উত্তপ্ত যাদবপুর: ঐতিহ্য রক্ষায় সরব প্রাক্তনীরা, তারকাদের তীব্র ক্ষোভ
কলকাতার ঐতিহ্যবাহী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় আজ আবার সংবাদের শীর্ষ শিরোনামে। তবে কোনো শিক্ষাগত সাফল্য, নতুন আবিষ্কার কিংবা গবেষণার জন্য নয়; বরং ক্যাম্পাসের উত্তপ্ত রাজনৈতিক আবহাওয়া এবং ধারাবাহিক সহিংসতার জেরে। সম্প্রতি গত বুধবার রাতে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির (এসএফআই ও অন্যান্য) সঙ্গে নিখিল ভারত বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি)-এর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেই অশান্তির আঁচ স্তিমিত হওয়ার আগেই বৃহস্পতিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে ঘটে যায় এক অনভিপ্রেত ঘটনা। বহিরাগতদের প্রবেশের চেষ্টা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী প্রতীকে (এমব্লেম) আঘাত হানার ঘটনায় দেশ-বিদেশের শিক্ষানুরাগী ও প্রাক্তনীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে স্বভাবতই উদ্বিগ্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনীরা, বিশেষ করে বাংলা বিনোদনজগতের যেসব গুণী শিল্পী এই প্রাঙ্গণে একসময় পড়াশোনা করেছেন। অনুপম রায়, সুমন মুখোপাধ্যায়, উষসী চক্রবর্তী, ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়, শোলাঙ্কি রায়, অনিন্দ্য বসু কিংবা মধুমিতা সরকারের মতো তারকারা ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ক্যাম্পাসে সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জোর দাবি তুলেছেন।
সংঘর্ষের সূত্রপাত ও এমব্লেম ভাঙচুরের বিতর্ক
ঘটনার সূত্রপাত বুধবার রাতের ছাত্র সংঘর্ষ থেকে। এর পরদিন বৃহস্পতিবার দুপুরে এবিভিপি-র পতাকা হাতে একদল বহিরাগত বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নম্বর ফটক বন্ধ দেখে তা টপকে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে। অভিযোগ, ফটক টপকানোর সময় বহিরাগতরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক এমব্লেমের ওপর পা দিয়ে ওঠার চেষ্টা করলে প্রতীকের ভেতরের বৃত্তাকার ধাতব অংশটি ভেঙে পড়ে। বাম ছাত্র সংগঠনগুলির দাবি, সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গিয়েছে কীভাবে গেরুয়া শিবিরের সমর্থকেরা ঐতিহ্যবাহী প্রতীকটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই ঘটনায় বাম সমর্থক শিক্ষার্থীদের তরফে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাসে শান্তি বজায় রাখতে সোমবার বিকেলে সর্বদলীয় বৈঠকের ডাক দিলেও এবিভিপি সেই বৈঠক বয়কট করায় রাজনৈতিক অচলাবস্থা আরও জটিল আকার ধারণ করে।
মেধা, গণতন্ত্র ও প্রশ্ন তোলার অধিকার: অনুপম ও সুমনের প্রতিক্রিয়া
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রাক্তন ছাত্র, বিশিষ্ট গায়ক ও গীতিকার অনুপম রায় প্রকাশ্যে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অনুপম স্পষ্ট জানান, “ছাত্রাবস্থার আবেগ অত্যন্ত খাঁটি। তাই আমি সব সময় ছাত্রদের পক্ষেই থাকি।” যাদবপুরের মতো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররা কেন প্রতিনিয়ত প্রশ্ন তোলে, তার একটি বস্তুনিরপেক্ষ ব্যাখ্যাও দেন তিনি। তাঁর মতে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় মেধার ভিত্তিতে তুলনামূলকভাবে মেধাবী ও সচেতন শিক্ষার্থীরা এখানে পড়ার সুযোগ পান। তাঁরা সরকারকে প্রশ্ন করতে জানেন। কিন্তু কোনো প্রশাসনই প্রশ্ন করা পছন্দ করে না। অথচ একটি বৈধ ও সুস্থ গণতন্ত্রে সরকারের দিকে প্রশ্ন তোলাই স্বাভাবিক নিয়ম। অনুপম স্মরণ করিয়ে দেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় কোনো সরকারের দয়ায় চলে না, বরং সাধারণ মানুষের করের টাকায় চলে। ফলে শিক্ষাঙ্গনের বহুমাত্রিক ঐতিহ্যকে অপমান করা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
একই সুর শোনা গেছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নাট্যকার ও পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে। তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের এই প্রাক্তনী বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করলেও সেখান থেকেই জানান, বিশ্ববিদ্যালয় রক্ষায় ছাত্র ও শিক্ষকদের যে যৌথ প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে, তিনি তার সাথে পূর্ণ সংহতিতে রয়েছেন। এই ধরনের হিংসাত্মক আচরণকে অত্যন্ত নিকৃষ্ট ও নিন্দনীয় বলে অভিহিত করেন তিনি।
নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও ঐতিহ্যের সুরক্ষা: উষসী ও অনিন্দ্যের বক্তব্য
বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী প্রতীক ক্ষুণ্ণ হওয়ার ঘটনায় গভীরভাবে আহত হয়েছেন অভিনেত্রী উষসী চক্রবর্তী। তিনি মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান ও প্রতীক রক্ষা করা দল-মত নির্বিশেষে প্রতিটি শিক্ষার্থীর নৈতিক দায়িত্ব। ক্যাম্পাসে আধিপত্য কার থাকবে, তা মারপিট বা হিংসার মাধ্যমে নির্ধারিত হতে পারে না; বরং পরীক্ষা কিংবা গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমেই তা ঠিক হওয়া উচিত। অনভিপ্রেত এই হিংসাত্মক ঘটনার ফলে সারা বিশ্বে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে উদ্বেগ জানান তিনি।
অন্যদিকে, তুলনামূলক সাহিত্যের প্রাক্তন ছাত্র ও সংগীতশিল্পী অনিন্দ্য বসু ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা নিয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করেন। যাদবপুর চিরকাল মেধা ও রাজনৈতিক সচেতনতার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হলেও সাম্প্রতিক ধ্বংসাত্মক রাজনীতি কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না বলে তিনি মনে করেন। কে বা কারা ঠিক কোন উদ্দেশ্যে ঐতিহ্যবাহী স্মারক ভাঙচুর করল, তা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও পুরো ঘটনাটিকেই অনভিপ্রেত বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
সিসিটিভি বিতর্কের রাজনীতি ও সুশীল সমাজের নীরবতা: ঋতব্রতের কটাক্ষ
অভিনেতা ঋতব্রত মুখোপাধ্যায় ঘটনাটিকে একটি ভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। ২০২৩ সালে যাদবপুর হস্টেলে প্রথম বর্ষের ছাত্রমৃত্যুর পর যারা সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর দাবিতে তুমুল সরব হয়েছিল, তাদেরই একাংশকে আজ সিসিটিভি ফুটেজে ভাঙচুর চালাতে দেখা যাচ্ছে—এই বৈপরীত্য তুলে ধরেন তিনি। ঋতব্রত ব্যাঙ্গাত্মক সুরে প্রশ্ন তোলেন, ক্যামেরা ফুটেজে প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কেন দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? একই সাথে সমাজমাধ্যমে প্রতিনিয়ত নীতিশিক্ষা দেওয়া তথাকথিত 'সুশীল সমাজ'-এর নীরবতাকেও তিনি তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন।
স্বৈরতন্ত্রের অভিযোগ ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা: শোলাঙ্কি ও মধুমিতা
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রাক্তন ছাত্রী, অভিনেত্রী শোলাঙ্কি রায় সমগ্র ঘটনাকে সরাসরি ‘গুন্ডামি’ এবং স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতার বহিপ্রকাশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, শাসকের মূল লক্ষ্যই হলো শিক্ষার্থীদের চিন্তা করার ক্ষমতা নষ্ট করে দেওয়া এবং প্রশ্ন তোলার মুখ বন্ধ করা। ভাঙচুর চালিয়ে ক্যাম্পাসে পুলিশ মোতায়েন করার একটি চক্রান্ত চলছে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ২০১১ সাল থেকেই যাদবপুরের স্বাধীন কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা চলছে, আর যারা এই বিদ্যাপীঠ আক্রমণ করে, এখানে পড়ার যোগ্যতা তাদের নেই।
দর্শনের প্রাক্তন ছাত্রী অভিনেত্রী মধুমিতা সরকার, যিনি নিজে ছাত্রাবস্থায় রাজনীতি এড়িয়ে চলতেন, তিনিও বর্তমান হিংসার পরিবেশ মেনে নিতে পারেননি। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠনপাঠনই মুখ্য হওয়া উচিত, তবে ছাত্রছাত্রীদের ওপর শারীরিক বা মানসিক আক্রমণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক অশান্তি কেবল একটি নির্দিষ্ট ক্যাম্পাসের প্রশাসনিক সংকট নয়, বরং ভারতের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বাক্স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধিকারের ওপর এক বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন। প্রাক্তনী তারকাদের এই ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রমাণ করে যে, যাদবপুরের ঐতিহ্য ও মেধার মর্যাদা রক্ষার দায় কেবল বর্তমান ছাত্র-শিক্ষকদের নয়, বরং সমাজের সর্বস্তরের প্রাক্তনী ও শুভানুধ্যায়ীদের। অতি দ্রুত হিংসা থামিয়ে ক্যাম্পাসে পঠনপাঠনের সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ ফিরে আসুক—আজ এটিই সর্বস্তরের মানুষের একমাত্র দাবি।