রাজবাড়ীর ঐতিহাসিক স্থাপত্যর সুলুকসন্ধান
একটা সময় রাজবাড়ী জেলায় অনেক পুরনো আমলের ঐতিহাসিক স্থাপত্য মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ছিল। তবে তার অনেকগুলো কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। পুরনো স্থাপত্য বিশেষ করে বৃটিশ রাজের আমলের জমিদারদের যেসব ভবন ছিল তা ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যায়। এগুলো ঐতিহ্যের অংশ হলেও আজও যেগুলো টিকে আছে তা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভগ্নদশায় রয়েছে। জাতীয়ভাবে ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টার দৈন্যতায় এখনও বেঁচে এই সব সম্পদ টিকিয়ে রাখা নিয়ে স্থানীয়দের মনে রয়েছে শঙ্কা।
রাজবাড়ীকে বলা পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার। জেলাটি পদ্মা নদীর পাড়ে। বৃটিশ আমলে এখানে প্রভাবশালী রাজা ছিলেন সূর্য কুমার। পদ্মা নদী থেকে কিছু দূরে লক্ষ্মীকোলে ছিল তার প্রাসাদ, মন্দিরসহ অন্যান্য স্থাপনা এবং বিশাল দুটি পুকুর।
দুর্ভাগ্যজনক হলো দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেও রাজা সূর্য কুমারের বিশাল প্রাসাদসহ অন্যান্য স্থাপত্য অক্ষত ছিল। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার ক-বছরের মাথায় ঐতিহ্য বিনাশকারী একদল মানুষ মহামূল্যবান এই প্রাসাদ ও অপূব সৌন্দর্যমন্ডিত শ্বেতমর্মর মন্দির ধ্বংস করে ফেলে। পানির দরে এগুলো বিক্রি করে দেয়- সেই সময়ের স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। মূল্যবান প্রাসাদ, মন্দিরসহ অন্যান্য স্থাপত্যের লোহা-ইট বিক্রির জন্য ধ্বংস করা হয়। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মতো একজন মানুষও তখন ছিল না। স্থাপত্যগুলো ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া হলেও বিশাল পুকুর দুটি এখনও রয়ে গেছে। একটি পুকুরের ধারে রয়েছে কয়েক শ বছরের বটগাছটি। কেউ যদি ঘুরতে আসেন এখানে ওই দুটি পুকুর ও শতাব্দি অতিক্রান্ত বটগাছটির অস্থিত্ব খুঁজে পাবেন। এ ছাড়া রাজার বাড়ির আর কিছু সম্মোহন জাগাতে হাতছানি দেবে না। জানা যায়, ১৮৮০ সালের দিকে রাজপ্রাসাদটি তৈরি হয়েছিল।
এই জেলার নবাবপুর ইউনিয়নের রাজধরপুর গ্রামের পাশে কল্যাণ দীঘিটি রয়েছে। বৃহৎ আকারের এই দীঘি অস্থিত্ব হারিয়ে সমতল বিলে পরিণত হয়েছে। অষ্টাদশ শতকে রাজা সীতারাম কল্যাণ- এই দীঘি খনন করেন।
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের নলিয়া গ্রামে পাশাপাশি দুইটি মন্দির রয়েছে। জোড় বাংলা মন্দির নামে ডাকা হয় একে। একটি মন্দিরের চূড়া থাকলেও অন্যটির চূড়া নেই আর। ১৬৫৫ সালে উড়িষ্যার গৌরীয় রীতিতে রাজা সীতারাম রায় এ জোড় বাংলা মন্দির ও বিগ্রহ স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে শ্রী কৃষ্ণ রাম চক্রবর্তী রাজা সীতারাম রায়ের অনুরোধে নলিয়া গ্রামে এসে দেব মন্দির এবং বিগ্রহ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেন বলে জানা যায়।
পাংশার নীলকুঠি ও নওয়াব বাড়ি ব্রিটিশ আমলে নীল চাষের কেন্দ্র হিসেবে এখানে তার কিছু স্থাপনা গড়ে ওঠে। ধারণা করা হয়, এগুলো ১৮০০ থেকে ১৮৫০ সালের মধ্যে নির্মিত হয়। নওয়াব বাড়িটি ১৯ শতকের শেষ ভাগের স্থাপত্য।
ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলে এই নীলকুঠিগুলো পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। ৪০-৫০ বছরেও এগুলোর সংস্কার করা হয়নি। সংস্কার করে এগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার দাবি স্থানীয় সুধীজনের। নীলকুঠি নিয়ে যেসব জল্পনা-কল্পনা আজও বাতাসে ভেসে বেড়ায়, এগুলো দেখে সেই সময়কে আজকের মানুষ স্পর্শ করতে পারে। বালিয়াকান্দির নবাবপুর জমিদার বাড়ি ১৯ শতকের শুরুর দিকে গড়ে ওঠে। একটি অনন্য স্থাপত্য হিসেবে এটি সবার নজর কাড়ে। এর কারুকার্য ও বিশালত্বের জন্য একসময় এর বেশ সুখ্যাতি ও পরিচিতি ছিল। ১৯৫০ সালের জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর থেকেই ভবনটি শ্রীহীন হয়ে পড়ে। এখন এটি ধ্বংসের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। জরুরি ভিত্তিতে সরকারি উদ্যোগে এর সংরক্ষণ দরকার। বিষাদ সিন্ধুর লেখক মীর মশাররফ হোসেন কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়া গ্রামে মামা বাড়িতে জন্ম নেন। সময়টি ছিল ১৮৪৭ সালের ১৩ নভেম্বর। তার বাবা মীর মোয়াজ্জেম হোসেন রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির নবাবপুর ইউনিয়নের পদমদী গ্রামে বাস করতেন। জানা যায়, মীর মশাররফ হোসেনের পূর্বপুরুষ সৈয়দ সাদুল্লাহ বাগদাদ থেকে প্রথমে দিল্লী এবং পরে ফরিদপুর জেলার স্যাকরা গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন।
বিষাদ সিন্ধুর লেখকের স্মৃতি ধরে রাখার স্বার্থে মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতি কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। প্রায় দুই একর জায়গা জুড়ে এই স্মৃতি কেন্দ্র। এখানে আছে সংগ্রহশালা, ১০০ আসনের সেমিনার কক্ষ, দফতর, গ্রন্থাগার, অতিথি কক্ষ, অভ্যর্থনা কক্ষ, ডাইনিং, কিচেন এবং প্রসাধন কক্ষ। বহু দর্শনার্থী বর্তমানে এখানে ভ্রমণ করতে আসেন। সরকারি ছুটির দিন ছাড়া সাপ্তাহের অন্যদিন এটি দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতি কমপ্লেক্স (পদমদী) বিষাদ সিন্ধুর লেখকের স্মৃতিধন্য জায়গা। এটি রাজবাড়ীর অন্যতম সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়। মূলত বসতভিটাটি প্রাচীন হলেও কমপ্লেক্সটি সংস্কার করে আধুনিকায়নের ছাপ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। এটি সরকার রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকলেও এর মূল ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো রক্ষায় আরও যত্ববান হওয়া দরকার।
রাজবাড়ী সদরের আলিপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আলাদিপুর গ্রামে জামাই পাগলের মাজার। জনশ্রুতি রয়েছে- ১৯৬০ সালের দিকে নেংটি পরা এক ব্যক্তি বর্তমান মাজার প্রাঙ্গণের শেওরা গাছের নিচে অবস্থান নেন। এলাকার মানুষের মুখে মুখে তার নামে নানা অলৌকিক ঘটনা কথা শুনতে পাওয়া যায়। কথিত আছে, পাবনা জেলায় এক ধনী ব্যক্তি তার বোবা মেয়েকে গ্রামের এক পাগলের সঙ্গে বিয়ে দেন। বিয়ের রাত শেষ হওয়ার আগেই বোবা মেয়ে কথা বলতে শুরু করে। কিন্তু সেই পাগল জামাইকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অবশেষে আলাদিপুরে তার সন্ধান মিললেও তিনি ফিরে যায়নি আর সংসারে। তিনিই সেই জামাই পাগল। এই ঘটনার পর থেকে তার জামাই পাগল নামটি ধীরে ধীরে চতুরদিক ছড়িয়ে পড়ে।
রাজবাড়ীর প্রবীণ শিক্ষক ও গবেষকদের মতে, একটি জাতি তার ইতিহাস ভুলে গেলে, এতে জাতির দৈন্যতাই প্রকাশ পায়। গবেষকরা মনে করেন রাজা সূর্য কুমারের প্রাসাদের চিহ্নটুকুও আমরা অক্ষত রাখতে পারিনি। এটি আমাদের পরাজয় ও ব্যর্থতার কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে এখনও যা আছে, তাকে রক্ষার ব্যাপারে সরকারের উদ্যোগী হওয়া উচিত, রাজার বাড়ির বিশাল জায়গা-জমি কিভাবে বেদখল হলো, এ নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি করা উচিত সংশ্লিষ্টদের এবং বেদখল জমি ও পুকুর উদ্ধারে এগিয়ে আসতে হবে। নতুন প্রজন্মকে এর ইতিহাস জানার সুযোগ করে দিতে হবে।
রাজবাড়ীর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো কেবল ইটের দেয়াল নয়, এগুলো শিকড়। গত কয়েক দশকে সঠিক পরিকল্পনার অভাবে অনেক স্থাপনা হারিয়ে গেছে। লক্ষ্মীপুরের রাজা সূর্য কুমারের জায়গা-জমি পুকুর যদি এখনই সংরক্ষণ করা না হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রাজবাড়ীর সম্পর্কে অনেক কিছু অজানা থেকে যাবে। ফলে জেলায় যেখানে যতটুকু ইতিহাসের স্মারকচিহৃ টিকে আছে তাকে রক্ষায়, পরিচর্যায় সরকার ও অন্যদের উদযোগ নিতে হবে।
শাখাওয়াত হোসেন সোহান: সাংবাদিক