হাঁপানির আড়ালে কার্ডিয়াক অ্যাজমার বিপজ্জনক লক্ষণ

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩৫ পিএম
আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪২ এএম
Main News Image

সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় হঠাৎ হাঁপিয়ে যাওয়া, ঘন ঘন শুকনো কাশি কিংবা মাঝরাতে ঘুম ভেঙে শ্বাসকষ্টে দম বন্ধ হয়ে আসার অনুভূতি—এমন উপসর্গ দেখলে যেকোনো মানুষই প্রাথমিক অবস্থায় এটিকে সাধারণ হাঁপানি বা ফুসফুসের সমস্যা বলে মনে করবেন। কিন্তু চিকিৎসকেরা সতর্ক করছেন, সব সময় এই ধরনের টান বা শ্বাসকষ্ট কেবল ফুসফুসের ব্যাধি থেকে নাও হতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে হাঁপানির মতো লক্ষণ মনে হলেও এর নেপথ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে হৃদ্‌যন্ত্রের মারাত্মক কোনো জটিলতা, যা চিকিৎসা শাস্ত্রে 'কার্ডিয়াক অ্যাজ়মা' (Cardiac Asthma) নামে পরিচিত।

কী এই কার্ডিয়াক অ্যাজমা?

কার্ডিয়াক অ্যাজমা ফুসফুস বা শ্বাসনালির নিজস্ব কোনো অ্যালার্জিজাতীয় রোগ নয়, বরং এটি হার্টের অক্ষমতার একটি পরোক্ষ লক্ষণ। হৃৎস্পন্দন অনিয়মিত হয়ে পড়লে কিংবা হৃদ্‌যন্ত্রের রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা কমে গেলে ফুসফুসে অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে ফুসফুসের রক্তজালকগুলোতে অতিরিক্ত তরল পদার্থ জমতে শুরু করে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় 'পালমোনারি ইডিমা' বলা হয়। এই অতিরিক্ত তরলের চাপে ফুসফুসের শ্বাসনালি সংকুচিত ও অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এর ফলে বুকে সাঁই সাঁই শব্দ, তীব্র শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ লাগা এবং শুকনো কাশির মতো লক্ষণ দেখা দেয়, যা সচরাচর হাঁপানির লক্ষণের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।

প্রধান লক্ষণসমূহ

অপ্রত্যাশিত শ্বাসকষ্ট: হালকা শারীরিক পরিশ্রম, যেমন অল্প হাঁটাচলা বা সিঁড়ি ভাঙার পরেই প্রচণ্ড হাঁপিয়ে যাওয়া।

শুকনো কাশি ও বুকে শাঁ শাঁ শব্দ: ক্রমাগত শুকনো কাশি হওয়া এবং নিশ্বাস ছাড়ার সময় বুকে সাঁই সাঁই বা বাঁশির মতো শব্দ হওয়া।

রাতে দমবন্ধ ভাব: সমতল হয়ে শুয়ে থাকলে ফুসফুসে তরল জমার পরিমাণ বেড়ে যায়। ফলে মাঝরাতে হঠাৎ তীব্র শ্বাসকষ্টে ঘুম ভেঙে যায় এবং সোজা হয়ে বসে পড়লে কিছুটা স্বস্তি মেলে।

শারীরিক দুর্বলতা: রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে অনবরত বুক চেপে ধরা অনুভূতি এবং সামান্য কাজেই অতিরিক্ত ক্লান্তি আসা।

কাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি?

বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি হলেও বর্তমান অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কারণে কমবয়সিদের মধ্যেও কার্ডিয়াক অ্যাজ়মার প্রবণতা বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, যেসব বিষয়ের কারণে এই ঝুঁকি দ্বিগুণ হয়:

১. অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ (Hypertension), ডায়াবিটিস এবং রক্তে উচ্চ কোলেস্টেরল।

২. অতিরিক্ত শারীরিক ওজন বা স্থূলতা।

৩. দীর্ঘদিনের ধূমপানের অভ্যাস এবং কায়িক পরিশ্রমের অভাব।

৪. পূর্বে হার্ট অ্যাটাকের ইতিহাস বা পরিবারে হৃদ্‌রোগের বংশগত ধারা থাকা।

ভুল নির্ণয়ের বিপজ্জনক পরিণতি

কার্ডিয়াক অ্যাজ়মার মূল বিপদ হলো সাধারণ হাঁপানির সঙ্গে এর বিভ্রান্তি। শ্বাসকষ্টের কারণে রোগীরা প্রায়ই এটিকে ফুসফুসের সমস্যা ভেবে ইনহেলার বা অ্যাজ়মার ওষুধ ব্যবহার শুরু করেন। এতে সাময়িক কিছুটা স্বস্তি মিললেও মূল হৃদ্‌রোগের সঠিক চিকিৎসা বিলম্বিত হতে থাকে। তলে তলে হার্টের পাম্প করার ক্ষমতা আরও কমে যায়, যা পরবর্তীতে হঠাৎ মারাত্মক হার্ট অ্যাটাক বা পূর্ণাঙ্গ 'হার্ট ফেলিয়র'-এর দিকে ঠেলে দেয়।

চিকিৎসকের পরামর্শ

কাশি বা শ্বাসকষ্টের উপসর্গকে কেবল ঋতুপরিবর্তন বা ফুসফুসের অ্যালার্জি মনে করে অবহেলা করা বিপজ্জনক। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবিটিস রয়েছে এমন ব্যক্তিদের এই জাতীয় লক্ষণ দেখা দিলেই দ্রুত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের (Cardiologist) শরণাপন্ন হওয়া উচিত। সঠিক সময়ে ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাম ও রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে হৃদ্‌যন্ত্রের আসল অবস্থা নির্ধারণ করে সঠিক চিকিৎসা শুরু করলে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব।