বাণিজ্য যুদ্ধ ও কৌশলগত পাল্টা পদক্ষেপে ট্রাম্পকে বিপদে ফেলছে কানাডা?

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০২:৫৯ পিএম
আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৭ এএম
Main News Image

 যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি ও শুল্ক হুমকির জবাবে কৌশলগত পাল্টা চাপ তৈরির শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে কানাডা। দেশটি তাদের উৎপাদিত পণ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করলেও, মার্কিন অর্থনীতির ওপর অটোয়ার বাণিজ্যিক প্রভাব অত্যন্ত গভীর। যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ৪৫টির ক্ষেত্রেই কানাডা শীর্ষ তিন ক্রেতার একটি এবং ২৬টি অঙ্গরাজ্যের পণ্যের প্রধান ক্রেতা। এই শক্তিশালী বাণিজ্যিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি "ডলার-ফর-ডলার" ভিত্তিতে পাল্টা শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করছেন, যার প্রাথমিক তালিকায় রয়েছে মার্কিন ইস্পাত, দুগ্ধপণ্য, গৃহস্থালি ও কৃষি যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক্স এবং পাল্প ও কাগজশিল্প।

জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের কার্ড

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ও বিদ্যুৎ চাহিদার এক বিশাল অংশ পূরণ করে কানাডা। যুক্তরাষ্ট্রে আমদানিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুতের বড় অংশের পাশাপাশি দেশটির মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশই আসে কানাডা থেকে। কানাডার বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা বাণিজ্য বিরোধে এই জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ বা অতিরিক্ত মাশুল আরোপকে বড় কৌশল হিসেবে বিবেচনা করছেন।

অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড যুক্তরাষ্ট্রমুখী বিদ্যুতের ওপর ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত কর আরোপের যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়িত হলে মিশিগান, মিনেসোটা ও নিউইয়র্কের প্রায় ১৫ লাখ বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সরাসরি বিদ্যুৎ সংকটে পড়বে। এছাড়া, ফল ও সবজি উৎপাদনে ব্যবহৃত সারের মূল উপাদান পটাশের বিশ্বজুড়ে শীর্ষ সরবরাহকারী হলো কানাডা। পটাশের পাশাপাশি লিথিয়াম, নিকেল ও গ্রাফাইটের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বিশাল মজুত রয়েছে দেশটিতে, যা মার্কিন গাড়ি নির্মাণ ও হাই-টেক শিল্পের জন্য অপরিহার্য।

ভোক্তা আচরণ ও সুনির্দিষ্ট বয়কট

কানাডা ইতোমধ্যেই তাদের বাজার ক্ষমতার প্রভাব প্রমাণ করেছে। গত বছর মার্কিন শুল্কের জবাবে কানাডার সিংহভাগ প্রদেশের সরকারি মদের দোকান থেকে মার্কিন অ্যালকোহল সরিয়ে নেওয়া হয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত ওয়াইনের রপ্তানি ৭৮ শতাংশ এবং অন্যান্য মদজাতীয় পানীয়ের রপ্তানি ৭০ শতাংশের বেশি কমে যায়। মার্কিন ওয়াইন ইনস্টিটিউট বিষয়টিকে "কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় বাজার বিপর্যয়" হিসেবে আখ্যা দিয়েছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৫ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার।

পাশাপাশি সাধারণ কানাডীয়দের যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ এড়ানোর স্বতঃস্ফূর্ত সিদ্ধান্ত মার্কিন পর্যটন খাতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। গত বছর প্রায় আট লাখ কম কানাডীয় নাগরিক যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ করায় মার্কিন অর্থনীতি প্রায় ২.৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রাজস্ব হারিয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে বেশ কয়েকটি মার্কিন শহর ও অঙ্গরাজ্য বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কানাডীয়দের ফেরানোর আকুল আবেদন জানাচ্ছে।

মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঝুঁকি

ট্রাম্পের শুল্কনীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে পণ্যের দাম বেড়ে অর্থনৈতিক অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে। ইয়েল বাজেট ল্যাবের তথ্যমতে, বর্তমান শুল্কের কারণে মার্কিন পরিবারপ্রতি বছরে প্রায় ১,১০০ ডলার অতিরিক্ত খরচের ধাক্কা সামলাতে হবে। অন্যদিকে, কানাডা থেকে যন্ত্রাংশ আমদানির ওপর নির্ভর করায় মিশিগান, ওহাইও, কেন্টাকি ও আলাবামার মতো অঙ্গরাজ্যগুলোর অটোমোবাইল কারখানা এবং শ্রমিকরা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছেন।

কানাডার প্রায় ৭৬ শতাংশ নাগরিক ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ও আলোচনা থেকে সরে আসার সরকারি সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি মূল ইস্যু হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষ করে কানাডা সীমান্তবর্তী মিশিগান ও মেইনের মতো অঙ্গরাজ্যগুলোতে—যেখানকার অর্থনৈতিক ভিত্তি কানাডীয় বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল—সিনেট নির্বাচনের লড়াই রিপাবলিকানদের জন্য চরম রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।