেলিপ্যাডটি বানের জলে তলিয়ে যাওয়ায় সেনার উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার অবতরণ করতে তীব্র সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।

উত্তর নেপালে আকাশ পরিষ্কার ও রোদ ঝলমলে থাকা সত্ত্বেও এমন বিধ্বংসী বন্যার কারণ নিয়ে তীব্র চর্চা শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের মতে উত্তর নেপালে কোনো বৃষ্টিপাত হয়নি, তবে আবহাওয়া ও স্যাটেলাইট সংক্রান্ত প্রাথমিক উপাত্ত থেকে জানা যাচ্ছে, বিগত কয়েক দিনে তিব্বত অঞ্চলে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়েছিল। এর জেরে তিব্বত সীমান্তের কোনো বাঁধ বা জলাধার ভেঙে গিয়ে এই বিপুল জল ও কাদার স্রোত আচমকা ভোতেকোশি নদীতে ঢুকে পড়ে। পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ গলে কোনো হিমবাহ-হ্রদ (Glacial Lake Outburst Flood) ফেটে এই জল নেমে এসেছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিপর্যয়ের ব্যাপ্তি এখানেই থেমে নেই, কারণ ভোতেকোশি নদীর এই অতিরিক্ত জল নিম্ন অববাহিকার ত্রিশূলি নদীর জলস্তরকে বিপজ্জনক মাত্রায় বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে নুওয়াকোট, ধাদিং ও চিতওয়ান জেলার নদী তীরবর্তী জনবসতিগুলোতে চরম প্লাবন ও ধ্বংসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রশাসন থেকে পৃথ্বী হাইওয়ে এবং মুগলিন-নারায়ণঘাট সড়কে যাতায়াত এড়িয়ে চলার সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং নিম্নাঞ্চলের মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেপাল সরকার সেনা, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকে পূর্ণ মাত্রায় মোতায়েন করেছে। রেড ক্রস, স্কাউট ও অতিরিক্ত চিকিৎসা দল উদ্ধারকাজে হাত বাড়িয়েছে এবং চালুর ব্যবস্থা করা হয়েছে জরুরি হেল্পলাইন নম্বরের। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় হতাহত ও মোট আর্থিক ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া এখনো বাকি থাকলেও, সরকারের প্রধান লক্ষ্য এখন আটকে পড়া মানুষদের প্রাণ রক্ষা করা ও দ্রুত নিরাপদ আশ্রয় পৌঁছানো।