জসীম উদদীনের বদলে যাওয়া গ্রাম

ইমরান মাহফুজ
প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ০২:২৭ পিএম
আপডেট: ০১ আগস্ট ২০২৬, ০৮:২৭ পিএম
Main News Image

গ্রামের কথা মনে পড়ে। নিরন্তর আহবান জানায় স্মৃতির মিনার। ইচ্ছে হয় পরিত্যক্ত শহর ছেড়ে যাই। দ্বিধা কাজ করে। আবেগ বাড়লে ঢাকার অদূরে নরসিংদী, টাঙ্গাইল, কখনো ময়মনসিংহে ছুটে যাই। সেখানে সারাদিন কাটে তরুছায়ায়, জেগে উঠি পাখির ডাকে। পেটের দায়ে আবারো সাময়িক আনন্দ নিয়ে শহরে ফিরি। তবে রাজশাহী, নওগাঁ, যশোর ও ঝিনাইদহের গ্রাম আমার কাছে একটু বেশি সুন্দর। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা আবুল মনসুর আহমদ ও কামরুদ্দিন আহমদের স্মৃতিকথা পড়লে সেই হারানো গ্রাম খুঁজে না পেয়ে খারাপলাগা কাজ করে।

শৈশবে গ্রামে বেড়ে ওঠার পাশাপাশি গ্রামকে চিনেছি যাঁদের লেখা পড়ে, তাঁদের মধ্যে মধুসূদন দত্ত, জীবনানন্দ দাশ, যতীন্দ্রমোহন বাগচী, বন্দে আলী মিয়া, আল মাহমুদ এবং সর্বোপরি জসীম উদদীন অন্যতম। তাঁদের লেখা যত পড়েছি, তত গ্রামজীবনকে আবিষ্কার করেছি। কী অপূর্ব বয়ান—মনে হয় যেন বাংলার আলপথে হাঁটছি। সেই অনুভূতিতে গ্রামের ছায়া, মায়া আর অনন্ত নস্টালজিয়া মিশে থাকে। আসলে পুরো বাংলাদেশই একটি বৃহৎ গ্রাম।

ঈদ কিংবা যে কোনো জাতীয় উৎসব এলেই রাজধানী থেকে নাড়ির টানে গ্রামে যায় কোটি মানুষ। এটি কেবল যাত্রা নয়, শেকড়ে ফেরার এক গভীর মানসিক আকাঙ্ক্ষা। সেই শেকড়ের কবি জসীম উদ্দীন—বাংলার মাটি ও মানুষের অমলিন কণ্ঠস্বর। তাঁর সাহিত্যকর্মে গ্রামবাংলার ধুলোবালি, মানুষের সরল আবেগ ও জীবনসংগ্রামের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা বাংলা সাহিত্যে একক ও অনন্য। তিনি শুধু একজন কবি নন; তিনি বাঙালির লোকজ জীবনবোধের ধারক ও বাহক।

জসীম উদদীনের ‘কবর’ কবিতা মুখস্ত কিংবা ‘নিমন্ত্রণ’-এর শব্দার্থ লেখা—এভাবেই এই কবির সঙ্গে প্রথম পরিচয়। সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত থাকায় কবিতাটি বারবার পড়তে হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই মনে হয়েছে এটি শুধু পাঠ্যবইয়ের কবিতা নয়, বরং গ্রামীণ জীবনবোধের এক গভীর আর্তি। কবির পল্লীপ্রীতি ছিল আজন্ম। কিন্তু ‘গ্রাম্য’ না। মাঠের পর মাঠ, গ্রামের উন্মুক্ত প্রান্তরে, স¤প্রীতির আবহে প্রকৃতির নিবিড় সাহচর্যে বড় হয়েছিলেন তিনি। চিরায়ত গ্রামের স্নিগ্ধ-কোমল ঔদার্যের মতোই সহজ, অসা¤প্রদায়িক ও মানবিক। বাংলা ও বাঙালির স্বপ্নের কবি—বাস্তব ধরা দিয়েছেন। 

সেই জসীম উদদীন নেই পঞ্চাশ বছর। কীর্তিতে ভাস্বর। তার ‘কবর’ রচনার শতবছর। অথচ তাঁর চরিত্রের পাশাপাশি গ্রামগুলোর এখনো বেঁচে আছে—নিজের বাড়ি অম্বিকাপুর, নানার বাড়ি তাম্বুলখানা, আসমানীর রসুলপুর। বাংলা ভাষায় তিনি কালজয়ী করে তুলেছেন এই গ্রামগুলোকে। তাঁর কলমে গ্রাম শুধু ভূগোল নয়, এক সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়।

জনশুমারি অনুযায়ী (২০২২), বাংলাদেশের ৬৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করেন। এই সিংহভাগ মানুষের কবি জসীম উদদীন। তাঁর আবির্ভাবের সময় বাংলা কবিতা আন্তর্জাতিক আধুনিকতার ঢেউয়ে আলোড়িত। ১৯২৭ সালে রাখালী প্রকাশের আগেই বাংলা কবিতা নতুন বাঁকে মোড় নিচ্ছিল। কিন্তু কবি স্বাদেশিকতায় নিবিষ্ট থেকে মাটির গভীরে শিকড় প্রোথিত করে সৃষ্টি করলেন এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর।

তাঁর সময়ে মাথার ওপরে জ্বলছিল রবীন্দ্র-প্রতিভা। সাহিত্যাকাশ দীপ্ত ছিল রবির আলোয়। কিন্তু তিনি ভিন্ন পথে হাঁটলেন। তিরিশের কবিদের মতো আধুনিকতার অন্য এক স্রোত নির্মাণ করলেন, যার উৎস গ্রামবাংলার লোকজ জীবন। কবি লিখেছেন— “গ্রাম্য জীবন লইয়া গ্রাম্য ভাষায় যখন কবিতা রচনা করিতে আরম্ভ করিলাম, কেহই তাহা পছন্দ করিল নাৃ” (ঠাকুর বাড়ির আঙিনায়)

জসীম উদ্দীনের কবিচিন্তা আবর্তিত হয়েছে বাংলা ও বাংলার লোকজীবনকে ঘিরে। মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না তিনি নিজস্ব আঙ্গিকে তুলে ধরেছেন। লোকজীবন, লোকচেতনা, লোকসংস্কৃতি ও লোকাচারের বিচিত্র সম্ভার থেকে তিনি উপাদান সংগ্রহ করে সমৃদ্ধ করেছেন কবিতার শরীর।

ড. দীনেশচন্দ্র সেন জসীম উদদীনের গানের প্রেক্ষাপটে বলেন, জসীম উদ্দীন যেমন খাঁটি কবি তেমনি করে সাধনায় ব্রত হয়ে গানকে করে তুলেছেন মানুষের মুখের ভাষা। এসবের মূল কারণ হলো ষোল আনাই দেশজ সংস্কৃতির প্রতি নিবেদিত প্রাণের মানুষ।

তার বেড়ে উঠা চেনা কোনো পরিবেশে না। যা এই সময়ে ভাবার মতো অবশ্যই নয়। কবি লিখছেন—

“নানার গ্রামের চারদিকে বিজাবন জঙ্গল। সেই জঙ্গলের এখানে-ওখানে দু’চার ঘর মানুষ। শুনিয়াছিলাম, অনেক আগে সেখানে জঙ্গল ছিল না। বড় বড় আটচালা ঘর করে বর্ধিষ্ণু গৃহস্থেরা বাস করত। লোকজনে সমস্ত গ্রাম কলরব করিত। তারপর কলেরা মহামারিতে, ম্যালেরিয়া জ্বরে প্রায় সমস্ত গ্রাম উজাড় হইয়া যায়। সেখানে ফলবান বৃক্ষ ছিল, সে সব জায়গায় বেত, শ্যামলতা, কুমারলতা প্রভৃতি জন্মাইয়া মানুষের অগম্য করিয়া তোলে। তারপর শেয়াল, খাটাস, শুয়োর, বাঘ প্রভৃতি জানোয়ার ধীরে ধীরে আসিয়া বসতি আরম্ভ করে। বনের মাঝে মাঝে, এখানে সেখানে গৃহস্থেরা বাসের চেষ্টা করে। তাহাদিগকে সর্বদা এসব হিংস্র জানোয়ারের সঙ্গে যুদ্ধ করিতে হইত।” (আমার মা)

এমন গ্রাম থেকেই কবির মায়ের বিয়ে হয়। সে আরেক গল্প। কিন্তু মায়ের প্রসঙ্গে কবির আবেগের তুলনা নেই। তিনি লিখেছেন, তাঁর নানা অত্যন্ত স্নেহপ্রবণ ছিলেন। একমাত্র কন্যা রাঙাছুটুর বাড়িতে তিনি সময় পেলেই আসতেন। নানা যখনই বাড়ি আসতেন, হয়তো নারকেলের লাড্ডু, খইয়ের মোয়া কিংবা কদমা-বাতাসা নিয়ে আসতেন। তারপর দু’একদিন থেকে চলে যেতেন। যাইবার সময় মা কাঁদিয়া ফেলিতেন।

কবি বলেন— “আমার বাজান যদি মাষ্টার না হইয়া কৃষাণ হইতেন, আলিমদ্দি, বাহাদুর খাঁর মতো খেজুরের গাছ কাটিয়া রস বাহির করিয়া আনিতেন, কত মজা করিয়া খাইতে পারিতামৃ”

কবি লিখছেন— “নানার গ্রামের চারদিকে বিজাবন জঙ্গল। সেই জঙ্গলের এখানে-ওখানে দু’চার ঘর মানুষ। শুনিয়াছিলাম, অনেক আগে সেখানে জঙ্গল ছিল না। বড় বড় আটচালা ঘর করে বর্ধিষ্ণু গৃহস্থেরা বাস করত। লোকজনে সমস্ত গ্রাম কলরব করিত। তারপর কলেরা মহামারিতে, ম্যালেরিয়া জ্বরে প্রায় সমস্ত গ্রাম উজাড় হইয়া যায়। সেখানে ফলবান বৃক্ষ ছিল, সে সব জায়গায় বেত, শ্যামলতা, কুমারলতা প্রভৃতি জন্মাইয়া মানুষের অগম্য করিয়া তোলে। তারপর শেয়াল, খাটাস, শুয়োর, বাঘ প্রভৃতি জানোয়ার ধীরে ধীরে আসিয়া বসতি আরম্ভ করে। বনের মাঝে মাঝে, এখানে সেখানে গৃহস্থেরা বাসের চেষ্টা করে। তাহাদিগকে সর্বদা এসব হিংস্র জানোয়ারের সঙ্গে যুদ্ধ করিতে হইত।” (আমার মা)

এমন গ্রাম থেকেই কবির মায়ের বিয়ে হয়। কবিরও বেড়ে উঠা এই গ্রামে। সে আরেক গল্প। কিন্তু মায়ের প্রসঙ্গে কবির আবেগের তুলনা নেই। তিনি লিখেছেন যে, তাঁর নানা অত্যন্ত স্নেহপ্রবণ ছিলেন। একমাত্র কন্যা রাঙাছুটুর বাড়িতে তিনি সময় পেলেই আসতেন। নানা যখনই বাড়ি আসতেন, হয়তো নারকেলের লাড্ডু, খইয়ের মোয়া কিংবা কদমা-বাতাসা নিয়ে আসতেন। তারপর দু’একদিন থেকে চলে যেতেন। যাইবার সময় মা কাঁদিয়া ফেলিতেন।

কবি আরও লিখেন— “আমার বাজান যদি মাষ্টার না হইয়া কৃষাণ হইতেন, আলিমদ্দি, বাহাদুর খাঁর মতো খেজুরের গাছ কাটিয়া রস বাহির করিয়া আনিতেন, কত মজা করিয়া খাইতে পারিতামৃ”

এমন একটি সংসারকে দশভূজা হয়ে আগলে রাখতেন রাঙাছুটু।

মায়ের পিঠা তৈরির বর্ণনা দিতে গিয়ে জসীম উদ্দীন লিখেছেন— “এইসব কাজ মা কত পরিপাটি করিয়া করিতেন। মা যেন তার স্নেহের সন্তানের জন্য একটি মহাকাব্য রচনা করিতেছিলেনৃ কত যতœ লইয়া, কত মমতা লইয়া, কত আয়াস-আরাম ত্যাগ করিয়া তার সৃষ্টিকার্যে মশগুল রহিতেনৃ”

জীবনকথার সবচেয়ে উজ্জ্বল, আনন্দ ও বিষাদের বর্ণচ্ছটায় উদ্ভাসিত অধ্যায় ‘রাঙাছুটুর বাপের বাড়ি’। কবি লিখেছেন— “আমাদের মুসলমান পাড়ায় কিন্তু সবচাইতে ভাল ঘরখানাই পোয়াতী মায়েদের জন্য রাখা হইত।”

কবির জন্ম নানার বাড়িতে। ছায়া-সুনিবিড় শান্ত গ্রামগুলো আশ্চর্য এক মায়ায় জীবন্ত হয়ে ওঠে তাঁর লেখায়—গাছে গাছে বাবুইয়ের বাসা, তিরতিরে স্বচ্ছ জলের নদী, মাঠে শস্যের সাতরঙা ক্যানভাস, পাখির বিচিত্র সুর।

জঙ্গল হয়ে থাকা নানার বাড়ি প্রসঙ্গে জসীম উদ্দীনের জীবনকথায় আছে— “রাশি রাশি হিজল ফুল মাটিতে পড়িয়া সমস্ত বনভূমিকে যেন আলতা পরাইয়া দিয়াছেৃ”

শত বছর আগের তাম্বুলখানার সেই চিত্র আজ আর নেই। ২০২৬ সালে গিয়ে দেখা যায় একেবারে ভিন্ন দৃশ্য। স্মৃতিবিজড়িত তাম্বুলখানা গ্রামটি আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেকটাই বদলে গেছে। ফরিদপুর থেকে যেতে পড়বে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন-এর বীজ উৎপাদন খামার। পাশেই আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কবি জসীমউদ্দীন স্কুল অ্যান্ড কলেজ।

সেই গ্রামে কবির স্মৃতির খোঁজে ম্যাজিশিয়ান সাজেদুর রহমান রাজুর সঙ্গে গিয়ে দেখা গেল, কবির কবিতায় বর্ণিত চিরচেনা গ্রামবাংলার কিছু রূপ এখনও টিকে আছে। বিশেষ করে কুমার নদ-তীরবর্তী অঞ্চল আজও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। তবে পর্যটন ও যাতায়াতের সুবিধায় তা অনেক বেশি জনাকীর্ণ।

কবির স্মৃতিবিজড়িত অনেক স্থান এখন আর আগের মতো নেই। তাঁর মামার বাড়ির কেউ আর সেখানে থাকেন না। বর্তমানে বাড়িটি কয়েক দফা হাতবদল হয়ে মানিকগঞ্জ থেকে আসা একটি পরিবারের দখলে।

এর মাঝে দুজন অসামান্য দরদী মানুষের দেখা মিলল—প্রয়াত ফেলু শেখের দুই কন্যা করিমন ও রহিমন। করিমন বিবি স্মৃতিচারণ করে বলেন, কবি তাঁদের বাবার কাছ থেকে প্রায়ই রস, মিঠাই ও তেল নিতেন। ছোটবেলায় তাঁদের লজেন্স দিতেন। আক্ষেপ করে বলেন, কবির কোনো স্মৃতি এখন আর অবশিষ্ট নেই।

কবি তাঁর নানির নামে যে টিউবওয়েল স্থাপন করেছিলেন, সেটিও এখন অতীত। টিউবওয়েলের গায়ে লেখা ছিল—“রাঙা ছোটু”। কবি লিখেছিলেন—

“রাঙা ছোটু পানির কল,

টিপটিপাইয়া পানি পড়।”

এ পানির কল ছিল কবির মানবসেবার আরেক দৃষ্টান্ত।

কবির মৃত্যুর খবর শুনে শোকে মুহ্যমান হয়ে উঠেছিল তাম্বুলখানা। গ্রামের মানুষ অশ্রæসিক্ত নয়নে অপেক্ষা করেছিলেন লাশবাহী হেলিকপ্টারের জন্য। কিন্তু নানার বাড়ি সম্পূর্ণ বিক্রি হয়ে যাওয়ায় হেলিকপ্টার চলে যায় অম্বিকাপুর।

পদ্মা নদীর কিনারায় অবস্থিত এই অম্বিকাপুর—আজও অবহেলিত এক গ্রাম। অথচ কবি প্রতি লাইনে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন এই গ্রামের রাখাল, গৃহবধূ, সাপুড়ের মেয়ে কিংবা সাধারণ মানুষের সঙ্গে।

“তুমি যাবে ভাই যাবে মোর সাথে/ আমাদের ছোটো গাঁয়/ গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়ৃ”

জীবনকথা শুরু হয়েছে এই বাক্যে— “আজ রোগশয্যায় বসিয়া কতজনের কথাই মনে পড়িতেছেৃ”

আর শেষ হয়েছে গভীর আবেগে— “আজও দুর্গাপূজার ঢোলের শব্দ শুনিলে আমার সেজদি ও মেজদিকে আমি মানসচক্ষে দেখিতে পাইৃ”

পঞ্চাশ বছর পর আমরা গিয়েছিলাম কবির শৈশবের খোঁজে। ফরিদপুর শহরের সোজন বাদিয়ার ঘাট-এ দেখা হয় রহমত নামের এক প্রবীণের সঙ্গে। তিনি জানান, কবি যখন বাড়ি আসতেন, সবার খোঁজখবর নিতেন। স্বাধীনতার পর প্রায়ই মন খারাপ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেন। বলতেন, স্বাধীনতার স্বপ্ন পুরোপুরি পূরণ হয়নি।

অম্বিকাপুরে কবির বাড়ির সামনে দিয়ে বয়ে গেছে কুমার নদ। নদের ঢালেই বিশাল মাঠ—যেখানে প্রতি বছর মেলা বসত। বাড়ির প্রবেশপথেই রয়েছে পারিবারিক কবরস্থান। ডালিম গাছের তলায় চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন পল্লীকবি জসীম উদ্দীন। বাড়ির পূর্ব পাশের ঘরেই থাকতেন জাতীয় আত্মার এই কবি। সেখানেই বসে তিনি রচনা করেছেন তাঁর অসংখ্য কবিতা, গল্প ও স্মৃতিকথা। ঘরের পাশে রান্নাঘর, ঢেঁকিঘর—সবখানেই এখনও লেগে আছে তাঁর সময়ের স্পর্শ।

‘কবর’ বাংলা কবিতার জগতে এক অনবদ্য সৃষ্টি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অ¤øান হয়ে আছে এর প্রতিটি পঙক্তি। বর্তমানে বাড়ির অন্দরমহলে কয়েকটি সংগ্রহশালা রয়েছে। তবে অযতœ ও অবহেলার ছাপ স্পষ্ট। কবির বিভিন্ন লেখা বাড়িচত্বরে প্রদর্শিত হলেও আরও যতেœ এটিকে পূর্ণাঙ্গ জাদুঘরে রূপ দেওয়া সম্ভব।

বংশপরম্পরায় এই বাড়িতে আছেন মজিরুন নেছা। তিনি জানান, ছোটবেলায় তাঁরা কবিকে “নানা” বলে ডাকতেন। কবির মৃত্যুদিনে হেলিকপ্টারে করে তাঁর মরদেহ যখন আনা হয়, তখন মানুষের ঢল নেমেছিল।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে সামনে পড়ল মৃতপ্রায় কুমার নদ। আগে এখানে মাসব্যাপী জসীমমেলা হতো। এখন নিয়মিত হয় না। পাশে নতুন নির্মিত মিউজিয়াম রয়েছে। প্রবেশমূল্য ৪০ টাকা। সংগ্রহশালা সুন্দর, তবে আরও যতেœর প্রয়োজন।

ফরিদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে অটোতে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরত্বে এই গ্রামে যাওয়া যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ পল্লীকবির বাড়ি দেখতে আসেন। কিন্তু এসে অনেকেই হতাশ হন। স¤প্রতি কবির পরিবারের পৈত্রিক সম্পত্তি দখল নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধের খবরও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।

জসীম উদ্দীনের গ্রাম আজ বদলে গেছে, কিন্তু তাঁর কবিতার গ্রাম এখনও অমলিন। বাংলার মাটির গন্ধ, মানুষের টান, লোকজ স্মৃতির গভীর আবেগ—সব মিলিয়ে তিনি আজও এই দেশের অগণিত মানুষের হৃদয়ের কবি।

১৯৫৪ সালের ঘটনা। বেদে সমাজ ‘জাতে ওঠার’ জন্য আন্দোলন শুরু করেছে। জাতে ওঠা বলছি এই কারণে যে, সমাজে তারা অবজ্ঞেয়। মুসলমান হলেও এবং হাজার শিক্ষিত হলেও উচ্চতর মুসলমানদের সঙ্গে বিয়ে সাদী এমনকি সমাজ জামাতের বিভেদের জন্য ওঠা-বসা হয় না। এই বৈষম্য দূর করার জন্য হাজীগঞ্জের আলেম সমাজ এক মহতী সভার আয়োজন করেছেন এবং সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে চাঁদপুরে।’

এ সভার প্রধান অতিথি করা হয় পল্লী-দরদি মানুষ জসীমউদ্দীনকে। চাঁদপুরে তাঁর আগমনের বর্ণনা আবদুস সাত্তার লিখেছেন : “কবিকে রিসিভ করার জন্য স্টীমার ঘাটে অজস্র লোকের সমাগম এবং অধিকাংশই টুপিধারী আলেম সমাজ। বেদে নেতৃবর্গ এবং অন্যান্য সবার হাতে নিশান এবং মুহুর্মুহু ধ্বনি উঠছে : ‘পল্লী কবি জসীমউদ্দীন জিন্দাবাদ’, ‘বেদে সাপুড়ের কবি জিন্দাবাদ’। ...স্টিমার থেকে কবিকে নামিয়ে আনা হলো ডাক বাংলোয়।”

বেদেদের নিয়ে সভার আয়োজন শহরজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। মাইকে ঘোষণা করা হয় : ‘বেদে সমাজ চিরদিন অবজ্ঞেয়। মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই, এ কথা যদি সত্য হয় তবে বেদে সমাজ সকল মুসলমানের ভাই হতে পারবে না কেন?’ কবির বক্তৃতা শুনে উপস্থিত সবাই মুগ্ধ হয়েছিলেন। সভাশেষে কবি বেদেদের সঙ্গে কোলাকুলি করেন।

গবেষক মফিজ ইমাম মিলন লিখছেন, আমার শিক্ষক শ্রী শ্রীশ চন্দ্র ঘোষ। তিনি বলেছেন “আমার বন্ধুর ডাক নাম ‘সাধু’, ভাল নাম জসীম উদ্দীন।” আমরা সমস্বরে আনন্দে চিৎকার করে উঠলাম, কবি এসেছে কবি এসেছে। লম্বা একহারা চেহারা, পরনে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী। পা দু’খানা লম্বা। বড় বড় পা ফেলে হাঁটছিলেন আর কবিতা পড়ছিলেন ‘কবর’ কবিতা। কিছুক্ষণ পরেই কবি কাঁদতে শুরু করলেন। শিশুর মত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। আমরাও সকলে ‘কবর’ কবিতা কবির স্বকণ্ঠে শুনে কেঁদেছিলাম।

মানুষের জাগতিক বোধের রূপকার কবি জসীম উদ্দীন। বাস্তবে এই কবি মানুষকে কাঁদাতে পারতেন।

৭২ বছর জীবনকালে তাঁর কবি জীবনের ব্যাপ্তি দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর (১৯২৬-১৯৭৬)। এর মধ্যে প্রথম ২৫ বছর তাঁর কবি জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় হলেও পরবর্তী ২৫ বছর ছিল অপেক্ষাকৃত ম্রিয়মান। এ সময় তাঁর সৃজনী ক্ষমতা ফুরিয়ে গিয়েছিল। এ পর্বের সাহিত্য সৃষ্টি তুলনামূলক অনুজ্জ্বল ও পূর্ব সৃষ্টির অনুবৃত্তিমূলক। তবে তাঁর কবি জীবনের প্রথম ২৫ বর্ষে তিনি অনেক শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি আমাদের উপহার দিয়েছেন। তাঁর সচল কবিজীবনে তিনি ২০টি কাব্যগ্রন্থ, ১৩টি গদ্যগ্রন্থ, ৫টি নাট্যগ্রন্থ ও ২টি সম্পাদিত গ্রন্থসহ মোট ৪০টি গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশ করেন, জীবদ্দশাতেই যার অনেক সংস্করণ বেরিয়েছে।

গ্রাম বাংলার জীবন সংস্কৃতি কবিতায় ঠাঁই দিয়েছেন। কবি জীবনের প্রথমেই এ কারণেই জসীম উদ্দীনের কবিতা দীনেশচন্দ্র সেনকে কাঁদিয়েছে। তার ‘কবর’ কবিতা পড়ে তিনি কেঁদেছিলেন। দূরাগত রাখালীর বংশীধ্বনির মতো জসীম উদ্দীনের কবিতা শুধু দীনেশ সেনকেই নয় অনেককেই কাঁদিয়েছিল। অনেকে মনে করেন গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতি যেভাবে জসীম উদ্দীনের কবিতাকে গতিশীল করেছে, সে কারণেই গ্রামের মানুষের সহজ সরল অনুভূতি আর সে অনুভূতির ফসল হিসেবে যে প্রেম ভালোবাসার সুখ-দুঃখ বেদনায় বিজড়িত জীবন— এ জীবনের ভেতর-বাহির চিত্রিত হয়েছে জসীম উদ্দীনের কবিতায়। এক্ষেত্রে কবি চিত্রশিল্পীর দৃষ্টি ও যোগ্যতা নিয়ে কলম ধরেছিলেন। ফলে গ্রামের মানুষকে নিয়ে লেখা সেই কবিতা হয়ে উঠেছে ছবির কবিতা।

জসীম উদ্দীন মূলত মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের মধ্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন পুনর্গঠনের প্রয়াসী এক সাহিত্যিক। যে সুতো ছিঁড়ে গিয়েছিল—লোকজ সংস্কৃতি ও আধুনিকতার—তিনি সেই সুতোকে আবার জোড়া লাগাতে চেয়েছেন। বাংলা কাব্যকে তিনি গণমানুষের ভাষা ও অভিজ্ঞতায় ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট ছিলেন। তাঁর রচনায় স্থান পেয়েছে সেইসব মানুষের জীবন, যাদের কথা তথাকথিত ভদ্র বা আধুনিক সাহিত্যে খুব কমই উচ্চারিত হয়েছে। পাশ্চাত্য প্রভাবিত আধুনিক সাহিত্য যে ‘উপর থেকে নিচে’ দেখার প্রবণতায় অভ্যস্ত, সে বিষয়ে তিনি সচেতন ছিলেন বলেই তাঁর সাহিত্য ‘নিচ থেকে উপরে’ ওঠা জীবনের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে। তার গ্রাম হয়ে উঠেছে আমাদের গ্রাম।

(লেখক একজন কবি, গবেষক ও সম্পাদক কালের ধ্বনি)