পটুয়াখালী ইপিজেড: দক্ষিণাঞ্চলে নতুন শিল্প সম্ভাবনা
নির্মাণাধীন পটুয়াখালী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতোমধ্যে ৬০টি শিল্প প্লট প্রস্তুত করেছে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা)। শিগগিরই এসব প্লট আনুষ্ঠানিকভাবে বরাদ্দ দেওয়া শুরু হবে বলে জানা গেছে। এটি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের শিল্প উন্নয়নে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
পটুয়াখালী সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নে ৪১০ দশমিক ৭৮ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হচ্ছে এই আধুনিক শিল্পাঞ্চল। এখানে মোট ৩০৬টি শিল্প প্লট তৈরি করা হবে, যা বিদেশি ও দেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার পাশাপাশি দেশের রপ্তানি আয় বাড়াতে সহায়ক হবে।
বেপজার জনসংযোগ বিভাগের নির্বাহী পরিচালক আবু সাঈদ মো. আনোয়ার পারভেজ বলেন, 'আমরা ইতোমধ্যে বিনিয়োগকারীদের জন্য ৬০টি শিল্প প্লট প্রস্তুত করেছি। খুব শিগগিরই এসব প্লট আনুষ্ঠানিকভাবে বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দ দেওয়া শুরু করব।'
তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্লট বরাদ্দের কাজ একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যাতে বিনিয়োগকারীরা অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব ছাড়াই কারখানা স্থাপন করে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করতে পারেন।
বেপজা কর্তৃপক্ষের মতে, দক্ষিণাঞ্চলে বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে এ অঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যেই পটুয়াখালী ইপিজেড গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে প্রায় ১ হাজার ৪৪২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয় হবে। ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়।
প্রকল্পের প্রাথমিক বাস্তবায়নকাল ২০২৩ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল পটুয়াখালী জেলা প্রশাসন ও বেপজার মধ্যে জমির দখল ও হস্তান্তর সম্পন্ন হয়।
প্রকল্পের লক্ষ্য অনুযায়ী, ইপিজেডটিতে প্রায় ১৫৩ কোটি মার্কিন ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। পূর্ণ উৎপাদনে গেলে এখান থেকে বছরে প্রায় ১৮৩ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হবে। এর মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান হবে। পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে আরও প্রায় ২ লাখ মানুষের।
ইপিজেডের অবকাঠামো উন্নয়নকাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। এরই মধ্যে ভূমি উন্নয়নের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। একই সঙ্গে ৪ দশমিক ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি খালের উন্নয়নকাজও শেষ হয়েছে। বর্তমানে সড়ক, ড্রেন, ফুটপাত, কালভার্ট, অফিস ভবন, আদর্শ কারখানা ভবন, আবাসিক ভবন, সীমানাপ্রাচীর, পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক, ১১ কেভি উচ্চক্ষমতার বিদ্যুৎ লাইন এবং ৩৩/১১ কেভি গ্যাস ইনসুলেটেড সাবস্টেশন নির্মাণের কাজ চলছে।
পরিকল্পিত পুনর্বাসন এলাকায় ১৫৪টি বাড়ির মধ্যে প্রায় ১৩০টির নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সেখানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ, খেলার মাঠ, কবরস্থান ও ফুটপাত নির্মাণের কাজও প্রায় শেষ। প্রকল্পের আওতায় আরও চারটি ছয়তলা আদর্শ কারখানা ভবন, তিনটি ১০ তলা আবাসিক ভবন এবং তিনটি অফিস ভবন নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া একটি সাবস্টেশন, হেলিপ্যাড, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), পয়োনিষ্কাশন বর্জ্য শোধনাগার (এসটিপি) নেটওয়ার্ক এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জলাধার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে ইপিজেডের ভেতরে বিভিন্ন জাতের প্রায় ৭০০টি ফলদ গাছ লাগানো হয়েছে।
এদিকে, প্রস্তুত প্লটের খবর বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি মালয়েশিয়া ও চীনের বিনিয়োগকারী প্রতিনিধিদল পটুয়াখালী ইপিজেড পরিদর্শন করে সেখানে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। চীনের আরও একটি বিনিয়োগকারী প্রতিনিধিদলও সেখানে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে। সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বেপজা যোগাযোগ বজায় রেখেছে।
পটুয়াখালী ইপিজেডটি আধুনিক অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলে নতুন শিল্পকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই ইপিজেড শুধু রপ্তানি বাড়াবে না, বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে আঞ্চলিক অর্থনীতির পরিবর্তনেও বিশাল ভূমিকা রাখবে। স্থানীয় জনগণ এবং ব্যবসায়ী মহল এই প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা নিয়ে বেশ আশাবাদী। তারা মনে করেন, এটি পটুয়াখালী তথা সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের ভাগ্য বদলে দেবে।
সূত্র : বাসস