আমর ইবনে আল-আস (রাঃ) মসজিদ ও একটি ঘুঘু পাখির গল্প
আফ্রিকা ও মিশরের প্রথম মসজিদ
বর্তমান মসজিদের একটি অংশের ছবি। মাঝখানের সৌন্দর্যমণ্ডিত গোলাকার অংশটি পূর্বে অজুখানা হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
আমার বড় ছেলে ডাঃ তৌহিদ উদ্দিন আহমেদ অভি এবং পুত্রবধূ ডাঃ জান্নাতুল নাঈমা মুনিয়া মিশরের কায়রো ইউনিভার্সিটির অধীন কাসর আল-আইন মেডিকেল ফ্যাকাল্টিতে কার্ডিওলজিতে এমডি করছে। সেই সুবাদে আমি আমার স্ত্রী পান্না, কন্যা মারিয়া এবং পুত্র অনিকসহ ঐতিহ্যবাহী পিরামিডের দেশ মিশর দু-একবার ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছি।
গত ডিসেম্বর ২০১৯ সালের সফরে প্রাচীন মিশরের ফুসতাত এলাকায় অবস্থিত আফ্রিকা ও মিশরের প্রথম মসজিদ আমর ইবনে আল-আস (রাঃ) মসজিদ দেখার সৌভাগ্য হয়। ভ্রমণকালে প্রাপ্ত তথ্য এবং গুগল থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে মসজিদটির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
আমর ইবনে আল-আস (রাঃ) মসজিদ
এই মসজিদটি মিশর ও আফ্রিকার প্রথম এবং প্রাচীনতম মসজিদ হিসেবে পরিচিত। ৬৪১-৬৪২ খ্রিস্টাব্দে মিশরের নবগঠিত রাজধানী ফুসতাতের কেন্দ্র হিসেবে এটি নির্মিত হয়। এটি প্রাচীন কায়রোর আদ-দেওরেল এলাকায় অবস্থিত। মসজিদটির পাশে কপটিক চার্চ, কপটিক মিউজিয়াম এবং ইহুদিদের সিনাগগ রয়েছে।
মসজিদটি তাজ আল-জামি (ক্রাউন মসজিদ), মসজিদ আল-আর রায়হা, জামি আল-আতিক এবং অ্যান্টিক মসজিদ নামেও পরিচিত। এটি প্রাচীন কায়রোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী নিদর্শন। বিভিন্ন সময়ে পুনর্নির্মাণের ফলে মূল মসজিদের কাঠামো আর অবশিষ্ট নেই।
আল-আযহার প্রতিষ্ঠার বহু আগে এই মসজিদ ধর্মীয় ও কুরআনিক শিক্ষার একটি প্রধান কেন্দ্র ছিল।
আমর ইবনে আল-আস (রাঃ) ছিলেন একজন বিশিষ্ট সাহাবি। তিনি সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশে ৫৭৩ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে মিশরে প্রায় ৯০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তিনি মধ্যপ্রাচ্য ও মিশরে ব্যবসা করতেন। ৮ম হিজরির পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে হযরত উমর ইবনে আল-খাত্তাব (রাঃ)-এর প্রশাসনে যোগ দেন। তিনি সেনাবাহিনীর জেনারেল ও গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বেই রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মিশর বিজিত হয় এবং তিনি এই মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন।
ঘুঘু পাখির গল্প
জনশ্রুতি আছে যে একটি ঘুঘু পাখির কারণে মসজিদের স্থান এবং মিশরের নতুন রাজধানী নির্ধারিত হয়। খলিফা উমর ইবনে আল-খাত্তাব (রাঃ)-এর নির্দেশে আমর ইবনে আল-আস (রাঃ) মিশর জয় করেন। আলেক্সান্দ্রিয়া আক্রমণের পূর্বে তিনি নীল নদের পূর্ব তীরে শিবির স্থাপন করেন।
এ সময় তাঁর তাবুর ওপর একটি ঘুঘু পাখি বাসা বাঁধে এবং ডিম পাড়ে। আলেক্সান্দ্রিয়া অভিযানে যাওয়ার আগে তিনি তাবুটি সরাননি। বিজয়ের পর তিনি এই ঘটনাকে পবিত্র মনে করে সেই স্থানকেই রাজধানীর কেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করেন।
এই নতুন শহরের নাম রাখা হয় “ফুসতাত” বা “মিসর আল-ফুসতাত”, যার অর্থ “তাবুর শহর”।
সৈন্যদের নামাজের জন্য তাবুর স্থানে ২৯ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১৭ মিটার প্রস্থবিশিষ্ট একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। এটি পামগাছের খুঁটি, পাথর এবং কাঁচা ইট দিয়ে তৈরি ছিল। ছাদ ছিল পাম পাতায় আবৃত এবং নিচু। নির্মাণের সময় এতে কোনো মিনার ছিল না।
সম্প্রসারণ ও সংস্কার
৬৭৩ খ্রিস্টাব্দে গভর্নর মাসলামা ইবনে মুখাল্লাদ আল-আনসারি মসজিদটি পুনর্নির্মাণ করেন এবং এর আকার দ্বিগুণ করেন। চার কোণায় চারটি মিনার সংযোজন করা হয়।
৭১১ খ্রিস্টাব্দে মিহরাব যুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন শাসক মসজিদটি সম্প্রসারণ করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
গভর্নর আবদুল আজিজ ইবনে মারওয়ান (৬৮৯ খ্রি.)
গভর্নর আবদুল্লাহ ইবনে তাহির (৮২৭ খ্রি.)
আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুন (৯ম শতাব্দী)
ফাতিমীয় যুগে মসজিদে পাঁচটি মিনার ছিল চার কোণে চারটি এবং প্রবেশপথে একটি। বর্তমানে সেগুলো আর নেই। বর্তমান মিনারগুলো ১৮০০ সালে মুরাদ বে নির্মাণ করেন।
১১৬৯ সালে ক্রুসেড প্রতিহত করার সময় মিশরের উজির শাওয়ার মসজিদে আগুন লাগান। পরবর্তীতে নুরউদ্দিন জেনগি এ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেন এবং সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি মসজিদটি পুনর্নির্মাণ করেন।
১৪শ শতাব্দীতে বুরহানউদ্দিন ইব্রাহীম আল-মাহালি সংস্কারের অর্থ প্রদান করেন। ১৩০৩ সালের ভূমিকম্পের পর আমির সালার মসজিদটি সংস্কার করেন।
পরবর্তীতে ১৮০০ সালে মামলুক নেতা মুরাদ বে এবং ২০শ শতাব্দীতে দ্বিতীয় আব্বাস হিলমি মসজিদটির সংস্কার করেন। ১৯৮০-এর দশকে মসজিদের প্রবেশপথ পুনর্নির্মাণ করা হয়।
তথ্যসূত্র
ভ্রমণকালে সংগৃহীত সরেজমিন তথ্য
গুগল তথ্যভান্ডার
(ফরিদ উদ্দিন আহমেদে, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অবসরপ্রাপ্ত)